সোমবার, ২০ মে ২০১৯ ইং

ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার

০৮ মার্চ, ২০১৯ ২২:২২

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক

‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রতীক ব্যবহারকরণ’ মডেলটি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবং এখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলাফল এখানে মিশ্র। নগর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে, যেমন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে, এটি অনেকটা উপযুক্ত বলে মনে হয়। অন্যদিকে, গ্রামীণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, যেমন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে, এটি প্রচুর সমালোচনার জন্ম দেয়।

শহর এলাকার উচ্চ পর্যায়ের গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদের নির্বাচনে এটি এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। জেলা পরিষদ নির্বাচনে এই মডেল ফিটনেস পরীক্ষা করার জন্য প্রথমে এই স্থানীয় সরকার ইউনিটের নির্বাচনে আইয়ুবিয় (আইয়ুব খানের) মৌলিক গণতান্ত্রিক শৈলী থেকে নাগরিক ভোটিং সিস্টেম চালু করতে হবে।

চলতি রাউন্ডে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এই মডেলের ফলাফল অত্যন্ত অবমাননাকর। এখানে একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন আছে। ই নির্বাচনে বিরোধীদলের আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ব্যবহারে কারণ কী? ক্ষমতাসীন দল তার প্রার্থীদেরকে দলীয় প্রতীক "নৌকা" দিয়ে মনোনীত করেন, একই সাথে দলের স্থানীয় নেতাদের নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করার অনুমতি দেন। অবশ্যই এটি দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত করে। এটি দলীয় কর্মী ও অনুসারীদের বিভ্রান্ত করে। তারা দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার শিক্ষা পায়। এমনও জায়গা রয়েছে যেখানে স্থানীয় অনেক সিনিয়র নেতারা তাদের দলের প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ও অগ্রসর হন।

পরিস্থিতি খুব জটিল। সংসদ সদস্যরা এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হওয়ায় আরও জটিলতা সৃষ্টি হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা পরস্পর বিরোধী দ্বৈত ভূমিকা পালন করেন। সুনামগঞ্জ জেলায় এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে উদাহরণ টানলে দেখা যায় যে একজন এমপি দুটি উপজেলায় নৌকার পক্ষে সমর্থন করেন ও প্রচারণা করেন, এবং অন্য একটি উপজেলায় নৌকার বিরুদ্ধে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এছাড়াও অন্য জেলা পর্যায়ের একজন নেতা এসে এক জায়গায় নৌকায় বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান ও অন্য জায়গায় নৌকায় পক্ষে প্রচারণা চালান। একইসঙ্গে দলীয় প্রতীক বরাদ্দকরণ এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তিদের দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে লড়াই, সমর্থন বা প্রচারণা করার সুযোগ দেওয়ার ফল সাংঘাতিক। এতে স্থানীয় পরিমণ্ডলে দলের কর্মী, অনুসারী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সাধারণ ভোটাররা বিব্রত বোধ করেন।

এমন পরিস্থিতিতে কিছু জায়গায় দলীয় প্রতীক প্রার্থীর জন্য বোঝা হয়ে যায়। বিশেষ করে এমন জায়গায় যেখানে বিরোধী দলের কর্মী ও অনুসারীরা নিভৃতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় সিনিয়র নেতারা দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেন। স্থানীয় নির্বাচনে (এমনকি যখন একদলীয় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানে) জনগণের বাইরে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের নতুন মাত্রার প্রভাব বিতর্কিত। যেখানে স্থানীয় শক্তির (যেমন এমপির) প্রভাব ও স্থানীয় নেতৃত্বের স্থানীয় ক্ষমতা-কেন্দ্রিক মোহাচ্ছন্নতা বা মুগ্ধতা পার্টি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে যায়, সেখানে দলীয় প্রতীক ঝুঁকি লাইনের মধ্যে পড়ে। বিপরীত পরিস্থিতি দলীয় প্রতীককে ঝুঁকি থেকে উত্তরণে সাহায্য করছে।

একটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল চেয়ারম্যান প্রার্থী যদি একই মঞ্চে বসতে পারতেন, তাহলে তারা সম্প্রীতির সাথে স্থানীয় জনসাধারণের কাছে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার ও স্থানীয় শাসন পরিচালনার ধরণ সম্পর্কে তুলে ধরতে পারতেন। আর প্রার্থীরা যাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চান সে সমস্ত জনগণ তাদের সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের ইচ্ছা কতটা জনবান্ধব, জন-অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তব ভিত্তিক হবে সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারতেন এবং মুক্ত প্রশ্ন করতে পারতেন। এমনকি প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে এনিয়ে গঠনমূলক বিতর্ক করতে পারতেন। স্থানীয় জনগণও তাতে দ্বিধাহীন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে পারতেন এবং তাতে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হত। একইভাবে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও এটি করা যেতে পারত।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বর্তমান রাউন্ডে, আমি যেখানকার ভোটার সুনামগঞ্জ জেলার "ধর্মপাশায়" এবং পরে একই জেলার "জামালগঞ্জ" উপজেলায় এই উদ্যোগটি পাইলটিং করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম ক্ষেত্রেই প্রার্থীদের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পাইনি। নির্বাচন কমিশন যদি সুশীল সমাজকে এই মডেল পাইলটিং, চর্চায় ও প্রতিষ্ঠায় কৌশলগত ও কিছুটা রিসোর্স সহায়তা করেন এবং/অথবা প্রার্থীরা নিজেদের মর্যাদা ও জনগণের ভোটের উপর আস্থা রাখতে পারেন এবং স্বেচ্ছায় এ মডেল পাইলটিংয়ে সহায়তা করেন, তবে এটি কার্যকরীভাবে করা সম্ভবপর হবে।

বিকেন্দ্রিকরণ, গণতন্ত্রায়ন, নির্বাচন ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অংশীদারগণ এবং গণমাধ্যম এতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সহায়তা করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন, উন্নয়ন অংশীদারগণ, গণমাধ্যম এবং/অথবা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরবর্তী রাউন্ডে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে) এই মডেলটি পাইলটিং করতে সমর্থন ও সহায়তা করেন তবে এটি কার্যকর করা যেতে পারে।

  • ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার: গবেষক; এসোসিয়েট প্রফেসর (সরকার ও রাজনীতি); পরিচালক (গবেষণা), এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ। ইমেইল: [email protected]

আপনার মন্তব্য

আলোচিত