শুক্রবার, , ১৬ নভেম্বর ২০১৮ ইং

রিপন দে

২৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১৭:১০

যে সাপের ভয়ে পালায় অন্য সাপ!

বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের নানা প্রাণিদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ যেমন আছে তেমনি নির্বিচারে বন্যপ্রাণী হত্যা করাও বেশীর ভাগ মানুষের কাছে আনন্দের। কিন্তু যত প্রাণি কমছে ততই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে বিভিন্ন রোগ ব্যাধিসহ নানা প্রকারের নেতিবাচক আঘাত আসছে মানবজাতির উপর। তবে অন্যান্য বন্যপ্রাণীর থেকে সাধারণ মানুষ সাপ মারতে আরেকটু বেশি উৎসাহ পায়।
 
কোথাও সাপ দেখা গেলে মানুষজন লাঠিসোটা নিয়ে ছুটে যায়, রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয় কার আগে কে পিটিয়ে মারবে। এ যেন জন্ম-জন্মান্তরের শত্রুতা। যার কারণে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে সাপ। সঠিক জ্ঞানের অভাবে নির্বিচারে সাপ মারা এবং এদের আবাসস্থল নষ্ট করায় অনেক প্রজাতির সাপই আজ বিলুপ্তির পথে।

বাংলাদেশের পরিবেশের উপকারী অন্যতম সুন্দর একটি সাপ হচ্ছে শঙ্খিনী সাপ। যারা সাপকে ভালবাসেন তাদের কাছে এই সাপ খুবই প্রিয় তার শান্ত স্বভাবের জন্য। অতি সুন্দর ও চমৎকার রঙে সজ্জিত এই সাপের মাথা আকারে বেশ বড়। সারা শরীর জুড়ে পরপর কালো ও হলুদ ডোরা। খুব বিষধর সাপ হলেও দেশের ইতিহাসে শঙ্খিনী সাপের কামড়ের মানুষ মারা যাবার ইতিহাস স্মরণকালে নেই তবুও মানুষ এই সাপটিকে দেখা মাত্রই মেরে ফেলছে। এদের বিষ নিউরো টক্সিন।

শঙ্খিনী সাপকে এলাকা বিশেষে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন- শাখামুটি, সানি সাপ (খুলনা অঞ্চলে), দুই মাথা সাপ ইত্যাদি। ইংরেজিতে এর নাম Banded Krait, বৈজ্ঞানিক নাম: Bungarus fasciatus। এই সাপদের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য হতে পারে ৬ থেকে ৭ ফুট। এই সাপকে বাংলাদেশের আবাসিক সাপ বলা হয়।

সারাদেশেই এদের দেখা যায় তবে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এদের অবস্থান বেশী। দেশের বাইরে ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, লাওস, ম্যাকাও, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনেই অংশে এদের পাওয়া যায়। গ্রাম এলাকায় এদের দুইমুখের সাপও বলে। তবে সেটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এ সাপের লেজের অংশটি ভোঁতা থাকে। তাই অনেকেই একে দুইমুখো সাপ বলে ভুল করে।

এরা নিশাচর। ইঁদুরের গর্ত, ইটের স্তূপ এবং উইয়ের ঢিবিতে এরা থাকতে পছন্দ করে। অন্যান্য সাপ এদের ভয়ে পালিয়ে যায়। আইইউসিএন এই সাপকে বাংলাদেশে বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
 
এই সাপ যে এলাকায় থাকে অন্যান্য সাপ সাধারণত সে এলাকায় থাকে না কারণ অন্য প্রজাতির সাপ এদের প্রিয় খাদ্য। নিশাচর শঙ্খিনী সাপ কেউটে, গোখরা  কালাচসহ অন্যান্য বিষাক্ত সাপকে খেয়ে ফেলে। এদের ভয়ে অন্য সাপ পালিয়ে যায়।

শঙ্খিনী বর্ষায় ডিম দেয় ও বাচ্চা তোলে। স্ত্রী সাপ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ৪ থেকে ১৪টি ডিম দেয় এবং ডিমের পরিস্ফুটনকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ডিমের পরিস্ফুটনের জন্য ৬১ দিন সময় লাগে। শঙ্খিনীর বিষ খুব দামী এবং এর চামড়ার বাজারদর অন্য সাপ থেকে খুব চড়া।

রাজশাহী সাপের খামারের পরিচালক বোরহান বিশ্বাস রোমন বলেন, প্রতিটি সাপের জীবন হুমকির মুখে। এখনই প্রজননের ব্যবস্থা না করলে এরা বিপন্ন হয়ে যাবে। প্রজননের জন্য খামার হতে পারে সব চেয়ে ভাল মাধ্যম। এতে সাপ যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দামী এই সাপের মাধ্যমে অর্জন করা যাবে বৈদেশিক মুদ্রা।

সাপ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছেন কামরুজ্জামান বাবু। তিনি জানান, সাধারণ মানুষকে আমরা সেভাবে সচেতন করতে পারিনি তাই সাধারণ মানুষের কাছে সাপ মারা যেন উৎসবের কাজ। তবে সাধারণ মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন করতে পারলে এখনো এই সাপকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে নয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণি বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, অন্যান্য সাপের মত এই সাপও কমছে মূলত দুটি কারণে। এক মানুষ নির্বিচারে সাপ হত্যা করছে। অন্য কারণ হচ্ছে মানুষের কারণে সাপের বাসস্থান বিপন্ন হচ্ছে দ্রুত। যেহেতু এই সাপ অন্য সাপকে খেয়ে ফেলে তাই প্রাকৃতিকভাবেই এই সাপ পরিবেশে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত