রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ ইং

শোয়েব উদ্দিন, জৈন্তাপুর

২৩ জানুয়ারী, ২০১৯ ১২:৫৪

জৈন্তাপুরের সতিনাথ মন্দির রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে আজ জরাজীর্ণ

মন্দির তৈরি করা হতো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা করার জন্য। সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা পৃথিবীতে বহু মন্দির নির্মাণ করেছেন। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে অনেক মন্দিরের চিহ্নটুকুও। আবার এমনও আছে সৃষ্টির শত বছর পরেও কিছু কিছু মন্দির-প্রার্থনালয় রয়েছে অক্ষত অবস্থায়। কোথাও আবার মন্দির রয়েছে ঠিকই কিন্তু সংস্কারের অভাবে পড়ে রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়।

এমনই একটি মন্দির সিলেটের জৈন্তাপুরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। উপজেলার ভিত্রিখেল গ্রামে সতিনাথ মন্দির রক্ষনাবেক্ষন ও সংস্কারের অভাবে আজও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায়।

যারা দেশ বিদেশে প্রাচীন ঐতিহ্য আর পুরাকীর্তির খোঁজে ঘুরে বেড়ান তাদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্থান উপজেলার ভিত্রিখেল গ্রামে সতিনাথ মন্দিরটি। শত বছর আগে নির্মিত এ মন্দিরটি পাহাড় টিলা ঘেরা সবুজের মধ্যে পর্যটকদের দৃষ্টি কারে। ভিত্রিখেল গ্রামে গেলে পাহাড় কোল ঘেঁষে প্রাচীন আমলে পরস্পর সংলগ্ন একই সাথে দুটি মন্দির দেখা মিলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মন্দির দুটি ভৈরব মন্দির নামে পরিচিত।

মন্দির দুটির মধ্যখানে আরেকটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষশ দেখা যায়। আর সেগুলোর পাশে রয়েছে একটি পুকুর, যে টি সেবায়েত ও পুজারীদের পানি ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দির দুটির পুরোটাই অক্ষত রয়েছে তবে সেখানে পূজা কিংবা কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না।

জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে এ পর্যন্ত যে কয়েকটি বই বিভিন্ন লেখক গবেষকেরা প্রকাশ করেছেন তাদের প্রকাশিত গ্রন্থে জৈন্তিয়া রাজ্যের এই পুরাকীর্তির কোন ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি কিংবা তারা এই পুরাকীর্তিটি কখনো তাদের নজরে আসেনি বলে মনে হয়।

সম্প্রতি জৈন্তিয়া রাজ্যের অজানা পুরাকীর্তির অনন্য এই নির্দেশনটির কথা উল্লেখ করেন ফিন্যান্স সাংবাদিক, লেখক এবং কলামিস্ট আব্দুল-হাই-আল হাদি প্রকাশিত “সিলেটের প্রত্মসম্পদ” বইটিতে সতিনাথ মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছেন। এই মন্দিরের ইতিহাস পাওয়া না গেলেও এই মন্দির নিয়ে একটি অন্যতম লোক কাহিনী রয়েছে ।

লোক কাহিনী মতে জানা যায়, ১৯৭০ সালে জৈন্তার দ্বিতীয় রাজা রাম সিংহ এখানে মন্দির দুটি নিজ হাতে নির্মাণ করেন চারিকাটা ইউনিয়নের পূর্ব ভিত্রিখেল গ্রামে। সতিনাথ নামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী বসবাস করতেন সেখানে। সে গ্রামের অনতিদূরে ছিল আরেক মুসলিম সুফির বসবাস। একদিন সন্ধ্যায় হিন্দু সন্ন্যাসী মুসলিম সুফির বাড়ীতে যান এবং সুফিকে বলেন যে, আজ সন্ধ্যায় দুজন রাজার বাড়ীতে যাবেন।

মুসলিম সুফি বলেন, সন্ধ্যার সময় পায়ে হেঁটে রাজার বাড়ীতে যাওয়া সম্ভব নয়। তাৎক্ষনিক সন্ন্যাসী সুফির জায়নামাজে বসে রাজার বাড়ীতে চলে যান। ঐ দৃশ্য দেখে মুসলিম সুফি অবাক হয়ে যান। সন্ন্যাসী রাজবাড়ীতে উপস্থিত হয়ে রাজ কর্মচারীদের কাছে রাজার সাথে দেখা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

তৎক্ষণাৎ তারা জানান, রাজা মশাই সন্ধ্যা বাতি নিয়ে ব্যস্ত আছেন, তাই উনার (রাজার) সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। একথা শুনে সন্ন্যাসী জানান, আপনাদের কথা টিক নয়, রাজার হাতি গুলো এখন কোন কোন জায়গায় রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করছেন তিনি। রাজ কর্মচারীরা অন্দর মহলে গিয়ে রাজা মহাশয়কে কথাটি জানালে তিনি (রাজা) হতবাক হয়ে যান। সত্যিই তিনি সন্ধ্যা বাতির সময় একটি হাতির কথা চিন্তা করেছিলেন।

রাজা সন্ন্যাসীদেরকে আপ্যায়ন করানোর আদেশ দেন এবং বলেন যে, একটি কাঁঠালের মধ্যে যেন সব গুলো কোষ রেখে দেওয়া হয়। এটি সন্ন্যাসী পরীক্ষার জন্য রাজার কৌশল ছিল মাত্র। আপ্যায়নের একপর্যায় সন্ন্যাসী একটি কাঁঠাল ভাঙ্গেন এবং রাজাকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সে কাঁঠালটির মধ্যে কেবল মাত্র কোষ। তা দেখে রাজা অবাক হয়ে যান। তিনি সন্ন্যাসীদের অনেক আদর আপ্যায়ন করে রাতে খাবারের ব্যবস্থা করেন।

পরদিন রাজা পাথর বোঝাই করে অনেক গুলো হাতিসহ সন্ন্যাসীর বাসস্থানে যান এবং সেখানে একটি মন্দির ও পানি ব্যবহারের জন্য একটি পুকুর খনন করে দেন। পরবর্তী সময়ে রাজা সে সন্ন্যাসীকে রাজদরবার হতে দামী উপহার সামগ্রী পাঠাতেন। সন্ন্যাসী মৃত্যুর পর রাজা সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন।

বর্তমানে সেখানে পরপর দুটি মন্দির ঘর ও মন্দির প্রাঙ্গনে একটি পুকুর বিদ্যমান রয়েছে। মন্দিরের কিছু অদূরে একজন পুরোহিত বসবাস করেন। তিনি এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা অবহিত নন। তবে তিনি দাবী করেন তার পূর্ব পুরুষেরা প্রজন্মান্তরে মন্দিরের সেবা করে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে পূজা অর্চনা তারাই করে থাকেন।

পুরাকীর্তি সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে আমাদের জৈন্তা রাজ্যের অন্যতম পুরাকীর্তি গুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। জৈন্তিয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই পুরাকীর্তি গুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়নের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক ও সময়ের দাবী জানান জৈন্তাপুর উপজেলার সচেতন মহল।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত। জৈন্তাপুরে শত বছরের ইতিহাস, জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে। অথচ আমাদের জৈন্তাপুরে এই মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষণের যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের সাক্ষ্য মহা মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন স্থাপত্য কাঠামো ও প্রত্মনিদর্শন। যদিও প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা।

প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে জানাতে চাইলে সেভ দ্য হেরিটেজ এন্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল হাই আল হাদী জানান, প্রত্নতত্ত্ব বাংলাদেশের এক অনুপম সাংস্কৃতিক নিদর্শন। পৃথিবীর যে কয়েকটি স্থান প্রত্নতত্ত্ব জন্য বিখ্যাত, তার মধ্যে জৈন্তাপুর অন্যতম। এগুলোর সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা সত্যিই জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশনসহ সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেন, আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ জৈন্তারাজ্যের পুরাকীর্তি গুলো রাজার আমলে যেভাবে ছিলো টিক সেই ভাবে সংরক্ষণ করে রাখলে পুরাকীর্তি সম্পর্কে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।

মন্দিরটিতে যে ভাবে যাবেন, সিলেট, দরবস্ত কানাইঘাট সড়কের চতুল বাজারে অবস্থান করে সেখান থেকে সোজা উত্তর দিকে লালাখাল চা বাগানের দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরে রাস্তার পশ্চিম দিকে পূর্ব ভিত্রিখেল গ্রামে সতিনাথ মন্দিরের অবস্থান।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত