বুধবার, , ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

বইমেলার ডায়েরি ৪-৫

 প্রকাশিত: ২০১৮-০২-০৬ ১২:৪০:০২

 আপডেট: ২০১৮-০২-০৮ ০২:৪৯:৩৪

রেজা ঘটক:

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
পরপর দুই দিন ছুটির পর অমর একুশে বইমেলার চতুর্থ দিনে বইপ্রেমীদের খুব একটা ভিড় ছিল না। তাই বইমেলায় ঘুরে ঘুরে আড্ডা দিয়েছি। বিদ্যাপ্রকাশে গিয়ে পেলাম কথাসাহিত্যিক জুলফিয়া ইসলাম ও লেখক ফারহানা আজিম শিউলীকে। এবার বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফারহানা আজিম শিউলী অনূদিত মেক্সিকান লেখিকা লাউরা এক্সিবেল-এর উপন্যাস 'লাইক ওয়াটার ফর চকলেট'। শিউলী এটির বাংলা ভাষান্তর করেছেন 'চকলেট ও জলের আখ্যান'। শিউলী অনূদিত ব্রাজিলীয় লেখক পাওলো কোয়েলহোর 'আলকেমিস্ট' উপন্যাসটিও পাওয়া যাচ্ছে বিদ্যাপ্রকাশে।

বিদ্যাপ্রকাশ থেকে মেলায় এসেছে জুলফিয়া ইসলামের নতুন গল্প সংকলন 'জলরঙে আঁকা জগত'। জুলফিয়া আমাদের জন্য নিজের হাতে বানানো পিঁয়াজু নিয়ে এসেছিল। আমরা পিঁয়াজু খেতে খেতে আড্ডার মধ্যে মোহিত ভাইয়ের আগমন। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে এবার প্রকাশিত হয়েছে মোহিত কামালের নতুন উপন্যাস 'দুমুখো আগুন'। দুটি বইয়ের-ই প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ।

ভিন্নচোখ প্রকাশনী প্রকাশ করেছে তিন তরুণ কবি'র প্রথম কাব্যগ্রন্থ। তরুণ কবি সুবর্ণ আদিত্য'র প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'দুধ পুকুরের সিঁড়ি'। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী সোহেল আনাম। তরুণ কবি চৌধুরী ফাহাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঘর সব পালিয়ে যাচ্ছে বাড়ির ঠিকানায়' এবং তরুণ কবি জহির রিপনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মৌন শব্দগুচ্ছ'। দুটি বইয়ের-ই প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।

বাংলা একাডেমির বহেরাতলায় লিটলম্যাগের তুর্কি সৈনিকরা ধীরে ধীরে পসরা সাজিয়ে বসেছে। কিন্তু এখনো লিটলম্যাগ চত্বরে সাজসজ্জা শেষ হয়নি। এবার লিটলম্যাগ চত্বরে একাডেমি সবার জন্য ব্যানার ছাপিয়ে দেয়নি বলে সাজসজ্জায় একটা হ-য-র-ল-ব অবস্থা। বহেরাতলায় বাংলা একাডেমির ছোটকাগজকে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাটা আমরা মোটেও ভালোভাবে মানতে পারছি না। এখনো একাডেমি লিটলম্যাগ চত্বরে আমাদের বসার জন্য কোনো ব্যবস্থা করেনি। একাডেমি এবার গত বছরের তুলনায় প্রায় ডাবল স্টল বরাদ্দ দিয়ে এই চত্বরের পুরো জায়গাটাকে একটা দলিল-লেখক চত্বরে পরিণত করেছে।

লিটলম্যাগের তুর্কি সৈনিকদের আচ্ছামত শাসন করার খায়েস থেকেই এটা যেন একাডেমির একটা পূর্ব-পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এটা আমরা কিছুতেই মানতে পারি না। এখনো বইমেলার কোথাও চায়ের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। একাডেমি যাদের কাছে খাবারের দোকান বরাদ্দ দিয়েছে, তারা বইপ্রেমীদের ইচ্ছেমত পকেট কাটছে। ফলে একবার কেউ ওসব খাবারের স্টলে গেলে বইকেনার টাকাটা ওখানেই গচ্চা যাচ্ছে। একশো টাকার খাবার বিক্রি করছে তিনশো টাকায়, তিনগুণ দামে। একাডেমির এই টেন্ডারবাজিকে আমরা মোটেও ভালো চোখে দেখছি না।

সন্ধ্যায় কয়েকজন লেখক বন্ধু মিলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলার প্রধান প্রাঙ্গণ ঘুরে আমরা বইমেলার ডিজাইনের ভুলগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলোচনা করছিলাম। এখন পর্যন্ত বইমেলায় কোনো দিকচিহ্নিত ম্যাপ লাগানো হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট প্রকাশনাটি খুঁজে পেতে সবাইকে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। উদ্যানের বইমেলাটি কেউ যদি আকাশ থেকে ভিউ করেন, তাহলে এটা ঠিক বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের জগাখিচুড়ির বাস্তবতাকেও হার মানাবে। এত বড় উদ্যান, কত সুন্দর জায়গা, অথচ একটি সুস্থ পরিকল্পনা ও ডিজাইনের অভাবে বইপ্রেমীদের সকল প্রকাশনার স্টল ভিজিট করার এখানে কোনো সুযোগ নাই।

প্রতি বছর এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরাও অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছি। অথচ গোটা চত্বরের পুরো জায়গাটা যদি একজন আর্কিটেক্ট দিয়ে ডিজাইন করা হয়, তাহলে বইমেলায় আগত যে কেউ সকল প্রকাশনার স্টলগুলো ভিজিট করতে সক্ষম হবে। ভুল ডিজাইনের কারণে কারো পক্ষেই সকল স্টল ভিজিট করা মোটেও সম্ভব হচ্ছে না।

আশা করি, আগামীতে এ বিষয়গুলো বাংলা একাডেমি বিচক্ষণতার সাথেই বিবেচনা করবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, এসব নিয়ে অনেক কথা বললেও বছর শেষে সেই যে লাউ সেই কদু। বাঙালির সেই চিরায়ত খাসলতের মত। কোনো পরিবর্তন নেই। গণহারে প্রকাশনা ও লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়ার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নাই। বরং এতে হাজার হাজার অখাদ্য বইয়ের ভিড়ে একটা ভালো বই পাঠকের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা ভালো বই বেশি চাই। বেশি প্রকাশনা, বড় বড় রেকর্ড আমাদের পাঠকদের জন্য মোটেও সুসংবাদ নয়। বরং পাঠককে ঠকানোর একটা কৌশল এটা। আমরা কোয়ালিটি বই চাই, মোটেও কোয়ান্টিটি নয়।

অমর একুশে বইমেলার ঐতিহ্যকে ছোট করে দিন দিন এটাকে বাণিজ্য মেলায় রূপ দেওয়াটা মোটেও সাহিত্যের জন্য সুখবর নয়। বইমেলার পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ায় বই বিক্রির টার্নওভার বেড়েছে বটে। কিন্তু সাহিত্যের তাতে কতটা লাভ হচ্ছে? এসব নিয়ে একাডেমির কোনো ভাবনা নাই, যা খুবই দুঃখজনক।

৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম দিনে বইপ্রেমীদের তেমন উপস্থিতি ছিল না। তবে বিভিন্ন স্টলে নতুন নতুন বই আসতে শুরু করেছে।

শুধু বিপ্লবীদের নিয়ে বই প্রকাশ করতেই গড়ে উঠছে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘বিপ্লবীদের কথা’।

শুধুই বিপ্লবীদের নিয়েই এপর্যন্ত তারা প্রকাশ করেছেন ৮৬টি বই। এবছর মেলায় এসেছে ছয়টি নতুন বই। সেগুলো হলো- আনিসুল হকের ‘বন্দি জেগে আছ?’, আহমদ রফিকের ‘ইলা-রমেন কথা: প্রাসঙ্গিক রাজনীতি’, হায়াত মামুদের ‘সোমেন চন্দ’, রণেশ দাশগুপ্ত অনূদিত ‘জিজ্ঞাসা’, শান্তি দাশের ‘অরুণ-বহ্নি’, এবং লক্ষ্মী চক্রবর্তী ও শেখ রফিক রচিত ‘৭১’ (৩য় খণ্ড)।

প্রিয়মুখ প্রকাশনী থেকে মেলায় এসেছে জনপ্রিয় রম্য লেখক আহসান কবিরের 'মাল নিজ দায়িত্ব রাখুন'। বইটি পড়ে আপনি বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির হালচাল বুঝতে পারবেন। এক রঙা এক ঘুড়ি থেকে মেলায় এসেছে তরুণ লেখক আহমেদ ইশতিয়াকের 'মরিবার হলো তার সাধ'। বইটি তরুণদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছে।

সবাই জানেন সাকিব আল হাসান একজন ক্রিকেটার। এবার সাকিব শিশুদের জন্য লিখেছেন তার জীবনীগ্রন্থ ‘হালুম’। বাংলালিংকের সৌজন্যে বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের প্রচারণার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক আজ হাজির হয়েছিলেন অমর একুশে বইমেলায়। সাকিবকে ঘিরে ভক্তদের ভিড়, হৈ চৈ ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এমনকি শেষের দিকে সাকিবকে পুলিশি প্রহরাও নিতে হয়েছে।

লিটলম্যাগ চত্বরে তুর্কি সৈনিকদের সংখ্যা কিছুটা বাড়তির দিকে। কিন্তু বহেরাতলায় লিটলম্যাগের স্টলসজ্জায় বাংলা একাডেমির খামখেয়ালিপনা এবার 'বিশ্বরেকর্ড' করার অপেক্ষায়। এমন আচরণ করলে খুব শিঘ্রই লিটলম্যাগ কর্মীরা বিদ্রোহ করতে পারে, এমন আভাস বইমেলা ঘুরে কিছুটা টের পাওয়া গেছে।

বইমেলার ষষ্ঠদিনে নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে ১১৬টি। বাংলা একাডেমির তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বইগুলোর মধ্যে কবিতার বই ৩২টি, উপন্যাস ১৩টি, গল্পের বই ১৫টি, বিজ্ঞান বিষয়ক বই ৪টি এবং অন্যান্য বই ৫২টি।

সবাইকে অমর একুশে বইমেলার শুভেচ্ছা। বইমেলা অমর হোক। ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করি। জয়তু অমর একুশে গ্রন্থমেলা। জয়তু ভাষার মাস।

  • রেজা ঘটক: কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা।

আপনার মন্তব্য