বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

শাকিলা ববি

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০২:০০

অভিনেতা হতে গিয়ে লেখক হয়ে যাই: সমরেশ মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ সমরেশ মজুমদার। দুই বাংলায়ই তিনি সমান জনপ্রিয়। অথচ সাতকাহন, গর্ভধারিণী, কালবেলাসহ অসংখ্য কালজয়ী উপন্যাসের লেখক নাকি লেখকই হতে চাননি। হতে চেয়েছিলেন অভিনেতা।

শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সিলেটে নিজের লেখক হওয়ার গল্প শোনাতে গিয়ে এমন আশ্চর্য কথাই শোনালেন সমরেশ মজুমদার।

মননশীল বইয়ের দোকান বাতিঘর তার নতুন বই ‘অপরিচিত জীবনযাপন’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে নিজের লেখক হয়ে উঠার গল্প শোনান সমরেশ।

জলপাইগুড়ির চা বাগানের ১৭ বছরের কিশোর। পড়াশোনার জন্য কলকাতা গেলেন। তখন কলকাতার আকর্ষণের কেন্দ্র ছিলেন উত্তম কুমার, সত্যজিৎ রায়। তাদের মতো হতে চাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সেই কিশোর ও তার বন্ধুরা মিলে নাটক করার সিদ্ধান্ত নিল। তৈরি করলো নাটকের দল। অনামি, অপরিচিত কিছু ছেলেমেয়ের নাটকের দল, তাই তাদের নাটকের দলকে বড় কোনও নাট্যকার নাটকের গল্প দিতেন না। কারণ লেখকরা মনে করতেন তাদের গল্প মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

তাই একদিন ওই কিশোরের এক বন্ধু বললেন, তুই একটু চেষ্টা কর না। একটা গল্প লিখ। কিশোর বন্ধুদের কথায় গল্প লিখলেন। কিন্তু তার বন্ধুরা পড়ে বললো, ‘নাটকের গল্প হয়নি। তোর দ্বারা নাটক হবে না।’ তখন ওই কিশোরের রাগ হলো। এরপর তার আরেক বন্ধু বললো তুই আগে গল্পটা লিখ, তারপর নাট্যরূপ দে। আবার সে গল্প লিখলো। লিখে দলের সবার সামনে পড়লো। আবার সব বন্ধুরা বললো এভাবে নাটক হয় না।

তখন সে জিজ্ঞাস করলো কেন। বন্ধুরা বললো তার নাটকের নায়ক ট্রেনে করে যাচ্ছে, সাঁতার কাটছে, এসব মঞ্চে দেখাবো কি করে। হবে না। তখন এক বন্ধু বললো এই লিখা কোনও পত্রিকায় পাঠা, ছাপিয়ে দিবে।

এভাবেই লিখা শুরু হয় দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদারের। এখানেই শেষ নয়। নাটকের গল্প না লিখতে পরলেও সমরেশ মজুমদারের লেখক হয়ে উঠতে অনেক নাটকীয়তা পার করতে হয়েছে।

সমরেশ মজুমদার যখন কলকাতায় তখন বাংলায় কলকাতার সবচেয়ে বড় পত্রিকা ‘দেশ’। ওই পত্রিকায় পোস্টে ওই লিখাটা পাঠালেন। লিখা পাঠানোর পর মাসের পর মাস পার হয় কোনও খবর নেই ছাপানোর। ছয় মাস থেকে আট মাস গেল কিন্তু কোনও সাড়া শব্দ নেই।

একদিন হঠাৎ সমরেশ মজুমদার দেশ পত্রিকাতে গিয়ে বললেন, আমি একটা গল্প পাঠালাম আপনারা কি দেখেছেন। তারা বললো, গল্পের কি নাম। নাম বলার পর ১ মাস পরে আসার জন্য বলা হলো। একমাস পর আবার গেলেন পত্রিকা অফিসে তখন বলা হলো ৭দিন পরে আসতে। ৭দিন পর অফিসে গেলে জিজ্ঞাস করা হলো এটা তার গল্প কিনা। তখন দেশ পত্রিকা থেকে বলা হলো লিখা ছাপা হবে।

এ কথা শুনে বিস্মিত হলেন সমরেশ মজুমদার। কারণ তখন দেশ পত্রিকায় নামীদামী লেখকদের লিখা ছাপা হয়। তাই তিনি ভাবতে পারেনি সত্যিই তার লেখা ছাপা হবে। তিনি বন্ধু বান্ধবকে এই সংবাদ দিলেন। সবাই খুব খুশি হলো। যদিও বন্ধুরা বিশ্বাস করেনি তারপরও তারা খুশি হন। ২দিন পর তাঁর ঠিকানায় দেশ পত্রিকা থেকে একটি খাম আসলো। খাম খুলে দেখেন, তিনি যে লেখা পাঠিয়েছিলেন তার কপি আর সঙ্গে একটি চিঠি। যাতে লেখা- ভবিষ্যতে ভালো গল্প লিখলে পাঠাবেন।

সমরেশ মজুমদার বলেন, কি লজ্জার ব্যাপার বলুনতো। সবাইকে বলছি আমার গল্প ছাপা হবে। কিন্তু ছাপালো না ফেরত পাঠিয়ে দিল। তখন আমার বন্ধুকে বললাম, দেখ ওরা বললো আমার গল্প ছাপা হবে কিন্তু ছাপালো না। বন্ধু বললো, তুই ছাড়বি না গালি দে ওদের।

যেই কথা সেই কাজ। সমরেশ মজুমদার কলেজের টেলিফোনের বুথ থেকে কল দিলেন দেশ পত্রিকায়। তখন দেশ পত্রিকায় গল্প দেখতেন বিমল কর। তিনি জিজ্ঞাস করলেন, কি চাই ভাই। সমরেশ বললেন, ‘আপনারা বললেন লেখা ছাপাবেন অথচ বাসায় লেখা পাঠিয়ে দিলেন। আপনারাতো মিথ্যাবাদী।’ যাতা তা গালাগালি করলেন। বিমল কর চুপচাপ কিছুক্ষণ শোনার পর বললেন, ‘আপনি গল্পটা নিয়ে আমাদের কাছে আসুন।’ এই শুনে ভয় পেলেন সমরেশ। চিন্তা করলেন এতো গালগালি করলেন অফিসে গেলে যদি পর পুলিশে দিয়ে দেয়। তারপরও সাহস করে গেলেন পত্রিকা অফিসে। তবে একা যাননি। দল বেঁধে ১৫জন বন্ধু নিয়ে গেলেন। পরিকল্পনা করলেন যদি পুলিশে দেয় তবে ১৫জন একসাথে এরেস্ট হবেন।

সমরেশ মজুমদার বলেন, পত্রিকা অফিসে যাওয়ার পর বিমল কর বললেন, ‘আমি পিওনকে বললাম লেখাটা প্রেসে দিতে। সে ভুল করে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি আর কাউকে বলিনি এসব কথা। তার পরের সপ্তাহে গল্পটা দেশ পত্রিকায় ছাপানো হলো। তখন নিজের চোখে নিজের গল্প নিজের নাম দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না। দুদিনপর আমার বাসায় একটা মানি অর্ডার এলো। গল্পটির পারিশ্রমিক বাবদ ১৫ টাকা দেশ পত্রিকা পাঠিয়েছে। আমি আমার বন্ধুদের গিয়ে বললাম। তারা সঙ্গে সঙ্গে হই হই করে কফি হাউজে গিয়ে খেয়ে ফেললো। এক মুহূর্তে ১৫ টাকা শেষ। তখন তারা উৎসাহিত হয়ে বললো, তুই আবার লিখ। লিখলে বিনা পয়সায় খাওয়া যাবে।

বন্ধুদের প্রেরণা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্ধুরা রোজ এসে বলতো লিখছিস। তাদের প্রেরণাতে আমি আবার গল্প লিখলাম। আবার জমা দিলাম। ৩ মাস পরে ছাপা হলো। তখন ৩০ টাকা পেলাম। কিন্তু আমি বন্ধুদের বললাম ১৫ টাকা পেয়েছি। ১৫ টাকা বন্ধুরা খেল ১৫ টাকা আমার বেঁচে গেল।

লেখালেখিতে এভাবেই যাত্রা শুরু হলো সমরেশ মজুমদারের। কিন্তু লেখক হবেন সেটা কখনোই ভাবেননি তিনি। ওই সময় বছরে ৪টি গল্প ছাপা হলে ১২০ টাকা পেতেন। সেই টাকা থেকে বন্ধুদের ৬০ টাকা দিতেন আর নিজের কাছে ৬০ টাকা রাখতেন। সমরেশ মজুমদারের ভাষ্য মতে, এটা বেশ মজার খেলা ছিল তার জন্য।

সমরেশ মজুমদার বলেন, এই খেলা খেলতে খেলতে একটা সময় এলো ১৯৭৫ সাল। দেশ পত্রিকার সম্পাদক বললেন, তোমার কাছ থেকে একটা উপন্যাস চাই ১০০ পাতার। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমারতো পাগলের মত অবস্থা, তবু লিখলাম। জমা দিয়ে আসলাম। তিনি বললেন, কদিন পর এসে প্রুফ দেখে যেও। প্রুফ দেখলাম। তারপর আমার বাসায় একটা চিঠি আসলো। সমরেশ দেখা করো জরুরি। আমি ভাবলাম আরও কিছু হয়তো লিখতে হবে।

অফিসে যাওয়ার পর আসল চমক পেলেন সমরেশ মজুমদার। তিনি বলেন, অফিসে যাওয়ার পর সম্পাদক বললেন, ‘ধরুন আপনি যদি দেশ পত্রিকার সম্পাদক হতেন আর আপনার হাতে যদি শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত একটা উপন্যাস আসতো তখন আপনি কোনটা ছাপতেন শরৎ চন্দেরটা নাকি অনামি লেখকের উপন্যাস।’ আমি বললাম শরৎচন্দ্রেরটা ছাপতাম। তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে আমার কোনও বিবেকে দায় নেই। আপনার উপন্যাস আমরা ছাপতে পারছি না।’

আমার উপন্যাসের জায়গায় শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ছাপা হলো। কিন্তু আমি পরিচিতজন সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমার উপন্যাস ছাপা হবে। এখন লেখা ছাপা না হলে সবাই বলবে আমি মিথ্যাবাদী, তাই আমি কলকাতা থেকে পালিয়ে গেলাম। দুমাস আমি বাইরে ছিলাম। তখন নভেম্বর মাসের শেষে পত্রিকায় একটি মাত্র উপন্যাস 'দৌড়' ছাপা হলো। তখন এক বন্ধু বললো, ওই সময় ছাপা হলে হয়তো তোর লেখা কেউ পড়তো না কারণ ওই সংখ্যায় আরও ৪জন নামী লেখকের উপন্যাস ছিল। কিন্তু এই সংখ্যায় আরও কারও উপন্যাস নেই তাই যেই পত্রিকা কিনবে তোর উপন্যাস অবশ্যই পড়বে। এই আমার পথ চলা শুরু হলো।

সমরেশ মজুমদার অভিনয় করতে চেয়েছিলেন। নাটকের দল করেছিলেন। কিন্তু হয়ে গেলেন লেখক। প্রথম উপন্যাসের জন্য দেশ পত্রিকা থেকে ১০০০ টাকা পেয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের বলেছিলেন ১০০ টাকা পেয়েছেন। বন্ধুরা খুশি হয়ে বলছিলো, ১০০ টাকা কম দিয়েছে।

ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা নিয়ে সমরেশ মজুমদার বলেন, সেই যে যাওয়া শুরু হলো হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ১৯৭৯ সাল এলো। সম্পাদক ডেকে বললেন, এবার তুমি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখবে। অনেক দিন ধরে লিখবে। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো আমি পারবো না। আমি বললাম, আমি ১০০ পাতা লিখতে পারি কিন্তু আমি অনেকদিন ধরে লিখতে পারবো না।

তিনি জিজ্ঞাস করলেন কেন? আমি বললাম আমার মাথায় এতো গল্প নেই। তিনি বললেন, তুমি পাগল হয়েছ। এমন অফার পেলে লোকে লাফিয়ে আসে। তুমি বললে পারবে না। আমি বললাম, পারবো না। তখন তিনি বললেন, নিজেকে নিয়ে লেখ। এই যে নিজেকে নিয়ে লেখার কথা বললেন, সেটা আমাকে ভীষণ আপ্লুত করলো। সেই চা বাগান, নদী, ছোট পাঠশালা নিয়ে লেখা শুরু করলাম উত্তরাধিকার।

উপন্যাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সমরেশ মজুমদার বলেন, লিখতে লিখতে উপন্যাসের নায়ক অনিমেষ কলকাতায় এলো পড়াশুনা করতে। কলকাতার ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে। ওই সময় অনিমেষর পায়ে পুলিশের গুলি লাগলো। সে অজ্ঞান হয়ে পরে থাকলো। তাকে সবাই জিজ্ঞেস করছে কে তুমি। সে উত্তর দিতে পারেনি। আমার উপন্যাস শেষ।

লেখক উপন্যাস শেষ করলেও পাঠকদের এই শেষ পছন্দ হয়নি। পাঠকরা বললেন যেহেতু একটি ছেলে কলকাতায় পড়তে এসে গুলি খেয়েছে তাই আনন্দবাজার দেশ পত্রিকা সমরেশ মজুমদারে লেখা বন্ধ করে দিয়েছে। জোর করে থামিয়ে দেওয়া হলো তার কলম। অতএব এই পত্রিকা বর্জন করার ডাক আসলো।

সমরেশ মজুমদারের ভাষ্য মতে, ‘লেখকের কণ্ঠ রোধ করা হলো।’ তিনি বলেন, তখন সম্পাদক আমাকে ডেকে বললেন এটা কি। আমি কি তোমাকে বলেছিলাম এখানে শেষ করো। আমি বললাম না। তিনি বললেন, তাহলে আমাকে এই গালাগালগুলো কেন শুনতে হয়। আবার লিখ। আবারো লেখা শুরু করলাম।

ধারাবাহিক লেখার কথা শোনে যিনি মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন না। যিনি বলেছিলেন অনেকদিন লেখার মত এত গল্প নেই মাথায়। সেই সমরেশ মজুমদার ৩ মাসের মধ্যে লিখলেন কালবেলা উপন্যাস।

সমরেশ মজুমদার বলেন, তিন মাসের ভিতরে ৩৮ বছর বয়সের একজন লেখকের আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাস বের হলো। তারপর জল গড়ালো। এই নাটকের দল তৈরি না করলে হয়তো কোনোদিন লেখক হয়ে উঠতাম না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত