সোমবার, , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

মাসকাওয়াথ আহসান

১০ জুলাই, ২০১৮ ২০:০৭

সঞ্জু: হার না মানার গল্প

বলিউড অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের জীবন কাহিনী নিয়ে তৈরি "সঞ্জু" চলচ্চিত্রটি দক্ষিণ এশিয়ার আদিম গ্রামে সঞ্জয়ের মতো একজন প্রতিভাবান শিল্পীর নানা রকম লড়াইয়ের মাঝ দিয়ে জীবনে ফেরার গল্প; হার না মানার গল্প। মা এই 'সঞ্জু' নামেই ডাকতেন তাকে। এই কাহিনীতে সঞ্জয় দত্তকে যেসব সমস্যার মাঝ দিয়ে যেতে হয়েছে; দক্ষিণ এশিয়ায় না জন্মে সভ্য সমাজে জন্মালে সমস্যাগুলো এতো প্রকট হতো না বলেই মনে হয়।

সঞ্জয়ের জীবনের প্রথম সমস্যা ছিলো নার্গিস ও সুনীল দত্তের মতো খ্যাতিমান শিল্পীর সন্তান হওয়া। মা-বাবার স্বপ্নপূরণের জোয়াল জোর করে সঞ্জুর কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়। "তোমাকে সফল অভিনেতা হতে হবে"; এই যে দক্ষিণ এশিয়ার অভিভাবকদের মাঝে "সাফল্যে"র প্রতি যে স্বার্থপর আকর্ষণ; এখানে সন্তান কী চায়, কী করলে তার ভালো লাগবে; এটা বোঝার ক্ষমতা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নানাবিত্তের বাবা-মা কারো মাঝেই নেই।

সুনীল দত্ত অত্যন্ত সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ। সঞ্জু তার কার্বন কপি হবে; লোকে সুনাম করবে ইত্যাদি দক্ষিণ এশিয় বাবার চাওয়ার চাপে সঞ্জু মুক্তি খুঁজেছে বখে যাওয়া "টাকার জন্য অর্থশালী বন্ধুর পিছে ঘোরা টাইপের" এক ড্রাগ পেডলারের জোগান দেয়া মাদকের মাঝে। ঐ ড্রাগ পেডলার বন্ধু চরিত্রটিও একান্ত দক্ষিণ এশিয়। নইলে এতো কৌশলে সঞ্জুকে মাদকের দিকে টেনে তার টাকায় নিজে বড় লোক হবার ধান্দা করার মতো "সাইডকিক" বন্ধুত্বের খোলসে এতোদঞ্চলেই কেবল মেলে।

নার্গিসের ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু সঞ্জয়কে বিষাদের ফাঁদে ফেলেছে; বিষাদ আক্রান্ত মানুষ মাদকে বার বার আশ্রয় খোঁজে। প্রেমিকা রুবির বিয়ে হয়ে যাওয়া সে বিষাদকে আরও প্রগাঢ় করেছে। কিন্তু সমাজ ও মিডিয়া যতটা আগ্রহভরে রসিয়ে রসিয়ে সঞ্জয় দত্তের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার কাহিনী নিয়ে রগড় করেছে; ততটা মানবিক বোধ নিয়ে বুঝতে চায়নি সঞ্জু জীবনের বেদনার দোলাচল। মানুষকে বুঝতে চাওয়ার এতোটুকু আগ্রহ নেই দক্ষিণ এশিয়ার পরশ্রীকাতর সমাজে।

সুনীল দত্ত, সঞ্জুর এক বন্ধুর সহযোগিতায় এমেরিকায় ছেলেকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন। সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পর অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করছিলো সঞ্জু । কিন্তু ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনার পর সুনীল দত্ত মুসলমানদের এলাকায় দাঙ্গা প্রশমন কাজে সক্রিয় হলে;সঞ্জু কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কাছ থেকে হুমকি পেতে শুরু করে। হিন্দুত্ববাদীরা তাদের বাড়িতে হামলা করে সঞ্জুর বোনকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইলে তারা তা অগ্রাহ্য করে। সঞ্জু তখন বোনের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি আগ্নেয়াস্ত্র বাড়িতে রাখে।

১৯৯৩ সালে মুম্বাই হামলার পর এই ঘটনার সঙ্গে পুলিশ একটি বড় নাম জড়াতে চায়। অবৈধ অস্ত্র রাখার অপরাধে রাষ্ট্র সঞ্জুর ঘাড়ে চেপে বসে। অথচ নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো রাষ্ট্রই। মুসলমান মায়ের ছেলে এবং মুসলমান নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে সক্রিয় সুনীল দত্তের ছেলে হওয়ায় হিন্দুত্ববাদী পুলিশ-সাংবাদিক সবাই লেগে পড়ে সঞ্জুকে সন্ত্রাসী প্রমাণে। সুনীল দত্ত যে সব ট্রাকে করে মুসলমান এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতেন; তার একটিতে বিস্ফোরক পাওয়ার খবর জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিয়ে ছেপে দেয় খবর বিক্রির দৌড়ে দিশেহারা হলুদ মিডিয়া।

সঞ্জয় দত্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যদেশে জন্মালেও ইসলামী কট্টরপন্থী পুলিশ-সাংবাদিক বা রাষ্ট্র-কাঠামো এভাবেই তাকে সন্ত্রাসীর তকমা জুড়ে দিতো নিশ্চিতভাবেই। দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশের সরকারের তল্পিবাহক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যই যেখানে প্রমাণ ছাড়া কাউকে জঙ্গি বলে তকমা দিতে পারে; সেখানে সঞ্জুকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে দেবার ব্যাপারটিও দক্ষিণ এশিয় নোংরা মনের সৃষ্টি এতো বোঝাই যায়। শেষ পর্যন্ত আদালতে এটা প্রমাণ হয় সঞ্জু সন্ত্রাসী বা জঙ্গি নয়। তবে অবৈধ অস্ত্র রাখার অপরাধে তার জেল হয়। কিন্তু মিডিয়া এমনভাবে খবর প্রকাশ করে যেন জঙ্গি হিসেবেই সঞ্জু জেলে যাচ্ছে।

এই সব ভাগ্যবিপর্যয়ের মাঝেও "মুন্না ভাই এম বি বি এস" ছবির সাফল্য প্রমাণ করে সঞ্জয় দত্তের অভিনয় প্রতিভা। সঞ্জু এতো সব ট্র্যাজেডির মাঝেও ভেঙ্গে না পড়া এক শিল্পী। হলুদ খবরের কাগজের বর্জ্য খবর পড়ে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করা কাছা ঢিলা পাতলা বুদ্ধির লোকেরা সুনীল দত্তকেও সন্ত্রাসীর বাবা বলে অপমান করেছে। এমনকি জেল খেটে ফেরার সময় এক উপমানব দক্ষিণ এশিয় মব সঞ্জুকে সন্ত্রাসী বলে গালি দেয়। সঞ্জয় দত্তের জীবন কাহিনী নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের নাম তাই, "কুছ তো লোগ কাহেঙ্গে" (পাছে লোকে কিছু বলে)।

এইসব নরভোজি সমাজ-সাংবাদিক-পুলিশ-সরকার- রাষ্ট্র নামের দৈত্যের নখরে ক্ষতবিক্ষত হয়েও নিজের শিল্পীসত্ত্বা বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে জিতে যাওয়া একটি নাম সঞ্জু । সঞ্জু ছবিটি তরুণদের জন্য দেখা খুবই জরুরী। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার নোংরা মননের ঈর্ষার মাইন পাতা ষড়যন্ত্রী সমাজে টিকে থাকার মানসিক শক্তি যোগায় সঞ্জু।

কেউ জীবনে হারতে না চাইলে তাকে হারাবে কার সাধ্য!

আপনার মন্তব্য

আলোচিত