রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

১৭ মার্চ, ২০১৯ ১৯:৫৫

হাউজ অব কমন্সে থেকে জনমত'র ৫০ বছর পূর্তি উৎসব শুরু

বৃটেনের প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় বাংলা সাপ্তাহিকী জনমত এর সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব শুরু হলো। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট হাউজ অব কমন্সে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক এমপি, রাজনীতিক, ব্যবসায়ি এবং কমিউনিটি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের প্রাণজ উপস্থিতিতে পালিত হয় ৫০ বছর ধরে `জনগণের জনমত' এর সুবর্ণ জয়ন্তি।  

সেই সাথে শুরু হলো বছরব্যাপি উৎসব ও প্রযুক্তিয়ানের পথে উত্তরণে জনমতের যাত্রা।

একটি দেশের জন্মের সময় মুখপত্র হিসেবে যে জনমত এর প্রকাশণা, অর্ধ শতকের অব্যাহত পথচলায় যে কমিউনিটি এর সার্বক্ষণিক সঙ্গি, তাদের সাথে নিয়ে জনমত উদযাপন করলো তার ঐতিহাসিক মাইলফলক। যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের অভিবাসী জনগোষ্টির অগ্রযাত্রায় আলোকবর্তিকা হিসেবে অর্ধশতক ধরে দায়িত্ব পালন করে আসায় অতিথিরা জনমত পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার, বিকালে হাউজ অব কমন্স এর কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারিয়ান এসোসিয়েশন (সিপিএ) রুমে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানের হোস্ট ছিলেন নারী ও সমতা বিষয়ক ছায়া মন্ত্রী, ডন বাটলার এমপি।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে ব্রিটিশ ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ মিনিস্টার, মার্ক ফিল্ড বলেন, জনমত তার পথচলায় ৫০ বছর পূর্ণ করায় আমি খুবই আনন্দিত এবং এটি যেন শতাব্দী ছুঁতে পারে সেজন্য শুভ কামনা থাকলো।  তিনি বলেন, সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে এর যখন যাত্রা শুরু হয়েছিলো, আমার ধারনা তখন এর আকার ছিলো অনেক ছোট। ইন্টারনেট যুগের অনেক আগে এর যাত্রা শুরু। বৃটিশ বেঙ্গলী এবং বাংলাদেশী জনগণের মধ্যে জনমত এর রয়েছে বিপুল পাঠক গোষ্টি। ফরেন অফিসের এশিয়া এন্ড প্যাসিফিক বিষয়ক মিনিস্টার অব স্ট্যাট হিসেবে আমি বাংলাদেশে একাধিকবার গিয়েছি এবং আগামী এপ্রিলেও আবার সেদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা আমার রয়েছে। আগামী মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকা ও সিলেট পরিদর্শনের পাশাপাশি কক্সবাজারে যাবার কথা উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড আরো বলেন, ৫০ বছর ধরে জনমত এর অবিশ্বাস্য ভ্রমণ এখন ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। জনমত এর যখন শুরু, তখন বাংলাদেশ ছিলো পূর্ব পাকিস্তান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এখানকার বাঙালি কমিউনিটি ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনেও জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুক্তরাজ্যের সাথে বাংলাদেশের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে এবং এই সম্পর্ক দিনকে দিন আরো শক্তিশালী হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ছায়া মন্ত্রী ডন বাটলার বলেন, বৃটেনে অভিবাসী কমিউনিটির মুখপত্র হিসেবে জনমত এর ৫০ বছর এবং এর সাফল্যগাঁথায় আমি ভীষণভাবে গর্বিত। আজ এখানে বিপুল সংখ্যক অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাতে পেরে এবং জনমত এর বছরব্যাপি অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বটির হোস্ট হতে পেরে আমি আনন্দিত।

জনমত এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমিরুল চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে অভ্যাগতদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান জনমত সম্পাদক নবাব উদ্দিন। জনমত ও কমিউনিটির মধ্যকার মেলবন্ধন তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা। সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন জনমত এর অন্যতম কর্নধার, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জুনেদ চৌধুরী।

৫০ বছর আগে ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জনমত এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং সাবেক প্রধান সম্পাদক আনিস আহমদ সবাইকে জনমত এর শুরুর দিকের গল্প শোনান। তিনি বলেন, জনমত আজ অর্ধ শতাব্দী পালন করছে দেখে আমি আবেগ আপ্লুত। আমি বিশ্বাস করি পাঠক ও কমিউনিটির জন্য এটি একটি মাইলফলক। আজকের এই উৎসবে আমি থাকতে পারবো, এটা ছিলো আমার ভাবনারও অতীত। তিনি বলেন, জনমত তার যাত্রাকে আরো সুসংহত করতে ডিজিটাল মাধ্যমে বিনিয়োগ করছে দেখে আমি খুবই আনন্দিত, এ কারণে যে, হয়তো সময়ের সাথে এই আত্মিকরণ জনমতকে আরো ৫০ বছর পথচলার সামর্থ্য দেবে।

অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম, বাংলাদেশের নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার, ব্রিটিশ কূটনীতিক আনোয়ার চৌধুরী, বেথনাল গ্রীণ এন্ড বো'র এমপি রুশনারা আলী, পপলার এন্ড লাইমহাউজ এর এমপি জিম ফ্জিপ্যাট্রিক, এলিং সাউথহল এর এমপি ভিরেন্দ্র শর্মা, সাটন এন্ড চেহাম এর কনজারভেটিভ এমপি পল স্কালি, ইউকে বাংলাদেশ ক্যাটালিস্টস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (ইউকেবিসিসিআই) এর প্রেসিডেন্ট বজলুর রশিদ এমবিই, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন (বিসিএ) এর সাবেক প্রেসিডেন্ট পাশা খন্দকার এমবিই, ব্রেন্ট কাউন্সিলের সাবেক মেয়র কাউন্সিলর পারভেজ আহমেদ, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এমদাদুল হক চৌধুরী, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোর্ট এর চেয়ারম্যান মুসলেহ উদ্দিন, বাংলাদেশ সেন্টার লন্ডন এর সহ সভাপতি মুহিবুর রহমান মুহিব প্রমুখ।

অতিথিরা জনমত এর ৫০ বছর পূর্তিতে এর সাথে জড়িত সকলকে অভিনন্দন জানান এবং আগামী প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক প্রকাশণার শতবর্ষ পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন, জনমত বৃটেন থেকে প্রকাশিত সবচে পুরনো বাংলা সাপ্তাহিকী শুধু নয়, এটি একটি চেতনা, বাংলাদেশী কমিউনিটির জীবন সংগ্রাম আর আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

জনমত এর সম্পাদক মোহাম্মদ নবাব উদ্দিন, আমাদের এই ঐতিহাসিক মুহুর্তকে উদযাপন করার সাথে সাথে আমরা প্রযুক্তিয়ানের দিকে সুসংহত যাত্রা শুরু করছি। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার, এদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার এবং ইংরেজীতে যারা কথা বলে, তাদেরকেও পাঠক হিসেবে জনমত এর পরিবারে সামিল করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন (সিজেএ) এর ইন্টারন্যাশনাল কমিটির ভাইস চেয়ার, জনমত এর প্রধান সম্পাদক, সৈয়দ নাহাস পাশা বলেন, খবর ও খবরের পেছনের খবর পাঠকদের কাছে পৌঁঁছে দিতে বহুমূখি সাংবাদিকতাকে আমরা গুরুত্ব দিচ্চিছ। জনমত এর শক্তি  হচ্ছে এর বিশাল পাঠক সমাজ, যারা যুগ যুগ ধরে জনমতকে তাদের বুকের গভীরে জায়গা দিয়ে রেখেছেন। জনমতকে বৈশ্বিক সংবাদ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিয়েছি।

জনমত এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে প্রায় দুই দশক ধরে দায়িত্ব পালনকারী আমিরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ১৯৬৯ সালে যারা এই বীজ বপন করেছিলেন, তারা হয়তো ভাবেননি, একদিন এটি ৫০ বর্ষ পূর্তি করবে। কিন্তু বাংলাদেশী কমিউনিটি এবং বিশেষ করে এই কমিউনিটির প্রাণ ব্যবসায়ি সম্প্রদায়ের সমর্থন ও ভালোবাসায় এত পথ পাড়ি দিতে পেরেছে জনমত।  

তরুণ ব্যবসায়ি, জনমত এর বর্তমান কর্ণধার জুনেদ চৌধুরী উপস্থিত অভ্যাগতদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, নিজে বাংলা পড়তে বা লিখতে না জানলেও পাঠক হিসেবে জনমতের সাথে আমার বাবা-মার যে আত্মিক সম্পর্ক, সেটাই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে এর হাল ধরতে। আমরা সবাই যদি সহযোগিতা অব্যাহত রাখি, তাহলে 'জনগণের  জনমত' আরো অনেক পথ এগিয়ে যেতে পারবে স্বাচ্ছন্দ্যে। তিনি বলেন, জনমত আমার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এর প্রকাশনা অব্যাহত রাখা অনেক কঠিন কাজ, তবে কমিউনিটি বিশেষ করে ব্যবসায়ি কমিউনিটি যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে জনমতকে নিয়ে অনেক দূর আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, যখন একটি নতুন দেশের জন্ম-আন্দোলনের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন বিলাত প্রবাসী চার ছাত্র  প্রকাশ করেন জনমত। ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জনমত এর যাত্রা শুরুর পর থেকে গত ৫০ বছরের পথ চলায় অনেক সংকটের মুখোমুখি হলেও কখনো একটিবারের জন্যও বন্ধ হয়নি এর প্রকাশণা।

মুক্তিযুদ্ধে জনমত এর ভূমিকা ঐতিহাসিক। একাত্তরে জনমত ছিলো মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক মুখপত্র। ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির একমাত্র বিশ্বস্ত কন্ঠস্বর হিসেবে জনমত ৫০ বছর ধরে পালন করে চলেছে অনন্য ভূমিকা। বিলাতে বাংলা মিডিয়ার শত বছরের ইতিহাসের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্চেছ জনমত, যার আলোকচ্চছটায় সমৃদ্ধ হয়েছে বিলাতের বাংলা মিডিয়া।
 
অনুষ্ঠানে জনমত এর ৫০ বছরের সাফল্য উদযাপনের পাশাপাশি অনলাইনে জনমত.কম এবং জনমত.টিভির যাত্রা শুরুসহ বছরব্যাপি উৎসবের বিভিন্ন দিক তুলে বক্তব্য রাখেন ''জনমত উৎসব'' এর প্রধান সমন্বয়ক মাহবুব রহমান। তিনি বলেন, জনমত শুরু থেকেই ছিলো বাংলার সাথে, বাঙালির প্রাণে। আজ থেকে জনমত এর নতুন শ্লোগান হচ্ছে ''শতাব্দী ছুঁয়ে যাবার দূর্নিবার আকাংখায়''। এই শ্লোগানকে সামনে রেখে, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ জনমত এর ৫০ বছরের পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভাকাংখীদের নিয়ে বিশাল আকারে 'জনমত উৎসব' এর আয়োজন করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটেও আয়োজিত হয়ে জনমত উৎসব।  জনমত এর ইতিহাস, বাঙালি কমিউনিটিতে এই সাপ্তাহিকীর অবদান এবং ৫০ বছরের মাইলফলকে পৌঁছানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তগুলো ঘিরে গ্রন্থিত হবে জনমত এর সকল আয়োজন।  এখন থেকে শুরু হওয়া 'জনমত উৎসব'কে ২০২১ সালে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবে রূপান্তরের ইচ্ছার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে বহু মানুষের জীবন আর সময়ের উত্থান-পতনের গল্পকে সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়া জনমত এর দুর্দান্ত ৫০ এর মাইলফলকের অংশিদার হতে কমিউনিটির প্রতি আহধ্বান জানানো হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত