মঙ্গলবার, , ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

শিল্পী রহমান

০৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:৪২

অরিত্রী এবং শিক্ষা ব্যবস্থা

শিক্ষকতার পড়াশুনায় মনোবিজ্ঞান একটা বিশাল অংশ। একজন শিক্ষক শুধু অংকে পণ্ডিত হলেই হবে না, ছাত্রকে কিভাবে সেই অঙ্ক শেখানো যেতে পারে সেই দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সেটা শেখাবার সময় ছাত্রের পড়ায় মন না বসলে কেন মন বসছে না তা খুঁজে বের করতে হবে। ছাত্র অংকে কাঁচা হলে কিভাবে শেখালে সে সেই অঙ্ক বুঝতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে। কেউ আবার বেশী বুঝলে তার জন্যে অতিরিক্ত কাজের(ওয়ার্কশীট) ব্যবস্থা করতে হবে যেন সে তার ওয়ার্কশীট শেষ করে ক্লাসে অন্যদের বিরক্ত না করে। সে অংক একদমই না বুঝলে আর কিসে ছাত্রের উৎসাহ আছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটার দিকে মন দেবার চেষ্টা করতে হবে। তারপর সেই পড়াশুনার ওপরে জোর দিতে হবে অর্থাৎ তাঁর যদি কোন বিশেষ দিকে দক্ষতা থাকে তাহলে সেদিকেই যেন সে আরও ভালো করতে পারে সেই চেষ্টা করতে হবে।

শিক্ষকতার পড়াশুনায় বিহেভিয়ারাল আপ্রোচ সম্বন্ধে পড়াশুনা করাও খুবই জরুরী। এটা শিখতেই হবে, জানতেই হবে কারণ বিভিন্ন রকমের ব্যাবহার এবং দক্ষতার ছাত্র থাকতে পারে একজন শিক্ষকের ক্লাসে।

একজন ছাত্র ক্লাসে অন্যায় করলে তাকে প্রিন্সিপ্যালের রুমে পাঠিয়ে দেয়া হবে, সেখানে প্রিন্সিপ্যাল তাকে শৃঙ্খলায় আনবার উদ্দেশ্যে সে রকমের একটা কাজে সম্পৃক্ত করবেন। সাধারণত সেগুলো পড়ার ওয়ার্কশীট-ই হয়। অথবা ১০০ বার “আমি আর এমন ব্যাবহার করবো না” সংক্রান্ত উক্তি লিখতে হয়। এমন করে ৩/৪ বার প্রিন্সিপালের রুমে যাওয়ার পর তার বাবা মা কে খবর দেয়া হবে এবং দুই পক্ষ মিলে একটা পথ বের করা হবে যে, কিভাবে এই ছেলেটার ব্যবহার ঠিক করা যায়, অথবা ওর কোন সমস্যা আছে কিনা। এডিডি থাকতে পারে, এডিএইচডি থাকতে পারে। অন্য কোন অপারগতা থাকতে পারে, বাসায় কোন সমস্যার কারণে খিটখিটে মেজাজের হতে পারে, রাতে ঘুমায় কি না ঠিক মতো সেটা দেখতে হবে, খাওয়া দাওয়া ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি। এমন অনেক ধরণের রিসার্চ করা প্রয়োজন, ছেলেটা কেন এমন ব্যাবহার করছে সেটা জানবার জন্যে। তারপর তাকে কিভাবে সবচেয়ে সঠিক উপায়ে পড়াশুনা করানো যায় সেই দায়িত্ব স্কুল নেবে। দরকার হলে এমন ছাত্রদের জন্যে আলাদা একটা ব্যবস্থা করতে হবে তবুও দায়িত্বটা স্কুলেরই।

অরিত্রী কেন নকল করবার সিদ্ধান্ত নিলো, সেটা জানা প্রয়োজন এই কারণে, অবশ্যই ও একজন ভালো ছাত্রী ছিল নাহলে এই স্কুলে পড়তে পারতো না। তাহলে কি সমস্যা দেখা দিলো ক্লাস নাইনে এসে। খুব সহজে কোন কিছু না চিন্তা করে বলে দেয়া যেতে পারে, টিন এজের ক্রাইসিসে থাকার কারণে হয়তো পড়াশুনায় মন বসাতে পারছিল না মেয়েটি। কিন্তু এটা হবে জাজমেন্টাল সিদ্ধান্ত এবং এই সিদ্ধান্তে মেয়েটাকে সাহায্য করা যাচ্ছে না। তাহলে সময় নিয়ে খুঁজে বের করতে হবে কেন সে নকল করবার সিদ্ধান্ত নিলো।

আমরা ধরেই নেই বাচ্চা মানুষ করবার দায়িত্ব বাবা মায়ের। অবশ্যই বাবা মায়ের কিন্তু স্কুলের একটা বিশাল ভূমিকা আছে এখানে। সেই দায়িত্ব মাথায় নিতে না পারলে শিক্ষকতা হয়না আসলে।

আরও একটা জরুরী ব্যাপার ভুলে গেলে চলবে না, এখনকার বাচ্চাদের সামনে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। এই বয়সের বাচ্চাদের মুখের সামনে এমন একটা মুলা ঝুলছে সেটাকে অবজ্ঞা করে পড়াশুনায় মন দিতে পারা একটা বিশাল মনোবলের ব্যাপার। যেটা আমাদের সময় ছিলই না। আমরা অন্য অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এখন অনেক বেশি বাইরের প্রভাব পরে বাচ্চাদের ওপরে। তারপরে এদের তো দিন রাত ভর পড়াশুনা করতে হয়, আমরা সময় গুণে পড়েছি, খেলাধুলা করেছি।

দ্বিতীয় ব্যাপারটা হোল, এখনকার শিক্ষকরা অন্য কোন ব্যাপারে তো দূরের কথা পড়াশুনাতেও পাশে থাকতে চান না। পাশে থাকেন কোচিং এর টিউটর। এদের বরং সেই টিউটরদের সাথেই একটু সম্পর্ক হয়। আমি জেনেরালাইজ করতে চাইছিনা, সবাইকে জাজ ও করতে চাইছি না। এর বাইরে অনেক ভালো শিক্ষক অবশ্যই আছেন, শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি। কিন্তু সাধারণ মানুষ যে শিক্ষকের ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলছে এটা তো সত্যি। কারণ নিশ্চয় আছে। শিক্ষকের সাথে ছাত্রের দূরত্ব বাড়ছে। সাহস দেবার মানুষ নেই।

মেয়েটা আত্মহত্যা করেছে বলেই মেয়েটাকে দুর্বল বলে জাজ করতে পারিনা আমরা। সবার জার্নিটা এক রকম হয় না। ওই মেয়েটার মানসিক অবস্থা কি ছিল, কেন ছিল আমরা জানিনা এবং জানতে চেষ্টাও করলাম না। শুরুতেই ওকে এমন একটা কঠিন জায়গায় ঠেলে দিলাম যে ও হেরে গেলো। এতো অল্প কোথায় কেন কেউ আত্মহত্যা করবে? আমরা একটা দুর্বল প্রজন্ম তৈরি করছি? কিন্তু সেটার জন্যে কেউ কি কিছু করছি আমরা? ছোটবেলা থেকেই বইয়ের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে রাখলে এবং সবাইকে খুশী করবার জন্যে বেড়ে উঠলে শক্ত হবার সাহসটা হয়না ওদের। শুধু মানুষকে খুশী করাতেই ব্যস্ত থাকে, নিজেকেও চেনার সাহস পায়না ওরা পাছে এমন কিছু আবিষ্কার করে ফেলে যাতে সমাজ বা স্কুল বা পরিবারের মন নেই।

পৃথিবীতে শুরু থেকে কোন বাচ্চাই বাবা মা কে কষ্ট দিতে চায়না। ওরা চায় ওদের নিয়ে বাবা মা গর্ব করুক। সেটা শুরু হয়েছে যেদিন প্রথম হাঁটতে শুরু করেছিলো, সেদিনই। একটা পা ফেললে বাবা মায়ের চোখে মুখে যে আনন্দ তা দেখবার জন্যে বার বার উঠে দাঁড়িয়ে আরেক পা ফেলেছে আবার নিজেও মজা পেয়েছে নিজের সফলতায়। সেই থেকেই শুরু… কিন্তু ওটা ছিল ওর নিজের চেষ্টা, নিজের অর্জন, নিজের কৃতিত্ব।

এরপর থেকেই শুরু হয় পদে পদে অন্যকে খুশী করে বেঁচে থাকা। নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা বিচার বুদ্ধি লোপ পেতে থাকে তখন, মাথায় একটাই চিন্তা কি করে সবাইকে খুশী করা যায়, সবার মুখ উজ্জ্বল করা যায়। বাসায় পরিবারকে খুশী করা, স্কুলে শিক্ষককে খুশী রাখা, সমাজের প্রত্যাশা মিটিয়ে চলা। ওদের সাহস আসবে কোথা থেকে? তাই সবাইকে খুশী করতে না পেরে তখন এরা হতাশায় ভোগে। সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পেরে হয়তো জীবনের মূল্য খুঁজে পায়নি মেয়েটা আর। সবাই হতাশ হয়েছে ওর আচরণে, বাবা মা এবং স্কুল। লজ্জায় ঘৃণায় বাচতে ইচ্ছে করে নি আর ওর। কিন্তু ও কেন পিছিয়ে পড়লো পড়াশুনায়? সেটা বের করা প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া একজন ১৫ বছরের বয়সের মানুষকে আরেকটা সুযোগ দেয়া উচিৎ ছিল, যেন ও তার নিজের ভুল থেকে শিখতে পারে। এমন তো হতেই পারতো, যে এই ঘটনার পর, ওর পুরো জীবনটাতেই অন্যরকম একটা গতি পেতো সে। বিপুল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে পড়াশুনা করতো। আর কোনদিন ওর বাবা কে যেন কারো কাছে মাফ চাইতে না হয় সেই চেষ্টায় সবটুকু শক্তি দিয়ে কাজ করতো।

সবশেষে, মোবাইল নিয়ে পরীক্ষা দিতে ঢুকলো কি করে মেয়েটা? ওটা কার দায়িত্ব ছিল? ঢুকবার সময় চেক করা হয়নি কেন? স্কুলের কাজের গাফিলতি না এটা?

যেই মেয়ে ভিকারুন নিসা স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তাকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই ভর্তি হতে হয়েছে, ও অবশ্যই একজন ভালো ছাত্রী ছিল। তাহলে ও নকল করবার সিদ্ধান্ত নিলো কেন? ওর জীবনে কি সমস্যা ছিল? কিসের কারণে ও পিছিয়ে গেলো... এসব দেখার, জানার দায়িত্ব একজন শিক্ষকের, প্রতিষ্ঠানের। দরকার হলে বাবা মা’কে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারে, ওর জীবনে কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা, ও কেন এমন পিছিয়ে পড়ছে। তারপর স্কুল এবং বাবা মা মিলে বাচ্চাটার ভালো হবার পেছনে সময় দিতে পারতো। দরকার হলে তাকে কাউন্সেলিং পাঠানো যেতো।

টিসি দিয়ে কি উদ্ধার হতো? স্কুলের রেপুটেশন? গা ঝাড়া দিলেই সব দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যায়না। মনে রাখতে হবে এটা একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দায়িত্ব অনেক। অন্যের সন্তানকে মানুষ করে দেবার দায়িত্ব। বইয়ের পড়াশুনা একটা বিরাট অংশ সন্দেহ নেই, কিন্তু ওদেরকে সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবার আংশিক দায়িত্ব শিক্ষকের ওপরেও থাকে।

অপমান করে কাউকে কিছু শেখানো যায়না, হয়তো অল্প সময়ের জন্যে মুখ বন্ধ করা যায়। শাস্তি দিয়েও মানুষকে খুব একটা কিছু শেখানো যায়না, শেখাতে হবে শৃঙ্খলার মাধ্যমে।

শৃঙ্খলা শেখানো যেতে পারে: মোবাইলটাকেই সিজ করে রাখা যেতো ৬ মাসের জন্যে। স্কুলে কোন সোশ্যাল কাজে ঢুকিয়ে দেয়া যেতো, স্কুলের পরে প্রত্যেকদিন ১ ঘণ্টা স্কুল পরিষ্কার করবার কাজ করতে পারতো। ছোট ক্লাসের কাউকে পড়ানোর দায়িত্ব দেয়া যেতে পারতো।পড়াশুনায় যেহেতু পিছিয়ে পড়েছিল তাই প্রতিদিন ১ ঘণ্টা স্কুলেই পড়তে পারতো।

কারো ভুল কাজের প্রতি তিরস্কার নয়, বরং ওদের কথা শুনতে হবে। ওরা কেন এমন ভুল পথ বেছে নিচ্ছে জানতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে হাত---যেন ওরা হারিয়ে না যায়।

  • লেখক: কাউন্সেলর এবং ‘দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছি’র প্রবর্তক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত