আজ সোমবার, , ২০ আগস্ট ২০১৮ ইং

রমজানে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে বই

 প্রকাশিত: ২০১৮-০২-২৮ ১৭:২৪:২৮

সহুল আহমদ:

একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আরাফাত তানিমের 'একাত্তরের রমজান: গণহত্যা ও নির্যাতন'।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ থেকে ডিসেম্বর - এই নয় মাসকে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন টাইম ইন্টারভেলে ভাগ করে দেখা হচ্ছে। যেমন শুধু মার্চ মাসের অবস্থা কেমন ছিল? কিংবা ডিসেম্বরের অবস্থা কেমন ছিল?

একাত্তরে যে গণহত্যা এদেশে সংঘটিত হয়, তা গত শতাব্দীতে সংঘটিত নৃশংসতম গণহত্যার একটি। কিন্তু, দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমরা গণহত্যার শিকার একটি জাতি হওয়া সত্ত্বেও মাত্র অর্ধশতাব্দীর মাথায়ই গণহত্যাকে বেমালুম চেপে গিয়েছি অথবা ভুলে গিয়েছি। ভুলে যাওয়ার একটা প্রমাণ হচ্ছে এই গণহত্যাকে স্বীকার না করা। বিভিন্ন অযৌক্তিক যুক্তি দিয়ে একাত্তরের গণহত্যাকে নাকচ করে দেয়া হয় এখানে। মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই রাজনৈতিক। এর পাশাপাশি, ভুলে যাওয়ার আরেকটা প্রমাণ হচ্ছে, গণহত্যার গতিপ্রকৃতি বুঝি না বলে নিজেরটা কষ্টে-সৃষ্টে স্বীকার করে ফেললেও অন্যের উপর সংঘটিত গণহত্যা অস্বীকার করে থাকি।

আরাফাত তানিম এই গণহত্যার দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি পুরো একাত্তরকে নিয়ে আসেন নি, নিয়েছেন একাত্তরের ছোট একটা অংশ। ২২ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর, এই একমাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীই মূলত তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। দু একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে,

'২২ অক্টোবর ... পাকিস্তানি বাহিনীরা দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১৮৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে গগনবাড়িয়া গ্রামে বেঁধে রাখে। ... পহেলা রমজানের ইফতারের সময় ঐ ১৮৫ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। ঐদিন সেসব লাশের সাথে অনেক জীবিতদেরকেও গণকবর দেওয়া হয়।'

২০ নভেম্বর ছিল ঈদের দিন, সেদিনের একটা ঘটনা বলেছিলেন একজন, 'ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কারাগার থেকে কয়েকশ বন্দিকে ধরে এনে এখানে গুলি করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। অনেকের আঘাত গুরুতর ছিল না কিন্তু তাদেরকে জীবন অবস্থায় মাটিচাপা দেয়া হয়।'

১৮৪ পৃষ্ঠার এই বইয়ের পরতে পরতে এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গণহত্যার নির্মম বয়ান। মাত্র দুটো তুলে দিলাম, প্রথম দিন থেকে একটা এবং শেষ দিন থেকে আরেকটা। বইটাতে পূর্বে উল্লিখিত ঐ একমাসের প্রতিটা দিন ধরে ধরে আলোচনা করা হয়েছে। বাকীগুলো আগ্রহী পাঠকেরাই দেখে নিতে পারেন। শিউরেও উঠতে পারেন নির্মমতা দেখে।

একটা প্রশ্ন হচ্ছে, লেখক এখানে অক্টোবর-নভেম্বরের ঐ বিশেষ সময়টা কেন নিলেন? এর উত্তর হচ্ছে, বিশেষ সময়টা ছিল 'রমজান' মাস। মুসলমানদের জন্যে অত্যন্ত পবিত্র একটা মাস। লেখক এই বিশেষ সময়টা নিয়ে কাজ করেছেন, এর কারণ হচ্ছে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তার দালালেরা যে ধর্মকে অজুহাত বানিয়েছিল গণহত্যাকে বৈধতা দিতে, সেই অজুহাতের অসারতা প্রমাণ করা। একদিকে পাকিস্তানিরা বলছিল তারা সাচ্চা মুসলমান, অপরদিকে এই পবিত্রমাসেও তারা তাদের গণহত্যা চালিয়ে যায়।
পাকিস্তানিদের অজুহাতের অসারতা বহুভাবেই প্রমাণিত, লেখক আরাফাত তানিমও সেই অসারতাকে 'রমজান' মাসে পাকিস্তানিদের কর্মকাণ্ড দিয়ে তুলে ধরেছেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হয় যে, শাসকের ধর্ম ও শোষকের ধর্ম এক হলেও তার প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে।

বইটা দেখে বুঝা যায় যে, লেখক আরাফাত তানিম বেশ পরিশ্রম করে তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছেন। তাঁর এই কাজ পরবর্তীতে আরও অনেকের কাজের রসদ জোগাবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

বইটা প্রকাশিত হয়েছে অনেক দেরীতে। আরও আগে আসা উচিৎ ছিল। তবে, আমরা পেয়েছি, এটাই আপাতত বড় কথা। একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তারা এই বইটা উল্টে পাল্টে দেখতে পারেন।

বইটা প্রকাশ করেছে 'দেশ পাবলিকেশন্স'। মূল্য ৩৫০ টাকা।

আপনার মন্তব্য