মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

গ্রন্থমেলায় রণদীপম বসুর ‘চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন’

 প্রকাশিত: ২০১৭-০২-০৯ ১২:৫৫:৩৩

 আপডেট: ২০১৭-০২-০৯ ১৩:০১:০১

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একুশে গ্রন্থমেলায় লেখক রণদীপম বসুর ‘চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন’ বইয়ের ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী।

এছাড়াও ‘চার্বাকের খোঁজে ভারতীয় দর্শন’ বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে একই প্রকাশনী। গত বইমেলায় এ বইটি প্রকাশ করেছিল ‘শুদ্ধস্বর’।

সবগুলো বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন মোবারক হোসেন লিটন। পাওয়া যাচ্ছে রোদেলা প্রকাশনীর ২১৩, ২১৪ ও ২১৫ নং স্টলে।

লেখক রণদীপম বসুর জন্ম সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়। এ বইগুলো ছাড়াও এর আগে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৯। এর মধ্যে আছে অদৃশ্য বাতিঘর (কবিতা, ২০০৬) ; খোকার জানালা (কিশোর কবিতা, ২০০৮); তিন দশে তেরো (শিশুতোষ ছড়া, ২০০৮); ইয়োগা, সুস্থতায় যোগচর্চা (স্বাস্থ্য, ২০১০); অবমুক্ত গদ্যরেখা (প্রবন্ধ-গবেষণা, ২০১১); উৎবচন (মুক্তচিন্তা, ২০১২); টিপলু (কিশোর গল্প, ২০১৩); চতুষ্পদী কষ্টগুলি (অণুকবিতা, ২০১৪); চার্বাকের খোঁজে ভারতীয় দর্শন (দর্শন, ২০১৫)।

চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন ১ম খণ্ড (জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন) বইটির মুদ্রিত মূল্য : ৪০০/- টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩০৪।

বইয়ে লেখক বলেন, ভারতের প্রাচীনতম অসনাতন নাস্তিক্য ধর্মদর্শনের অন্যতম হচ্ছে জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন। কিন্তু একান্তই ধর্মবাদী দর্শন হয়েও এ দুটো দর্শন সম্প্রদায়কে তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কেন নাস্তিক্যদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন তা কৌতূহলজনক বৈকি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে যখন উপনিষদীয় চিন্তাধারা কর্মমীমাংসা ও ব্রহ্মমীমাংসার বিরোধে ধর্মসংকটের ন্যায় তত্ত্বসংকটের সম্মুখীন হয় তখন প্রায় একই সময়কালে জৈন মহাবীর ও শাক্যবংশীয় রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের কঠোর তপস্যালব্ধ এ দুটি বেদবিরোধী সম্প্রদায় দর্শনের আঙিনায় আবির্ভূত হয়।

উপনিষদীয় পরিমণ্ডলে থেকেও ভারতীয় দর্শনের এ দুটি ধর্মবাদী সম্প্রদায় বেদভিত্তিক উপনিষদীয় চিন্তাধারার বিরোধিতায় নেমে সাধারণ মানুষের বোধগম্য এক আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার প্রবর্তন করেন। এই আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা বেদভিত্তিক না হয়েও সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা নিবৃত্তির সহায়ক হয়েছিলো। নিরীশ্বরবাদী হওয়া সত্ত্বেও উচ্চমানের আধ্যাত্মিকতায় ধীরে ধীরে এই চিন্তাধারার প্রভাব এতো আকৃষ্ট ও বিস্তার লাভ করেছিলো যে ভারতের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ধর্মজীবনকেও তা আলোড়িত করেছিলো। জনমানসে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছিলো বলেই বেদানুসারী হিন্দু দর্শনে এই মতবাদগুলি খণ্ডনের জন্য বিশেষ যত্ন লক্ষ্য করা যায়।

চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন- ২য় খণ্ড (ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য ও যোগ দর্শন) বইটির মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০/- টাকা, পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৫২।

প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে আস্তিক্যবাদী যে ছয়টি দর্শনকে ষড়দর্শন বলা হয়ে থাকে, তার অন্যতম ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য ও যোগ দর্শন। ন্যায়শাস্ত্র হলো বুদ্ধিবাদী বা যুক্তিবাদী দর্শন। ভারতীয় তর্কশাস্ত্রের উৎস ও যথার্থ জ্ঞান লাভের প্রণালী হিসেবেই ন্যায় দর্শনকে আখ্যায়িত করা হয়। আর বৈশেষিক দর্শনের ‘পদার্থতত্ত্ব’ বা ‘বিশ্বতত্ত্বে’র জ্ঞান প্রাচীনকালে যে কোন ছাত্রের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হতো। বিশ্বতত্ত্বের আলোচনাই বৈশেষিক দর্শনের প্রধান আলোচনা। অন্যদিকে সাংখ্যদর্শন বা সাংখ্যশাস্ত্রকে প্রাচীনতম ভারতীয় দর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য তথা স্মৃতি, পুরাণ ও অন্যান্য শাস্ত্র গ্রন্থগুলিতে সাংখ্যদর্শনের বিপুল প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকে সাংখ্য ও যোগ দর্শনের মধ্যে প্রভেদ খুবই সামান্য। একটি তত্ত্বমূলক, অন্যটি প্রয়োগমূলক দর্শন। যোগ দর্শনে সাংখ্যের পঁচিশটি তত্ত্বের সাথে অতিরিক্ত একটি তত্ত্ব ঈশ্বরতত্ত্ব যুক্ত করে ঈশ্বর স্বীকৃত হয়েছে বলে নিরীশ্বর-সাংখ্যের বিপরীতে যোগ দর্শনকে ‘সেশ্বর-সাংখ্য’ও বলা হয়ে থাকে। একই উপনিষদীয় পরিমণ্ডলে থেকেও দর্শনগুলির মধ্যে পারস্পরিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত কৌতুলোদ্দীপক।

চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন- ৩য় খণ্ড (পূর্ব-মীমাংসা) বইটির মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০/- টাকা ও পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৭২।

মীমাংসাশাস্ত্র নিঃসংশয়ে বৈদিক বা বেদমূলক দর্শন হলেও অনেকাংশে তা ব্যাকরণ এবং ন্যায়শাস্ত্রের বাদার্থ বা শব্দখণ্ডের মতো। পদশাস্ত্র হলো ব্যাকরণ এবং প্রমাণশাস্ত্র হলো ন্যায়। এই পদবাক্যপ্রমাণ-তত্ত্বজ্ঞ না হলে প্রাচীনকালে কেউ সুপণ্ডিত বলে বিবেচিত হতেন না। এই দর্শনের প্রধান উপজীব্য হলো বেদের অপৌরুষেয়ত্ব ও নিত্যত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈদিক কর্মকাণ্ডের স্বতসিদ্ধতা প্রমাণ করা। একদিকে বিভিন্ন দেব-দেবী ও ঈশ্বরের অস্তিত্বে প্রচণ্ড অবিশ্বাসী এ দর্শনের বস্তুবাদী বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিস্রোতের পাশাপাশি যজ্ঞানুষ্ঠানের মতো একটি আদিম কুসংস্কারের মধ্যে যাদুক্ষমতা আরোপ প্রচেষ্টার চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচীন দর্শনটিকে জটিল স্ববিরোধিতায় ঠেলে দিয়েছে বলে একালের বিদ্বানেরা মনে করেন। এটি সাংখ্য, বৌদ্ধ বা ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনের মতো একটা সুশৃঙ্খল সুসংহত দার্শনিক প্রস্থানরূপে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে যাগযজ্ঞসম্পৃক্ত মন্ত্ররাশির অর্থবিচারকে উপলক্ষ করে। এই দর্শনের মুখ্য উদ্দেশ্য কোন বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্বের উদ্ভাবন ও প্রচার নয়। মুখ্য উদ্দেশ্য যাগযজ্ঞের সামাজিক প্রয়োজন অক্ষুণ্ণ ও অব্যাহত রাখার জন্য মন্ত্রার্থবিচার। এই বিচারের প্রসঙ্গেই প্রয়োজনানুরূপ দার্শনিক যুক্তিতর্ক বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থিত হয়েছে।

চার্বাকেতর ভারতীয় দর্শন- ৪র্থ খণ্ড (বেদান্ত) বইটির মুদ্রিত মূল্য : ৪০০/- টাকা এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩২০।

উত্তর-মীমাংসার নামান্তর হলো বেদান্ত। প্রাচীন ভারতীয় ছয়টি আস্তিক দর্শনের মধ্যে ভাববাদের চূড়ান্ত রূপ এই বেদান্তদর্শনের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। বৈদিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে হিন্দুদের কাছে বেদ সকল জ্ঞানের আকর বলে বিবেচিত। বেদের চারটি অংশ- মন্ত্র বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। বেদের চারটি অংশের মধ্যে সংহিতা ও ব্রাহ্মণকে কর্মকাণ্ড এবং আরণ্যক ও উপনিষদকে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়। সুতরাং বেদের অন্ত অর্থাৎ উপনিষদকেই মুখ্যত বেদান্ত নামে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ, উপনিষদ তত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা ও সমর্থনই বেদান্তদর্শন। উপনিষদ বিভিন্ন কালে রচিত হয়েছে এবং তা সংখ্যায় বহু। এগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান উপনিষদগুলি হলো ঈশ, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, প্রশ্ন, কেন, কঠ, মুন্ডক, মান্ডুক্য, কৌষীতকি, মৈত্রী, শ্বেতাশ্বতর প্রভৃতি। কিন্তু উপনিষদগুলিতে দার্শনিক তত্ত্বাবলী আলোচিত হলেও সে-আলোচনা বহুলাংশেই বিক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। তা ছাড়া এ-আলোচনা যুক্তিতর্কমূলক সুসংবদ্ধ দার্শনিক আলোচনা নয় এবং নানা উপনিষদে নানা রকম আলোচনার মধ্যে ঠিক কোন তত্ত্বকে প্রকৃত উপনিষদ-প্রতিপাদ্য তত্ত্ব বলা হবে সে-কথা নির্ণয় করাও সহজ নয়। স্বভাবতই, উপনিষদের অনুগামী পরবর্তী দার্শনিকেরা উপনিষদ-প্রতিপাদ্য মূল দার্শনিক তত্ত্বকে সনাক্ত করে যে সুসংবদ্ধ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিতে চাইলেন, তা-ই বেদান্তদর্শনের উপজীব্য।

চার্বাকের খোঁজে ভারতীয় দর্শন (দ্বিতীয় সংস্করণ) বইটির মুদ্রিত মূল্য : ৯৮০/- টাকা এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৮২৪।

নিজেদের সমকালীন চিন্তাজগতে বদ্ধচিন্তা ও অন্ধবিশ্বাসের অচলায়তন ভেঙে অভূতপূর্ব মুক্তচিন্তার সাহসী অগ্রপথিকই নয়, ভারতীয় জড়বাদী তথা বস্তুবাদী দর্শনের একমাত্র প্রতিভূ বলতে চার্বাক দর্শন, যাকে কখনো কখনো বার্হস্পত্য বা ভিন্ন প্রেক্ষিতে লোকায়ত দর্শনও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে চার্বাকদের অক্ষত অবিকৃত মতবাদ প্রতিফলিত হয় এরকম নিজস্ব উৎস গ্রন্থ অনেককাল আগেই দুর্ভাগ্যজনক বিলুপ্তির অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। ফলে প্রচলিত চার্বাক-বিরোধী অন্যান্য দর্শন-সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থগুলোয় উপস্থাপিত চার্বাক-মত এবং অধ্যাত্মবাদী বৈদিক সাহিত্য যথা বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, মহাকাব্য, নাটক, গীতা, মনুসংহিতা ইত্যাদি প্রাচীন শ্রুতি ও স্মৃতিশাস্ত্রগুলোর পরতে পরতে চার্বাকদের প্রতি বর্ষিত তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিরোধিতার আক্রমণাত্মক সাহিত্য-দৃষ্টান্তগুলো এবং পাশাপাশি তৎকালীন ব্রাত্য ও সাধারণ জনমানসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দার্শনিকচিন্তা-সম্মত বার্হস্পত্য শ্লোক, চার্বাক-ষষ্ঠি ও প্রাচীন লোকগাথাগুলোতে প্রচলিত অপশাস্ত্র ও কুসংস্কারগুলোর বিরুদ্ধে চার্বাকদের পক্ষ থেকে যে তির্যক বিদ্রূপ ও শ্লেষের সমারোহ ঘটানো হয়েছে, এগুলো চার্বাকী চিন্তার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে যে অমূল্যতার দাবি রাখে তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বিশাল বিপুল সাহিত্য, দর্শন ও প্রামাণ্য নিদর্শনগুলোর যথার্থ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো বের করে এনে ভারতীয় দর্শনের জটিল প্রপঞ্চ থেকে চার্বাক-দর্শনের এক চমৎকার রূপরেখা সাধারণের বোধগম্য করে উপস্থাপন করা হয়েছে ‘চার্বাকের খোঁজে ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থে।

রণদীপম বসু বলেন, এ গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ হয়েছে ২০১৫ সালে শুদ্ধস্বর থেকে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০১৫-এর বইমেলা চলাকালীন লেখক অভিজিৎ রায় নিহত হওয়ার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ট্র্যাজিক কারণে শেষপর্যন্ত পাঠক চাহিদা অনুযায়ী বইটির পর্যাপ্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এবং একই বছরের অক্টোবরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশকসহ আমি নিজেও আক্রান্ত হওয়ায় গোটা প্রক্রিয়াটাই স্তব্ধ ও থেমে যায়। অতঃপর পাঠকদের অতৃপ্ত পাঠাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানাতে এবারের (২০১৭) বইমেলায় বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হলো রোদেলা প্রকাশনী থেকে।

আপনার মন্তব্য