শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

আব্দুল হাই আল-হাদী

০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৫:৫৫

লজিক ইজ মাই বিউটি

১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ২৩নং অনুচ্ছেদ-এ বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।

২৩ক অনুচ্ছেদ-এ বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।'

২৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমন্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।'

এসব বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ-এ আইন আছে যেটি পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮ নামে পরিচিত। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রত্নতাত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, স্থাপনা ও আর্টিফেক্ট রক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।

এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সকল জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে সংরক্ষণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

২. 'শ্রীহট্ট লক্ষ্মীর হাট আনন্দের ধাম'। অগণিত পীর-ফকির-ওলী-আউলিয়া-দরবেশ-সাধু-সন্ন্যাসী-বাউল-আউলের দেশ সিলেট। হজরত শাহজালাল, শাহপরান, রাধারমণ, আরকুম শাহ, ইব্রাহিম তশনা, দুরবীন শাহ, শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিধন্য সিলেট। প্রকৃতি তাঁর আপন হাতে দুহাত উজাড় করে সাজিয়েছে এ জনপদকে। এ নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন।

এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছড়িয়ে আছে উত্তর-পূর্ব সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটে। বিশেষ করে জৈন্তাপুরে প্রাগৈতিক ও ঐতিহাসিককালের অনেক হেরিটেজ রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের অনুপম সাংস্কৃতিক নিদর্শন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মানুষের সর্বনাশী হাতের ধকল সহ্য করে সেগুলোর অনেকগুলো এখনো টিকে আছে।

৩. পর্যটনের বিকাশে ঐতিহাসিক দিকটিকে গুরুত্ব দিতে হবে-এরকম দাবি দীর্ঘদিন থেকে করে আসা হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশ কেবলমাত্র তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পর্যটকদের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে এবং সেসব দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ কিন্তু এসবের উপর নির্ভরশীল। যেমন-মিশর।

সিলেটে এসে পর্যটকরা চলতি পথে সাবেক আমলের অনেক পুরাকীর্তি দেখেন কিন্তু সেগুলোকে চিহ্নিত করার বা ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে মারাত্মক বিভ্রান্তির সম্মুখীন হন। একজন হেরিটেজকর্মী হিসেবে ব্যাপারটি দৃষ্টিগোচর হয়। তাই সেটি দূর করা ও একই সাথে ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে ধারাবাহিক একটি সিরিজ লেখায় হাত দেই যার প্রথম ফসল হচ্ছে ’সিলেটের প্রত্নসম্পদ’ বইটি। পরবর্তী বইয়ের কাজ চলমান আছে। বইটির মূল লক্ষ্য ছিল- ইতিহাসের সাথে বর্তমানে টিকে থাকা প্রত্নসম্পদের মেলবন্ধন ঘটানো, যাতে একজন উৎসাহী পাঠক ও আগন্তুক সহজে স্থান ও স্থাপনাগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারেন। বইটি সুধী মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বুক হিসেবেও সিলেবাসে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

৪. 'সিলেটের প্রত্নসম্পদ' বইয়ের প্রত্যেকটি লেখায় বর্তমানের সাথে ইতিহাসের সংযুক্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক লিটারেচার রিভিউ করা হয়েছে যাতে ঐতিহাসিক কোন সত্যের বিচ্যুতি না ঘটে। সম্পূর্ণ নির্মোহ ও বস্তুনিষ্টভাবে লেখক প্রত্যেকটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনার বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এরপরও কোথাও কোন বিচ্যুতি ঘটলে দলিল-দস্তাবেজ দিয়ে লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তা পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করা হবে- এমনটি বইয়ের 'লেখকের কথা' অংশে বলা হয়েছে।

৫. 'সিলেটের প্রত্নসম্পদ' বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে 'জৈন্তেশ্বরী বাড়ী', মূলত: সিন্টেং বা জৈন্তা রাজাদের পূজিত দেবতার বাড়ী। রাজারা বিশেষ করে যশোমানিক থেকে প্রায় প্রত্যেক রাজাই এ বাড়িতে স্থাপিত দেবতার পূজা করেছেন। তাঁরা সেবায়েত নিয়োগ করেছেন এবং এদের নামে প্রচুর দেবোত্তর সম্পত্তি প্রদান করেছিলেন। শত্রু দমনের এই বিজয়ের পর যশোমানিক কোচবিহার গমন করেন এবং কোচরাজ লক্ষ্মীনারায়ণের কন্যাকে বিয়ে করেন। সে বিয়েতে যৌতুকস্বরূপ ধাতুনির্মিত মূল্যবান একটি দেবমূর্তি প্রাপ্ত হন। দেবী কালীর সে মূর্তিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে জৈন্তাপুরে নিয়ে মহাসমারোহে ’জৈন্তেশ্বরী কালী’ নামে প্রতিষ্ঠিত করেন। স্যার এডওয়ার্ড গেইট তাঁর দ্য হিস্টোরি অফ আসাম বইয়ে এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘It is said that he brought back with him the image of ‘Jointesvair’ which was thenceforth worshipped with great assiduity at Jaintapur ( Gait: 1897, Chapter 11, Page:257)।

শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, ফজলুর রহমান, আব্দুল আজিজ মাস্টার, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা একই মত পোষণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুর্তজা আলী তার দি হিস্টরি অফ জৈন্তা বইয়ে মন্তব্য করেন ‘He married a daughter of the Koch King Laxminarin (1587-1627). At the time of the marriage he got as dower an image of Kali which was installed as Jayanteswari. The remnants of the walls with raised engravings of tigers, elephants and other wild animals are still to be seen. (Syed Murtaza Ali: 1954)'।

যশোমানিকের পূর্বে রাজদরবারে জৈন্তা বা সিন্টেং রীতি-নীতি পালিত হতো। কিন্তু এ মূর্তি স্থাপনের পরেই রাজকীয় পরিবারে হিন্দুদের মূর্তিপূজা শুরু হয়। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দেবীর মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। আপাতত: ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ ও গবেষকদের প্রদত্ত তথ্য থেকে বর্তমান লেখক নিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসী যে এর বাইরে আপাতত কোনো সত্য নেই। ইতিহাসের এ সত্যকে যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে গ্রহণ করা কিংবা খারিজ করার অধিকার সবার আছে। আমার বিশ্বাস, নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে হয়তো আরও কোন সত্য উদঘাটিত হতে পারে। নতুনকে গ্রহণ করা এবং নিজের প্রদত্ত লেখা সংশোধন করার মানসিকতা বর্তমান লেখকের রয়েছে।

৬. যে কোনো লেখকের জন্য অবশ্যই ব্যাপারটি সম্মানের ও সুখের- যখন তার বইটিকে কোথাও রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোকে পর্যটক ও এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত করার লক্ষ্যে যে প্রয়াস নিয়েছেন, সেখানে ’সিলেটের প্রত্নসম্পদ’ বইকে রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণ করেছেন জেনে সত্যিই আমি আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। সেজন্য লেখক হিসেবে লেখকের দায়ও বেড়েছে অনেকগুণ।’

বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমন্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’ সংবিধানে প্রদত্ত এ অনুচ্ছেদ বলে পুরাকীর্তি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং উপজেলা প্রশাসন সে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি। সত্য সর্বদাই কঠিন এবং সেটি মেনে নেওয়া আরও বেশি কঠিন কাজ। একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে, অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে দ্বিমত-ভিন্নমত পোষণ করার এখতিয়ার সবার আছে। নির্মোহ ও বস্তুনিষ্টভাবে ঐতিহাসিক ব্যাপারগুলোর ব্যাপারে কারও ভিন্নমত থাকলে তা যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে উপস্থাপনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ 'লজিক ইজ মাই বিউটি'। লজিক ইজ দ্য বিউটি অব এ সিভিলাইজড সোসাইটি।

তথ্যসূত্র:
১. আজিজ, মোহাম্মদ আবদুল; জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস, জুন-১৯৬৪, জৈন্তাপুর, সিলেট।
২. হক ,মো.ফয়জুল; জৈন্তা রাজ্যের পৌরাণিক ইতিহাস, মে ২০০৯ জৈন্তাপুর, সিলেট।
৩. চৌধুরী, জেএন; দ্য খাসি পিপল-, শিলং, মেঘালয়, ইন্ডিয়া, ১৯৯৬।
৪. পাতাম, রুশ; খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, অক্টোবর, ২০০৫; ঢাকা, বাংলাদেশ।
৫. রহমান, ফজলুর; সিলেটের মাটি সিলেটের মানুষ,ফজলুর রহমান, ১৯৯১।
৬. আলী, সৈয়দ মুর্তজা, দ্য হিস্টরি অফ জৈন্তা, রমনা, ঢাকা, ১৯৫৪।
৭. হোসেন, মোহাম্মদ আশরাফ, শিলহটের ইতিহাস, ১৯৯০।
৮. অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ), ঢাকা: উৎস প্রকাশন, ২০০২।
৯. অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ), ঢাকা, উৎস প্রকাশন, ২০০২।

  • লেখক: আব্দুল হাই আল-হাদী, প্রধান সমন্বয়কারী, সেভ দ্য হেরিটেজ এন্ড এনভায়রনমেন্ট.

আপনার মন্তব্য

আলোচিত