শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ ইং

অনন্য আদিত্য

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৩৪

স্মরণ: জননেতা মফিজ আলী

“বিপ্লবের জন্য যাদের প্রাণের টান আছে এবং মনের বল আছে, ইতিহাস কৃষক-শ্রমিকের এই সংগ্রামে তাদের টেনে আনবেই।”-মফিজ আলী

শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রামের প্রতি এমন যার আস্থা তিনি এতদ্বাঞ্চল তথা বৃহত্তর সিলেটের প্রগতিশীল রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব মফিজ আলী। তিনি ১৯২৭ সালের ১০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীসূর্য ধোপাটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সামন্ত ভূ-স্বামী পিতা আজফর আলী ও মাতা নূরজাহান বিবির বড় ছেলে মফিজ আলী জন্মেই প্রত্যক্ষ করেন ’৩০ এর দশকের মহামন্দা, যার পরিণতি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আর ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন তখনও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর অতি উৎপাদন সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায় নিমজ্জিত হয়ে আঁকাবাঁকা গতি পথে ১১ বছর অতিক্রম করে মহামন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে; আর এ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর বাজার ও প্রভাব বলয়ের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের প্রশ্নে পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হতে চলছে। এ রকম একটি বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নয়া উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ বিরোধী আন্দোলনে দ্রোহী মফিজ আলীর মত নেতৃত্বের আজ খুবই প্রয়োজন।

প্রখ্যাত এই বামপন্থী নেতা ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর ভোররাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে চিকিৎসারত অবস্থায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় মাসাধিক কাল আগে ৩০ আগস্ট কুলাউড়ায় একটি কৃষক সভা শেষ করে ফেরার পথে সন্ধ্যাবেলায় নিজবাড়ির সামনের মাঠ সংলগ্ন রাস্তার পাশে মফিজ আলীকে পড়ে থাকতে দেখে জনৈক পথচারী ডাকাডাকি করে লোকজন জড়ো করে তাঁকে উদ্ধার করেন। কিন্তু একটি নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের দুরবস্থা, অব্যবস্থা সর্বোপরি গতানুগতিক ও অনান্তরিক চিকিৎসায় এদেশের অন্যতম প্রবীণ বামপন্থী নেতা মফিজ আলীকে বাঁচানো যায়নি। চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণ সুনির্দিষ্ট করে প্রয়োজনীয় ভূমিকা নেননি। তাঁর মৃত্যু কি রক্তচাপজনিত স্ট্রোকে না কি দুর্ঘটনায় তাও নির্ধারিত হয়নি। দায়িত্বরত চিকিৎসকদের অনান্তরিকতা ও অবহেলা না হলে একটা প্রবোধ হয়তো দেওয়া যেতো। তবে এটা ঠিক যে, তিনি এভাবে আকস্মিক অসুস্থ না হলে আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতেন। তাতে উপকৃত হতো বাংলাদেশের চা শ্রমিকসহ শ্রমিক শ্রেণি তথা জনগণ এবং প্রগতিশীল আন্দোলন।

জননেতা মফিজ আলীর মৃত্যুর পর দেখতে দেখতে ১১ বছর হয়ে গেল। ১০ অক্টোবর ’১৯ তাঁর ১১-তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রামী এই জননেতা ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশ ভারতবর্ষের পাঠশালার ছাত্রাবস্থায়ই মফিজ আলীর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটে। নানা রকম ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষা জীবন অতিবাহিত হয়। মুন্সীবাজারের এম,ই স্কুল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি, মৌলভীবাজারের কাশীনাথ হাইস্কুলে ৭ম শ্রেণি এবং ৮ম শ্রেণি থেকে তিনি মৌলভীবাজার সরকারী হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। এই স্কুল থেকেই তিনি ১৯৪৯ সালে মেট্রিক পাস করেন। মেট্রিক পাস করে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এম,সি কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ছাত্র রাজনীতি করার কারণে তাঁকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এ সময় তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ভাষা আন্দোলনের পর তিনি মদন মোহন কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫৪ সালে আই,এ পাস করেন। এরপর এম,সি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। সেই সময় ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসাবে এম, সি কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে গোবিন্দ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বক্তব্য রাখার কারণে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সুলেমান চৌধুরী লিখিত আদেশ প্রদান করে মফিজ আলীকে এম,সি কলেজ থেকে বহিস্কার করেন। যার কারণে ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে না পারায় বি.এ শেষ বর্ষের ছাত্র অবস্থায় তাঁর শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ছাত্র জীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং সিলেট জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
মুসলিম লীগ সরকারের অপ্রতিহত দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে ১৯৪৯ সালে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলে ১৯৫৩ সালে তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার কমলগঞ্জ থানায় সর্বপ্রথম বিরোধী দল হিসাবে মফিজ আলীর উদ্যোগে আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠিত হয়। যখন মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করতে সাহস করতো না, কেউ মাইক ভাড়া দিতে চাইতো না, সভা করার জন্য কেউ জায়গা দিতেন না, এরকম পরিস্থিতিতে অসীম সাহসিকতায় মফিজ আলী আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে হক ভাসানীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলেও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানে ৯২(ক) ধারা জারী করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করলে সেই সময় ১৯৫৪ সালে মফিজ আলীকেও ছাত্রকর্মী হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয়, এজন্য তাঁকে ৬ মাস জেল খাটতে হয়। এ সময় জেলে তিনি কমিউনিস্ট নেতা লালা শরদিন্দু দে (বুলি দা) এর সাথে পরিচিত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ১৯৫৫ সালে “মুসলিম” শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ গঠিত হলে তিনি আওয়ামী লীগের বৃহত্তর সিলেট জেলা কমিটির ২য় সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

যুক্তফ্রন্ট সরকারের শরিক আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানকে সিয়াটো-সেন্টো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জিরো তত্ত্বের অবতারণা করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী দুর্বল শক্তির সাথে সম্পর্ক গড়ার বিরোধিতা করে বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্কিত হওয়া তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হওয়ার উকালতি করেন এবং পাকিস্তানকে এই জোটভুক্ত করেন।
পূর্ব-পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্রাজ্যবাদের উলঙ্গ দালালীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর বক্তব্যের জবাবে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রগতিশীল বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক নেতাকর্মী ও কাউন্সিলরগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠিত হয়। এ সময় তিনি ন্যাপের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। পূর্ব-পাকিস্তান কৃষক সমিতির শুরু থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন এবং বৃহত্তর সিলেট জেলা কমিটি গঠিত হলে প্রথমে সহ-সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত আইয়ূব খানের সামরিক আইন জারীর পূর্ব পর্যন্ত মফিজ আলীর রাজনৈতিক কর্মস্থল ছিল সিলেট শহর। সামরিক আইন জারী হওয়ার পর তাঁকে শহর ছেড়ে জালালপুর এলাকায় এক লজিং বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। পীর হাবিবুর রহমানের সহযোগিতায় তখন তিনি জালালপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। সে কারণে তখন থেকে তাঁর নামের সাথে “মাষ্টার সাব” যুক্ত হয়, চা শ্রমিকরা তাঁকে এই নামেই সম্বোধন করতো। ১৯৬০ সালে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য পদ লাভ করেন। সে সময় মফিজ আলীর পিছনে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা সংস্থার লোক লেগে থাকতো। অবশেষে ১৯৬০ সালের ৭ নভেম্বর সকাল ৯ টায় জালালপুর লজিং বাড়ি থেকে মফিজ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ বছর জেল খাটেন। জেল থেকে মুক্তি লাভের পর মফিজ আলীর পিতা তাঁকে সংসারে আবদ্ধ করার জন্য ১৯৬৩ সালে বিয়ে দেন। মুক্তি পাগল মানুষকে যেমন কিছুতেই আটকে রাখা যায় না, তেমনি মফিজ আলীকেও জেল জুলুম কিংবা সংসার কোন কিছুই আন্দোলন সংগ্রাম থেকে সরাতে পারেনি। যার কারণে বিয়ের বছর অর্থাৎ ১৯৬৩ সালেই তিনি শ্রীমঙ্গলের বালিশিরায় কৃষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, যা তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বালিশিরা আন্দোলন প্রায় এক বছর জুড়ে চলে আর মফিজ আলীও তাঁর প্রায় পুরোটা সময় বালিশিরার কৃষকদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আন্দোলনের কারণে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়; গ্রেপ্তার, জুলুম বন্ধ হয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে মার্চ মাসে প্রায় ২০ হাজার কৃষকের এক বিশাল মিছিল সিন্দূর খাল থেকে মৌলভীবাজার শহর পর্যন্ত প্রায় ২২/২৩ মাইল পায়ে হেঁটে মৌলভীবাজার হয়ে এসডিও অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

চা বাগান অধ্যুষিত শমসেরনগর এলাকায় বেড়ে উঠা মফিজ আলী শৈশবকাল থেকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চা শ্রমিকের দুঃখ কষ্ট, নির্যাতন নিপীড়ন প্রত্যক্ষ করেন। তাই যখন তিনি চা শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন, তখন ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন জাতপাত; সর্বোপরি ভিন্ন সংস্কৃতির চা শ্রমিকদের নিকট মফিজ আলী খুব সহজেই তাদের একজন হয়ে উঠতে পারেন। ১৯৬৪ সালের ৫ এপ্রিল শমসেরনগরে খেদন ঠাকুরের দালানে বিপুল সংখ্যক চা শ্রমিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মফিজ আলীর নেতৃত্বে চা শ্রমিকদের সংগ্রামী সংগঠন “পূর্ব-পাকিস্তান চা শ্রমিক সংঘ” গঠিত হয়; যা মফিজ আলীর রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। ইউনিয়ন গঠনের পর প্রথম সর্বাত্মকভাবে ১৯৬৪ সালে চা শ্রমিকরা মে দিবস পালন করে। সে সময় চা শ্রমিকদের মে দিবসের ছুটি ছিল না। ৩রা মে ১৯৬৪ চা শ্রমিকরা মহান মে দিবস উপলক্ষে শমসেরনগরে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সমাবেশে এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ, আসদ্দর আলী, রাজা সাহেব প্রমুখ নেতৃবর্গ উপস্থিত ছিলেন। মে দিবসের লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে শুরু হয় ইউনিয়নের কার্যক্রম। তার পর থেকে প্রতি সপ্তাহে এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ সিলেট থেকে শমসেরনগর গিয়ে মফিজ আলীর সাথে চা শ্রমিকদের সংগঠিত করতে বাগানে বাগানে ঘুরেছেন। সেই সময় মাইলের পর মাইল পায়ে হেটেই চা বাগানে তাঁদের কাজ করতে হতো।

আপোষহীন নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে চা শ্রমিক সংঘ শ্রমিকদের নিকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, দলে দলে শ্রমিকরা মালিক পক্ষের স্বার্থরক্ষাকারী সোলেমানের নেতৃত্বে আপোষকামী দালাল ইউনিয়ন ত্যাগ করে চা শ্রমিক সংঘের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। মফিজ আলীর নেতৃত্বে চা শ্রমিক সংঘের দুর্বার অগ্রযাত্রা মালিক পক্ষ ও দালাল ইউনিয়নের ভিত কাঁপিয়ে তোলে। আবারও শুরু হয় মালিক পক্ষ ও দালাল গোষ্ঠীর সমন্বিত ষড়যন্ত্র চক্রান্ত এবং আক্রমণ।
সিরাজনগর চা বাগানে মফিজ আলীকে আক্রমণ করার জন্য ভাড়া করা হয় সন্ত্রাসী দই আলী ও তুষান গ্যাংদের আর শমসেরনগর চা বাগানে ইংরেজ ম্যানেজার মফিজ আলীর নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। ঐ মামলার হাজিরার দিন বিভিন্ন বাগানের প্রায় ১০ হাজার চা শ্রমিক শমসেরনগরে সমবেত হয়ে পায়ে হেঁটে মিছিল করে মৌলভীবাজার যাত্রা করে এবং কোর্ট প্রাঙ্গণে শিশু পার্কে এক বিক্ষোভ সমাবেশ করে। মিছিলের সংবাদ পেয়ে আদালত অগ্রিম মফিজ আলীর জামিন দেন।

১৯৬৭ সালে মফিজ আলীর বাড়ির নিকটে এসে রেলগাড়ি থামিয়ে দুই প্লাটুন রিজার্ভ পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মফিজ আলীর গ্রেপ্তারের সংবাদ চা বাগানে পৌঁছা মাত্রই শুরু হয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ক্ষোভ বিক্ষোভ, তারপর ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে ৬ মাস পর মফিজ আলীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৮Ñ৬৯ সালে পূর্ব-পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির দাবি আদায়ের আন্দোলন সর্বাত্মক রূপ পেলে চা বাগানেও তার প্রভাব পড়ে। এ সময়ে ’৬৯ সালে সামরিক আইন জারীর পর শমসেরনগর চা বাগানে শ্রমিকরা দাবি আদায়ে ম্যানেজারকে ঘেরাও করে আন্দোলন শুরু করলে পুলিশ এসে শ্রমিকের উপর গুলি চালান। পুলিশের গুলিতে নীরা বাউরী নামের এক শ্রমিক নিহত হন। শ্রমিকের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের এই ঘটনায় বাগানের ম্যানেজার চা শ্রমিক সংঘের নেতা মফিজ আলী ও সীতারাম বার্মার নামে সামরিক আদালতে মামলা দায়ের করে। এসময় থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন থাকেন।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পর শেখ মুজিবের সরকার তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করে। এখানে উল্লেখ্য পাকিস্তান আমলের এ জাতীয় মামলা বাংলাদেশ সরকার খারিজ করলেও প্রগতিশীল বামপন্থী নেতা মফিজ আলীকে তারা রেহাই দেয়নি।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই জননেতা জীবনে ৭ বার জেল খাটেন। তার মধ্যে ১৯৬৫ সালে ডিসেন্ট রোলস অব পাকিস্তান আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা পাকিস্তান কারাগারে এক বছর আটকে রাখা হয়। সেসময় প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, নানকার আন্দোলনের নেতা কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের নিকট হতে তিনি মার্কসবাদ সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান লাভ করেন এবং ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ হন। যার কারণে মফিজ আলী কমরেড অজয় ভট্টাচার্যকে তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু বলে স্বীকার করতেন। কমরেড অজয় ভট্টাচার্য তাঁর “কুলিমেম” উপন্যাস মফিজ আলীর নামে উৎসর্গ করেন।

ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের ধারাতে ১৯৮৮ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠিত হয়। সে সময় জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সিলেট জেলা শাখার যুগ্ম-আহবায়ক এডভোকেট ই ইউ শহিদুল ইসলাম মফিজ আলীকে গণতন্ত্রের নির্ভীক মুখপত্র সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকা পাঠাতেন। সময়ের সাথে সাথে সেই সম্পর্ক গভীর হয়ে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সম্পর্কের ধারাতে মফিজ আলী ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, সাম্যবাদী দলের সংশোধনবাদী লাইন এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা সারসংকলন ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি করে রাজনৈতিক জীবনকে পুনরুদ্ধার এবং আমৃত্যু শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনগণের পক্ষে আত্মনিবেদন করার প্রত্যয়ে ১৯৯৩ সালে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এ যোগদান করেন। জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে আমৃত্যু তিনি সংগঠন সংগ্রাম বিকাশের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। একই সাথে তিনি ফ্রন্টের শরিক সংগঠন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি হিসাবে চা রাবার, হোটেল, রিক্সা, দর্জি শ্রমিকদের সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন। এ প্রক্রিয়ায় তিনি চা শ্রমিকদেরকে পুনরায় বিপ্লবী ধারায় সংগঠিত করার জন্য চা শ্রমিক সংঘ গড়ে তোলাসহ চা ও রাবার শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রাম পুনর্গঠিত করায় আত্মনিয়োগ করেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁর এই নব উদ্যোগ চা শিল্পে আপোষহীন সংগঠন সংগ্রামের নতুন যাত্রা শুরু হয়। এ প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে জরুরী অবস্থায় চা শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে তিনি আশান্বিত হয়েছিলেন। তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং অসমাপ্ত কাজ প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠন, চা শ্রমিক, শ্রমিক শ্রেণিকে অগ্রসর করে সফল করার মহান দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরিক্রমায় ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উৎরাই, উত্থান-পতন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এদেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনগণের একজন অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে বিপ্লবী বিকাশ ধারাতে সম্পৃক্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যখন তাঁর আত্মউপলব্ধি হয়েছে তখন তিনি তাঁর সংশোধনবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান ত্যাগ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। এদেশের জনগণের মূল শত্রু হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজি। তিনি বিশ্বাস করতেন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর ভিত্তিতে বল প্রয়োগের মাধ্যমে এদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। সে লক্ষ্যে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শ্রমিক কৃষককে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন।

মফিজ আলীর জীবনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শ্রমিক কৃষকের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি দাওয়া নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা চালান। তিনি ইংরেজি ডন, বহুল প্রচারিত সংবাদ, ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক জনতা, লালবার্তা প্রভৃতি পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। তিনি গণতন্ত্রের নির্ভীক মুখপত্র সাপ্তাহিক সেবার একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন। এছাড়াও তাঁর প্রবন্ধ, লেখা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ম্যাগাজিন, স্মারকগ্রন্থ ইত্যাদিতে প্রকাশিত হয়েছে। এখনও তাঁর অনেক লেখা অপ্রকাশিত আছে।

মফিজ আলী আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগঠন সংগ্রাম আমাদের পাথেয়। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী বিকল্প ধারার সংগঠন ও তার নেতাকর্মী এবং জনগণকে এই মহান নেতার অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে অকুতোভয়ে অগ্রসর হতে হবে। জাতীয় ও জনজীবনের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে মফিজ আলীর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল শাসক শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলে মফিজ আলীর অসমাপ্ত কাজ অর্থাৎ জাতীয় গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব।

অনন্য আদিত্য: রাজনৈতিক কর্মী। ইমেইল: anonnoaditto[email protected]

আপনার মন্তব্য

আলোচিত