সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ ইং

আলমগীর হোসাইন

০৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১২:১৪

এ অবস্থা আর কত?

নিরুপায় আমরা অসহায়ের মতো হত্যার বিচার দাবিতে সড়কে দাঁড়াই; সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ, সকল ধরনের নির্যাতন, ঘুষ দুর্নীতি আইনের অপব্যবহারে বিরুদ্ধে, ন্যায্য অধিকার কিংবা চাকরির দাবিতেও বিক্ষোভে দাঁড়াতে হয় সড়কে। নইলে যে টনক নড়বেনা সংশ্লিষ্টদের! উদাস কর্তাদের মগজে আমাদের আর্তনাদ পৌঁছে দিতে সড়ক অবরোধই এখন চূড়ান্ত হাতিয়ার। কারণ মিছিল, মানববন্ধন, স্মারকলিপি এখন আর এতটা কাজে দেয়না, এগুলো খবরের কাগজে ছাপা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। এ সীমা বড়জোর অতিক্রম করে আশ্বাসের বাণীতে। কিন্তু আশ্বাসে-আশ্বাসে যখন আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার জন্য আচমকা আমরা বাধ্য হই, তখন সড়কের অবরোধের মতো কঠিন আন্দোলনের বিকল্প পথ পাইনা। আমরা নিশ্চয়ই শখের বসে কেউ সড়ক অবরোধ করিনা, কিন্তু “যার চলে যায় সেই বুঝে হায় বিচ্ছেদের কি যন্ত্রণা"। এ কথাটির মতো, আমাদের বুকের ভেতরটায় যখন যন্ত্রণার আগুন ধরে তখন আর কোন পথ না পেয়ে এ পথ ধরি। অথচ আমরা ভালভাবেই জানি এ সড়ক অবরোধ ব্যাপারটি হরতালের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

হরতালের পূর্বে অন্তত খবর পাওয়া যায় যে হরতাল হবে, এ জন্য আমরা কোথাও যাওয়া বা না যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাই, কিন্তু অবরোধেরবেলায় সিংহভাগ মানুষই থাকে অজ্ঞাত। এতে করে আচমকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়ি আটকা পড়ে। যার ফলে ঐ অবস্থায় পড়া ব্যক্তিরা মারাত্মক অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়। কারণ যারাই গাড়িতে করে কোথাও যাওয়ার জন্য বের হয় তাদের ৯৯ ভাগ মানুষই জরুরি প্রয়োজনে বের হয়। অবরোধের জ্যামে অনেক সময় আটকা পড়ে মুমূর্ষু রোগী, যদিও অবরোধের বেলায় দেখেছি মুমূর্ষু রোগীর গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকে অবরোধকারিদের, কিন্তু অনেক সময় সামনে পেছনে অসংখ্য গাড়ি থাকায় জ্যাম ডিঙিয়ে গাড়িটি ঠিকঠাক সামনে যেতে পারেনা, তাই ঘটে যায় মৃত্যু, শুধু কী তাই? সড়ক অবরোধে আটকা পড়ে বিদেশ যাত্রীর ফ্লাইট মিস হয়, অনেকে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য বের হয় কিন্তু ফ্লাইট মিসের কারণে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। পরীক্ষার্থী পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। আটকা পড়া মালবাহী গাড়ি সময়মত পৌছাতে না পারায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এর সাথে সংশ্লিষ্টরা। গরমে গাড়িতে বসে থাকা শিশু, মহিলা সহ অনেক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে সব মিলিয়ে অবরোধে আটকা পাড়া যাত্রীদের অসহনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয়। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রীদের কষ্টের সীমা থাকেনা। আর মাঝেমধ্যে কিছু উগ্র মেজাজিদের দেখি যারা অবরোধের সময় গাড়ি ভাঙচুর সহ মারমুখী হয়ে ওঠে এতে করে আহত হয় চালক ও যাত্রীরা। কে নেবে এই দায়ভার?

তবে অবাক করা ব্যাপার হলো আজকাল আন্দোলনের এই কঠিন পর্যায়টিও এতোটাই কমন আর বিরতিহীনভাবে হচ্ছে যে জনদুর্ভোগ ছাড়া এটিতে আর বিশেষ কোন কাজ হচ্ছেনা। ঘনঘন এন্টিবায়োটিক গ্রহণে যেমন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, এবং দিনদিন আরও উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে এভাবে একসময় শরীরে এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে। আমাদের রাষ্ট্রীয় রোগ সরাতে এন্টিবায়োটিকের মতো সড়ক অবরোধও অকার্যকর হচ্ছে।

যার কারণে যা হওয়ার কথা, তা না হয়ে একেকটি ঘটনার পর আন্দোলন থামাতে গিয়ে আমাদের মন্ত্রীরা মাঝেমধ্যে এমনভাবে কথা বলেন, যেন তাদের কাছে একটা করে আলাদীনের চেরাগ আছে। ঘরে বসে বসে কুপির দৈত্য দিয়ে এক নিমিষেই সব সমস্যা সমাধান করিয়ে নেবেন। অথচ সমস্যা সমস্যার জায়গাতেই থাকে, বরং আরও একটি বড় সমস্যা সামনে আসে। মানলাম তারা স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। কিন্তু উদ্যোগ আর পরিকল্পনাহীন এসব স্বপ্নের কথাতো হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই না। প্রধানমন্ত্রী তাই যথার্থই বলেছিলেন আপনারা কম কথা বলুন, নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝার চেষ্টা করুন, বেশি বেশি কাজ করুন । কিন্তু এরপরেও কথা কমছেনা, কাজও হচ্ছেনা।

অথচ সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যদি সকল ধরনের বৈষম্য দূর করা যায়, আইনের শাসন সু-প্রতিষ্ঠিত করা হয়, দক্ষ চালক, পরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগ, ঘুষের বদলে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশাসনের দুর্নীতি রোধ , এবং সর্বোপরি আমরা প্রত্যেকে যদি সত্য এবং সুন্দরকে প্রতিষ্ঠিত করতে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে উঠি তবেই আর সড়ক অবরোধের প্রয়োজন হবেনা। জানি এমন কোন যাদুমন্ত্রও নেই যে সবাই একসাথে ভাল মানুষ হয়ে উঠবে, এমন কোন কথা নেই যে সব অপরাধ এক নিমিষে উঠে যাবে। কিন্তু আইনের কড়াকড়ি থাকলে অন্যায়কারীদের বাড়াবাড়ি নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। নিশ্চয়ই কর্মসংস্থান পেলে কেউ আর কুকর্মে জড়াতে চাইবেনা, অপসংস্কৃতি অপসারিত হলে অপরাধ জাগ্রত হবেনা।

যখন লেখাটি লিখছি তখন টেলিভিশনের পর্দায় আরও একটি ব্রেকিং নিউজ। "চট্টগ্রামে লেগুনার ধাক্কায় স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া ফেণীতে আলিম পরীক্ষার্থী ছাত্রীর গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা, গাইবান্ধায় বাস উল্টে ৫ জন নিহত হওয়ার মতো আরও কিছু ব্রেকিং নিউজ।

এ লেখাটি কোনো গণমাধ্যমের এক পাতায় থাকবে অন্য পাতায় থাকবে হয়তো কোন আরও কোন হত্যা, দুর্ঘটনার, কিংবা ঘুষ, দুর্নীতি ধর্ষণের খবর অথবা এগুলোর প্রতিবাদে কোথাও আন্দোলন, সড়ক অবরোধের খবর। একেকটি ঘটনার পর দেখা যাবে দায়িত্বশীলরা সাময়িক নড়েচড়ে বসে। আমরাও বিবেকবান হয়ে উঠি। সময়ের সাথে সাথে সেই আমরাই আবার বিবেকের বিসর্জন করে হয়ে উঠি হিংস্র, সংশ্লিষ্টজনরাও সব ভুলে যায়। যার ফলে সমাজে থেকে যায় জঞ্জাল, যন্ত্রণা, সব কিছু হয়ে যায় সেই যেইসেই।

কিন্তু এ অবস্থা আর কতো? কতকাল চলবে? আর কতো অধিকার বঞ্চিত হবো, আর কতো নির্যাতন সইবো, আর কতো লাশের বিনিময়ে আমরা পাবো জীবনের নিরাপত্তা?

  • আলমগীর হোসাইন: শিক্ষার্থী।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত