শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

আতিকুর রহমান নগরী

০৩ আগস্ট, ২০১৯ ০২:৫৯

গণপিটুনি: হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ

গণপিটুনি মানে সম্মিলিতভাবে প্রহার করা। বর্তমানে ছেলেধরা সন্দেহে 'গণপিটুনির' ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। গত ২০ জুলাই একদিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জসহ সারাদেশে গণপিটুনিতে মারা গেছেন মোট ৪ জন। নিহতদের মধ্যে বৃদ্ধ, নারীরাও আছেন। এরআগের দিন মৌলভীবাজারের বড়লেখায় দুই যুবককে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

কারো প্রতি কোন কারণে সন্দেহ হওয়াটা স্বাভাবিক। তাই তাকে লাঠিপেটা করে আহত কিংবা মেরে ফেলার আদেশ রাষ্ট্র কিংবা কোন ধমই দেয় না।

বর্তমানে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগার গুজব ফোর-জি স্পিডে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গত কয়েকদিনে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে 'গণপিটুনি'। এর দ্বারা একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ীও যা গুরুতর অন্যায়; ধর্মের বিধান অনুযায়ীও অন্যায়। এই 'গণপিটুনি' নামের গণ-অপরাধকে রুখতে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে পরিস্কার বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনায় তদন্ত করে মামলাও করছে পুলিশ। ফোর-জি'র যুগে। ডিজিটাল যুগে মানুষ ক্যামনে এ কাজ করে। তা ভাবার বিষয়।

পদ্মা সেতুর কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানও তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছেন। সমস্যাটা শুধু আমাদের। সমস্যাটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যাচ্ছে। গুজব নামের ভাইরাসে আমাদের চারপাশ আক্রান্ত। এই গণপিটুনি দিয়ে অন্যায়ভাবে একজন নিরপরাধীকে হত্যা করছি। এর শাস্তি অবশ্যই দুনিয়াতেও আছে। পরকালে তো আছেই নির্ধারিত আজাব।

মানবতা ও নৈতিকতার কোনো স্তরেই নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ও অহেতুক রক্তপাতকে সমর্থন করা যায় না। হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, প্রতিশোধ গ্রহণের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তারা মানবতাবর্জিত ও সভ্যতার শত্রু। সম্প্রীতি ও শান্তির ধর্ম ইসলাম মানুষের জানমাল রক্ষা করার জন্য সব ধরনের জুলুম, অত্যাচার ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছে।

বিদায় হজের ভাষণে মানবতার নবী মহানবী মুহাম্মদ (স) বলে গেছেন— ‘আজ এই পবিত্র দিনে, পবিত্র মাসে এবং পবিত্র শহরে তোমাদের জন্য যেমন (যুদ্ধবিগ্রহ) হারাম, তেমনিভাবে তোমাদের জান ও মাল বিনষ্ট করাও হারাম।’ (সহীহ্ বুখারী হাদিস- ১৭৪১)। এ জন্য ইসলাম নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাকে শিরকের পর সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- ‘কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোনাহ হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা।’ (সহীহ মুসলিম হাদিস-৮৮)। অপর এক হদীসে নবী করীম (স) ইরশাদ করেন- ‘দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্যতর কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিযী)

অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনাই নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে পুরো মানব জাতির বিরুদ্ধে তা একটি ধ্বংসাত্মক কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান- ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে দুনিয়ার সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে রক্ষা করল।’ (সূরা মায়িদা, ৩২)

নিরীহ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়ে ভয়াবহ পাপ আর নেই। ইসলামী শরীয়াহ মতে পৃথিবীর সব মানুষ মিলে যদি একটি অন্যায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তবে কিয়ামতের দিন সবাইকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। নবী করীম (স) বলেন- ‘যদি আসমান ও জমিনের সব অধিবাসী একজন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যার জন্য একমত হয়, তবে আল্লাহ তাদের সবাইকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মুসনাদে আহমাদ)। হাশরের ময়দানে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের মোকদ্দমা দিয়েই আল্লাহ তার বিচারকার্য শুরু করবেন। হাদিস শরীফে এসেছে- ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবে তা হলো- রক্তপাত বা হত্যা সম্পর্কিত।’ (বুখারী শরীফ হাদিস-৬৩৫৭)

ইসলামের সোনালী যুগে প্রতিটি জনপদ নিরাপদে ছিল। একজন নারী সুসজ্জিত অলঙ্কার পরে একাকী নিরাপদে রাত দুপুরে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারতেন। তখন সংখ্যালঘুদের জান-মালেরও পূর্ণ নিরাপত্তা ছিল। কোরআন এবং আল্লাহর নবীর (স) শিক্ষা তখনকার মানুষকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছিল। আল-কোরআনে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদেরকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নানাভাবে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা কাসাস- ৭৭)।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত