রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯ ইং

অপূর্ব অনির্বাণ

০৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:২৩

গণমুখী শিক্ষা এবং গণরাজনীতির ‘মানিক স্যার’

'তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা।
ওই-যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভীড় আকাশের নীড়,
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি,
তুমি কি তাদের মতো সত্য নও।
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি।'
...
'নয়নসমুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই— আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে—
তব সুর বাজে মোর গানে,
কবির অন্তরে, তুমি কবি—
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।'

এটা কেবল সদ্যপ্রয়াত পিতার ছবির পানে তাকিয়ে নীল বেদনায় কাতর একজন পিতৃ-আদর্শে বিকশিত সন্তানের অশ্রু মোচনের গান নয়, বরং রবিঠাকুরের এই গানের কথার মাঝে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, সাহিত্যসেবী, কবি, লেখক, নারী-পুরুষ অধিকার আদায় নেতা, কৃষকদের প্রাণের নেতা, শ্রমিকদের আদর্শিক ঠিকানা— এই সব পরিচয়কে— নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি— এই কথার মাঝে খোঁজার প্রয়াসও।

বাবা— আমার বাবা— মানিক লাল রায়— অপ্রাতিষ্ঠানিক গণমুখী শিক্ষা আর গণরাজনীতির পথিকৃৎ— একনামে সবার কাছে যিনি 'মানিক স্যার' নামেই পরিচিত— তিনি আজ কৃষকের ফসলহীন বা ফসলভরা মাঠে, শ্রমিকের ঘাম ঝরা হাটে, বর্ষার কৃষক-জেলের ভাসান পানিতে কিংবা সকাল থেকে রাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের গণমুখী শিক্ষাদানে— কোথাও আজ আর তিনি দৃশ্যত নেই— আমার ৩৭ বছরের জীবনে যাঁকে অন্তত ৩২ বছর 'অসম্ভব মানুষ', 'অসাধ্য নায়ক', কিংবা 'নির্মোহ জন' হিসেবেই ভেবেছি— পেয়েছি বন্ধুর সাহচর্য, শিক্ষকের প্রেরণা, বস্তুবাদী আদর্শ তথা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজন মানুষ যিনি জীবন-জগতের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন, যিনি সমাজ বিকাশ এবং বিবর্তনের তাত্ত্বিক এবং প্রয়োগবাদী— তাঁর সন্তান হওয়া নিশ্চয়ই অনেক বড় এক পরিচয় এবং নিজেকে বিকাশের সুযোগ; কিন্তু সেই পরিচয় বা সুযোগকে বাস্তবে ধারণ-লালন-চর্চার মাধ্যমেই সম্ভব তাঁকে, তাঁর সময়কে এবং সেই ইতিহাসের আলোকে বর্তমানকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং আরও সঠিকভাবে বললে— তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের নারী-পুরুষ বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এক মানবিক সাম্যের সমাজ গড়ার জন্য আত্মনিয়োগ করা।
 '৭০-র দশক থেকে '৯০-র দশক— অন্তত এই ৩০ বছর ছিল তাঁর 'গণমুখী শিক্ষা' আর 'গণরাজনীতিকাল'। আমার বয়স যখন ছয়/সাত অর্থাৎ সেই '৮৭/'৮৮ সাল থেকে আমি বাবাকে 'অধ্যয়ন' করছি। অধ্যয়ন করছি বললাম, কারণ, সেই শৈশবটা হলো শেখার, জানার আর আশ্চর্য হবার বয়স। বিজ্ঞানে 'সহজাত প্রবণতা' (Instinct) বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ কিছু না জেনে, না বুঝেও বংশপরম্পরায় একই কাজ করা। যেমন— জন্মের পর হাসের বাচ্চা পানিতে সাঁতার কাটে, বাছুর লাফায় ইত্যাদি। এসবই করে মাকে দেখে।  আমিও তখন থেকে বাবা আর তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সাথে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে ফুল দিতে যেতাম খালি পায়ে হেঁটে, শহীদ মিনারের সামনে বাবার জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনতে চলে যেতাম, ফুটবল মাঠে ছাত্রদের কীভাবে গণিতের নিয়মে খেলতে হবে বাবার তা বোঝানো বিস্মিত চোখে দেখতাম, পাবলিক লাইব্রেরি বা বি ডি হল-এ গণমুখী নাটক দেখতে যেতাম। আর সবচেয়ে বেশি যে কাজটা করতাম তা হলো, পড়ানোর পাশাপাশি যখন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, দর্শন নিয়ে যে আলোচনা করতেন তার একনিষ্ঠ শ্রোতা হতে। সেই ১০/১১ বছর বয়সেই বাবাকে এক 'অসম্ভব মানুষ' মনে হতো, আর ভাবতাম একজন মানুষ এত কিছু জানে কিভাবে! একজন মানুষের কাছে এত মানুষ আসে কেন, কীভাবে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাবার সাথে কথা বলে, বাবার কথা শুনে,  আলোচনা করে, এমনকি হাসিমুখে তর্ক-বিতর্ক। আমার মনে হয়, একজন শিক্ষকের মাঝে যে দূরত্বহীন বন্ধুমন থাকা প্রয়োজন— বাবার সহস্র শিক্ষার্থী বাবার মাঝে তা দেখেছেন বা পেয়েছেন।

যতই বয়স বেড়েছে বাবার সাথে বন্ধুত্বটা ততই গাঢ় হয়েছে। ৭ম/৮ম শ্রেণীতে ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা', 'পৃথিবীর পথে', 'পৃথিবীর পাঠশালায়' বইগুলো পড়ে শেষ করেছি। নজরুলের 'বিদ্রোহী', 'সাম্যবাদী' কিংবা সুকান্তের 'ছাড়পত্র' আর শরৎ এর 'পল্লীসমাজ', 'পথের দাবি' আমার তখনই পড়া শেষ। এসবই বাবার কারণে, বাবার পাঠাগারের বই পড়ে— যা কোন স্কুল-কলেজে তেমন চোখে পড়ে না— পাঠ্যবইয়ে  তো নয়ই, এমনকি লাইব্রেরিতেও।

৮ম শ্রেণীতে পড়ার সময় অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে মার্কস-এঙ্গেলস- এর দর্শন— দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Dialectical and Historical Materialism) সম্পর্কে জ্ঞানলাভ, যে গল্পের শেষ নেই, ছোটদের রাজনীতি, অর্থনীতি বইগুলো পড়া শেষ। '৯৫ সালে বাবা ভীষণভাবে অসুস্থ হলেন। 'ফ্রি কোচিং সেন্টার'- এর মাধ্যমে দিন-রাত ১৫/২০ জন-এর ৮/১০ টি ব্যাচ পড়ানো, আর জ্বালানি হিসেবে ৩০/৪০ কাপ চা আর ৩০/৪০ টি সিগারেট তাঁর শরীরে একটু হলেও কাঁপন ধরালো— যক্ষ্মা ধরা পড়লো। বাবা বিছানায়। জীবনে কখনো ব্যাংকের কাছে যাননি, টাকা জমাননি (আসলে আদর্শ হিসেবে পুঁজিবাদী সুদনির্ভর ব্যাংক ব্যবস্থাকে তিনি পছন্দ করতেন না); তবু তাঁর দুশ্চিন্তা নেই, তাঁর বিশ্বাস— তাঁর অগণিত প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী, হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক— তারাই পাশে থাকবে; যেমনটি তিনি ছিলেন। সেই সময় তাঁরা ছিলেনও। এই অবকাশে তাঁদের সবার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা। সেই অসুস্থ সময়েও বাবার পড়ার ইচ্ছা ছিল। অসুস্থতার পুরো দায়িত্ব মা একাই সামলালেও, প্রতিদিন থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপা, ওষুধ আনা— এসব আমি-ই করতাম। একদিন বাবা আমাকে সেই বিছানায় থাকা অবস্থায় এঙ্গেলসের 'এ্যান্টিড্যুরিং' পড়ে শোনাতে বললেন। আমি সারা দিন এবং সারা রাত এই দার্শনিক গ্রন্থ বাবাকে পড়ে শোনালাম, কিছু জিনিস না বুঝলে বোঝে নিলাম। জানি না, এটা কি শুধুই বাবার পড়ার ইচ্ছা ছিল নাকি আমার মাঝেও সেই জ্ঞানের আলো ছড়ানোর তাঁর পরোক্ষ প্রয়াস ছিল! পরোক্ষ বললাম, কারণ বাবা আমাকে কোনদিন জোর করে কিছু চাপিয়ে দেননি। পথ দেখিয়েছেন, কিন্তু পথে হাঁটা, না-হাঁটার সিদ্ধান্ত নিজে দেননি, আমি তাঁর আলো দেখানো পথে হেঁটেছি। কেননা, তিনি ছিলেন আমার কাছে 'অসাধ্য নায়ক'।

কত-শত স্মৃতি, লিখলে বই হবে। সেটা পরে করব। একটা স্মৃতি খুব মনে পড়ে। সেই '৯৫ সালে অসুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন বাসায় শত শত মানুষ বাবাকে দেখতে আসছেন। সাথে বাবার জন্য খাবার, ফল, কতকিছু। একদিন একজন ভাসান জলের জেলে কিংবা সর্বহারা কৃষক কিংবা মিলের শ্রমিক— কেউ একজন হবেন— আমার হাতে হাত রেখে, মুখটা নিচু করে, আমার হাতে 'দশ' টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন, আমি স্যারের জন্য কিছু আনতে পারিনি, এ টাকাটা আমার হাতে আছে, তুমি রাখলে আমি খুব খুশি হবো। আমি জানি, হয়তো এটাই তাঁর আজকের সম্বল, আমি নিতে রাজি হইনি, কিন্তু তাঁর চোখের পানি দেখে বুঝলাম, তাঁর ভালবাসাকে অবমূল্যায়ন করার অধিকার আমার নেই।

৯০’র দশকে একবার কৃষক আন্দোলনের সময়ে আমিও বাবা এবং অন্যান্য নেতা-কর্মী-ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে তাহিরপুর (বর্তমান বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষিত টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকা) গিয়েছিলাম। বাবা সেখানকার একজন স্থানীয় কৃষক নেতার বাসায় ছিলেন। আমাকে সেই গ্রামের সবচেয়ে ভাল বাসায় তাঁরা নিয়ে গেলেন, ভাল খাবার দিলেন রাতে। সেখানে কত নারী-পুরুষ আমাকে দেখতে এসেছেন! সেই ছোট আমাকে! তাঁরা বাবাকে নিয়ে কত গল্প বললেন। একজন বৃদ্ধা তিন দিন ধরে হেঁটে অনেক দূর থেকে এসেছেন বাবাকে দেখতে। একজন লোক অনেকদিন পর বাসায় পিঠা বানিয়েছেন (নিশ্চয়ই পিঠা বানানোর টাকা তার ছিল না) আমাকে এবং বাবাকে খাওয়ানোর জন্য। পরে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'তুমিও আমার সাথে ভালো বাসায়, চিকন চালের ভাত, হাওরের মাছ, পিঠা খেতে থাকলে না কেন?' বাবা বলেছিলেন, 'জনগণের সত্যিকারের নেতা জনগণের সাথে থাকে, নাহলে জনগণ বিশ্বাস করে না।' কী চমৎকার যুক্তি, রাজনৈতিক দর্শন। কারো কাছে যখন শুনি, মানিক স্যার শুধু আলোকিত ছাত্র-ছাত্রীই তৈরি করেননি, তিনি নেতা তৈরিরও কারিগর, তখন মনে হয়, তাঁরা অত্যুক্তি করেন না।

বাবা যুক্ত ছিলেন 'নাগরিক অধিকার সংঘ' নামক সামাজিক সংগঠন এবং আন্দোলনে যা '৮০'র দশকে সুনামগঞ্জের নাগরিক আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা এনেছিলো হাজার মানুষের স্লোগানে আর প্রশাসনকে দাবি আদায়ে বাধ্য করাতে। যুক্ত ছিলেন ' আমরা কতিপয় তরুণ সাহিত্যসেবী' নামক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনে— যেখানে একসময় জাতীয় পর্যায়ের লেখক তৈরি হয়েছিল। গড়ে তুলেছিলেন 'রবিদাম দীনেশ চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার' নামক জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি-সাহিত্যের বই সমৃদ্ধ পারিবারিক পাঠাগার। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আরও একটি অংশ হলো,  ছাত্রদের নিয়ে গড়া ফুটবল দল— 'জাগ্রত একাদশ'। বাবা বলতেন, 'সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো মৌলবাদ-কূপমণ্ডুকতা থেকে উত্তরণের উৎকৃষ্ট উপায়'।

রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছিলেন 'জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট', 'কৃষক সংগ্রাম সমিতি', 'ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ' এর  কেন্দ্রীয় এবং জেলা কমিটিতে এবং জাতীয় ছাত্রদল পরিচালনার কার্যক্রমে। সেই '৮০ আর '৯০-এর দশকে কৃষক আর ভাসান পানিতে জেলেদের মাছ ধরার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সুনামগঞ্জ শহরে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ কিংবা তাহিরপুরে জনভয়ে ডাঙ্গা পুলিশের পলায়ন, ইজারাদারের আত্মসমর্পণ, হাজার হাজার বারকি শ্রমিকের শহর কাঁপানো মিছিল— এসব যদি আজকের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সময়ে হতো— তাহলে শুধু সুনামগঞ্জ নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষও তাঁকে একনামে চিনত।

শুধু তো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত থাকা নয়, লেখালেখি এবং সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। '৮০'র দশকে এবং ৯০'র দশকের অর্ধকাল তিনি মাঝে-মধ্যে লিখতেন। সেই সময়ে 'কদম আলী চাষী' আর 'আঃ ছালাম ভদ্র'— এ দুটি ছদ্মনামে লিখতেন বাবা। নিজের কিছু তো নিজে সংগ্রহে রাখেননি, পারিবারিক কাগজপত্র ঘেটে মা'র সংগ্রহে  পেলাম বাবার সম্পাদনার ১৯৮৮'র বুলেটিন 'চাষী'— যেটিতে তিনি কদম আলী চাষী ছদ্মনামে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষিতে লিখেছেন 'চাই বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান'। এই লেখায় তিনি বন্যা সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ এবং সমাধানের উপায়সমূহ দেখিয়েছেন— যা সারা দেশের বন্যা সমস্যা সমাধানের জন্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

নাগরিক অধিকার সংঘের প্রথম বুলেটিন-এ পেলাম বাবার আঃ ছালাম ভদ্র ছদ্মনামে ৩২ লাইনের লিখা জ্বালাময়ী 'কৃষক শ্রমিকের গান' (কাস্তে চালাও লাঙ্গল চালাও/  চালাও কলের চাকা/ কৃষক তুমি  ক্ষেতের মালিক/ শ্রমিক কলের রাজা (লেফট——রাইট——লেফট———)/ কৃষক তুমি নাইরে জমিন/  তুমি সর্বহারা/ শ্রমিক তুমি শ্রমের মালিক/ তুমি দিশেহারা।/ কোথায় গেল  তোমার জমিন/  কোথায় হালের গরু/ তোমার ঘরে ভাত নাই কেন/ কি কাজ করবে শুরু?/ শ্রমিক তোমার শ্রমের মূল্য/  দেয়না কেন মিলমালিক/ ক্যামনে তুমি করবে আদায়/ শ্রমের মূল্য সঠিক।/ তোমার শত্রু সাম্রাজ্যবাদ/  আর যত মিলমালিক/ তোমার শ্রমকে শোষণ করে/ গড়ছে দালান কোঠা ঠিক।/ সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ/ মুৎসুদ্দী পুঁজির চক্র/ শোষণ তোমায় করছে তারা/ হতেই হবে বক্র।/ কৃষক তুমি গড়ে তোল/ সর্বহারার কৃষক দল/ শ্রমিক তুমি গড়ে তোল/  সর্বহারার শ্রমিক দল।/ তোমার মুক্তি তুমিই আনবে/ হতেই হবে শক্ত/ মিত্র চিনে আনতে হবে/ জন গণতন্ত্র।)।'

'সুনামগঞ্জের কবিতা' নামক সংকলনগ্রন্থে পেলাম বাবার তখনকার সুবিখ্যাত এবং বারংবার আবৃত্তিকৃত কবিতা 'যুদ্ধ শান্তি এবং যুদ্ধ' (বাজারে চালের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ/ কী করে কাটাই বলো বছরের শেষ দিনগুলো/ দ্রব্যমূল্যের ঘোড়া ছুটছে ঊর্ধশ্বাসে অনুন্নত দেশের উপর/ বেপরোয়া সহিস এক মেতেছে খেলায়/ থামাতে চায় না ঘোড়া/ বরং পিষ্ট করে দিতে চায় আমাদের ভাঙ্গা পাঁজর/ আমরা তো নিরীহ গোবেচারা শান্তিপ্রিয়/ বাড়াই না কালো হাত সাম্রাজ্যবাদের মতো কিংবা উড়াই না বিজয়ের ঘুড়ি বিজিত দেশের উপর/ কিন্তু তোমরা আজ কোন সাহসে/ অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছো পাণ্ডবের মতো/ আমার দেশের ভেতর/ এ সাহস তোমাকে কে দিলো?/ তুমি কি জানো না/ তোমার অশ্বটাকে কেড়ে নেবো/ রেখে দেবো অশ্বালয়ে/ এ আমার অহংকার নয় বরং জাতীয় পৌরুষ/ তোমার অহংকারে করবে আঘাত বব্রুবাহনের মতোই হত্যা করবো পাণ্ডুর তৃতীয় ঔরষ।/ জানি এর পরিণতি যুদ্ধ ছাড়া কিছুই নয়/ কিছুই হতে পারে না/ তাই বলে আমি ভীরু কাপুরুষ নই/ তোমার অশ্বটাকে নির্বিচারে আমার দেশের ভেতর—/ বিচরণ করতে দিতে পারি না/ তাই তুমিও ক্ষেপে যাবে উন্মাদের মতো/ তোমার বিভৎস রূপ দেখে চমকে উঠবে পৃথিবীর মানুষ/ আর এ নিদারুণ যুদ্ধ শেষে এ পৃথিবীতে/ নেমে আসবে শান্তির অমেয় ধারা।)।

১৯৯১ সালে প্রথম ভ্যাট প্রথা চালুর প্রেক্ষিতে লিখেছিলেন 'ভ্যাট প্রথার কালো থাবা' নামক বিশ্লেষণী লেখা। এরকম কিছু লেখা এবং বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পত্রিকায় প্রকাশিত খবর আমার সংগ্রহে ছিল, কিন্তু কাঠের বুক সেলফে উইপোকায় সেগুলো নষ্ট করেছে কয়েক বছর আগে!  সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বের করেছিলেন সাহিত্য পত্রিকা 'বিদ্রোহী ভৃগু' যেটাতে আমার নিজেরও একটা লেখা ছিল।সেখানে ‘ভাসান পানির আন্দোলনে বিজয় অর্জন প্রসঙ্গে’ নামক একটা লেখা ছিল বাবার। এরপর আর তেমন লিখেননি।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর কিছুকাল আগে থেকে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মতপার্থক্যে (কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন লেলিনের সেই উক্তি— 'তত্ত্ব ছাড়া প্রয়োগ অর্থহীন, আর প্রয়োগ ছাড়া তত্ত্ব বন্ধ্যা—Practice without theory is meaningless and theory without practice is sterile; এবং আরও বিশ্বাস করতেন, ‘বাস্তব আবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ’-এ) তিনি একসময় রাজনীতি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তখন আমার মনে হতো, এতটা বর্ণাঢ্য যাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শক্তি এবং নেতৃত্ব;  তিনি ডানশক্তির কোটি টাকা, এমপি, মন্ত্রী হবার অফার— এ সবকিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এবং এমনকি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস তথা নীতিগতভাবে আপোষহীন থাকার আদর্শের কারণে নিজের জীবন-যৌবনের ক্ষেত্র থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নেন— এ কেবল এক নির্মোহ মহামানবের পক্ষেই সম্ভব। যদিও ২০০২/২০০৩ সালের দিকে বাবা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজতত্ত্ববিদ শিক্ষক এবং সুপ্রীম কোর্টের একজন আদর্শিক আইনজীবী এবং আরো কয়েকজনকে নিয়ে  জনগণের নতুন দল গড়ার উদ্যোগ নিয়ছিলেন; কিন্তু শারিরিক অসুস্থতা সেই প্রয়াসকে বেশিদূর এগোতে দেয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনী'র মাধ্যমে ভারতের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন বাবা। ছিল ১৯৭২'র মূল ওসমানী মুক্তিযোদ্ধা সনদ; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মুক্তি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায়, কখনও কোন সুযোগ-সুবিধা নেওয়া বা মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আবেদন করেননি। সরকারের সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই এর সময়ে আমরা আবেদন করেছিলাম, তাঁর নামও চূড়ান্ত তালিকায় ছিল; কিন্তু গত ৫ বছরেও গেজেট প্রকাশ হলো না। ছোট ভাই গাণ্ডীব তাই আক্ষেপ করে লিখেছে, 'এ সম্মান না দেওয়ার দায় রাষ্ট্রের'।

বাবার প্রভাব এবং প্রেরণা আমার ক্ষেত্রে প্রবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে পাঁচ বছরের অনার্স-মাস্টার্স ছাত্র কোন্দল আর সেশনজটে আট বছরে (২০০১-২০০৮)  শেষ হয়। এই সময়ে বের করি দু'টি কাব্যগ্রন্থ এবং পাঁচটি সায়েন্স ফিকশন (যার দু'টি জাতীয় দৈনিক 'সংবাদ'- এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত)। এ-সবই বাবার প্রেরণা আর অবদান। প্রথম বইটি (কবিতাগ্রন্থ) তাই বাবাকেই উৎসর্গীকৃত।

বাবার সুযোগ্য ছাত্র প্রথম আলোর কৃতি সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী লিখেছেন, 'মানিক স্যার ও গণমুখী শিক্ষা অথবা সাধারণ মানুষকে নিয়ে মানিক স্যারের রাজনীতি— এ দুটো বিষয় সহস্রাব্দের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাবস্ত্ত হতে পারে।' আমার মনে হয়, এটা কেবল একজন আবেগতাড়িত ছাত্র কিংবা সাংবাদিকের সাধারণ উক্তি নয়; বরং একজন গণমুখী শিক্ষার পথিকৃৎ এবং গণরাজনীতির শিক্ষককে নিয়ে একজন নিবিড় পর্যবেক্ষণকারীর মন্তব্যও।
শুরু করেছিলাম, তুমি কি কেবলই ছবি গান দিয়ে, কিন্তু এ লেখা যে শেষ হবার নয়; কতকিছুই তো সংক্ষেপে লিখেছি, আর কত কথাই তো লেখা হলো না। অস্ট্রেলিয়া থেকে আসছিলাম বাবাকে ঢাকা নিয়ে চিকিৎসা করাবো, সে সুযোগ পেলাম না; ফ্লাইটে ওঠার তিন ঘণ্টা আগে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে স্কাইপে বলেছিলাম, ‘বাবা আমি আসছি, তোমাকে ঢাকা নিয়ে আসব এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে। তোমার কষ্ট হচ্ছে বাবা?’ বাবা চোখ খুলে কিছুক্ষণ তাকালেন আমার দিকে, কিছু বললেন না। বলবেন কেন, বাবা তো জীবনে কখনো নিজের কষ্টের কথা বলতেন না, যেন তাঁর কোন কষ্ট থাকতে নেই। বাবা হয়তো সন্তানকে কষ্টের অনুভূতি দিতে চাননি, কিন্তু সন্তানের এ কষ্ট যে চিরদিনের— একজন নির্মোহ মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতা— এ যে আমার আজীবনের কষ্ট। সান্ত্বনা একটাই— তুমি শুধু নও ছবি বাবা— হাজারো মানুষের হৃদয়ে এখনও বেঁচে আছো, বেঁচে থাকবে তোমার সন্তানের কর্মমাঝে— প্রায় ১৫ বছর ধরে লেখা 'বিজ্ঞানভিত্তিক মানবধর্ম' পুস্তকে তোমার বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ আর মানবতাবাদ একদিন তোমার নাম আবার বিশ্বমাঝে আনবে— এই প্রত্যাশা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি গবেষণারত এবং সদ্য প্রয়াত শিক্ষক মানিক লাল রায়ের ছেলে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত