বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ ইং

পল্লব পলাশ

৩১ মার্চ, ২০১৯ ১৭:১৭

হারিয়ে যাওয়া বন্ধু'র কাছে খোলা চিঠি

আমি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে চাকরী করি। আজ সকালেই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শহীদ স্মরণে ফুল প্রদান করা হবে, আমাকেও যেতে হবে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঁঙ্গনে তাই আজ রাতে আর ঘুম হলো না।

বেশ কিছুদিন যাবৎ ছেলেবেলার কিছু মূহুর্ত বুকের তরঙ্গে বীণার মত বাজছিল। আমার মফস্বলের সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তেমন কোন স্মৃতি মনে না থাকলেও কিছু স্মৃতি আজও সুখ কিংবা বেদনার উদ্ভাস।

স্কুলে বাংলা পড়াতেন দিদি ম্যাডাম, আমি অবশ্য পারিবারিক সূত্রে “মাসি” বলেই সম্মোধন করতাম। স্কুলের সবচেয়ে রাগী আর ভয়ংকর মানুষটির নাম ছিল “হেনা ম্যাডাম” তাকে দেখলে ভয় না পাওয়ার কোন অবকাশ থাকতো না।

একবার তৃতীয় শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষার সমাজ বিজ্ঞানের খাতায় “পেটিকোট” নামের কোন একটা শব্দ লিখেছিলাম, শব্দটা আঞ্চলিক হয়েছিল বলে তিনি কতই না রেগেছিলেন। আমাকে উত্তম-মধ্যম খেতে হয়েছিল সেসময়। অবশ্য এমন মূহুর্তই আজ আমার স্মৃতির ডায়েরীকে সমৃদ্ধ করেছে।

ছেলেবেলার ঐ কথা মনে পড়লে আজ আমাকে হাসায় কখনোবা করে তুলে চঞ্চল শৈশবের অবুঝ বালক।

শাহেদ, আমার বন্ধু, পুরোনাম শাহেদ আহমদ কাওছার, ইংরেজী ক্লাসে তো একবার “সেবিকা” এর ইংরেজি লিখেই দিয়েছিল”SEBIKA”, হাহাহা… আনন্দের শৈশব।

ইংরেজি পড়াতেন স্কুলের প্রায় সবার অন্যতম প্রিয় শিক্ষিকা পারভীন ম্যাডাম, স্বামীর চাকরির সুবাদে তাদের থাকা হত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম লিমিটেড অর্থাৎ বিপিএল কোয়ার্টারে আমরা তাঁকে বিপিএল আপা বলে ডাকতাম, কতোই না বোকা ছিলাম আমরা। হাহাহা...

স্কুলে আমাদের সকল ক্লাসের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারী আমরা তিনজনই ছিলাম- ফজলু, আমি এবং শামু। প্রতি বছর আমাদের রোল নাম্বার পরিবর্তন হলেও এক, দুই, তিন আমরাই থাকতাম।

ফজলু অনেক ছোটখাটো, গোলগাল মানুষ সেই সাথে বয়সের অনুপাতে মেধাবী ও শান্তশিষ্ট স্বভাবের।

আর শামু, শামসুন্নাহার শামু, অসম্ভব ফর্সা আর তখনকার আধুনিকা শিশু বলা যায় তবে ফাজলামিতে আমরা দুই শুরীর সাক্ষী মাতাল হিসেবে উত্তম-মধ্যম পড়তো। অনেক বেত্রাঘাতে লাল হয়ে থাকতো শামু তবু দুষ্টামী চলতো একি ধারায় আমাদের সাথে। এভাবেই পার হয়ে গেলো প্রাথমিক স্কুলের তিনটি বছর, আমরা ক্লাস ফোরে পদার্পন  করেছি। ফজলু আর আমি উমর আলী কল্যাণ ট্রাষ্ট্রের একটি বৃত্তিও পেয়েছিলাম সে বছর।

খুব সম্ভবত আমি অসুস্থ থাকার কারণে কিছুদিন স্কুলে যাইনি, সপ্তাহ খানেকপর এসে শুনি ফজলু, আমার প্রিয় বন্ধু, খেলার সাথী ওর বাবার চাকুরির সুবাধে অন্যত্র বদলি হয়ে গিয়েছে। সে দিন আমি এতটাই আঘাত পেয়েছিলাম যে বিষন্নতায় আমার আকাশ ভরে উঠেছিল তারপর অনেকদিন আমি আর স্কুলে যাই নি। নুরুল স্যার ছিলেন গণিতের শিক্ষক, সদ্য স্কুলে জয়েন করেছেন তিনি। তিনি আমাকে বাসায় এসে অনেক বুঝালেন এবং আমি পুনরায় স্কুলে যেতে থাকলাম। তারপর স্বাভাবিকভাবেই সব ঠিকটাক চলছিল – শামু, আনোয়ার, শাপলা, শাহজাহান, অমল, প্রসেনজিৎ, সাহেদসহ আরো প্রায় ১০/১৫ জন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ছাত্তার স্যারের নিকট ক্লাস করতাম। পড়াশোনায় একটু উলটপালট হলেই বেতের প্রহার বাদ যেত না।

সেবার স্কুল বন্ধ, যথারীতি বৃত্তি ক্লাসের জন্য বৃষ্টির কোন একদিনে আমি, আনোয়ার, শাহজাহান ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ স্কুলের বারান্দার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল ভেজা কাঁদা গাঁয়েমাখা একটি ছেলে শাহজাহান বলে উঠেছিল, He is a Fettor — হা হা হা...  আমাদের হাসির একটা স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল বটে।

আনোয়ার খেলার মাঠের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,The picth is পিছলা। হা হা হা... সে সময়টাই বোধ  সবচেয়ে আনন্দের ছিল।

ছাত্তার স্যারের ক্লাসে, শামু ও শাহজাহানের কপালে থাকত বেতের প্রহার শুধুমাত্র ইংরেজি tense মানে ক্রিয়ারকালের ক্রিয়া কলাপ ঠিকঠাক না বোঝার জন্য।

শামুর হাতের লাল দাগ মাঝে মাঝে আমাদের খুব কষ্ট দিত তবে এটা আমাদের ক্লাসের ফাঁকে হাসির খোরাকও ছিলো বটে। মাঝে মাঝে আমাদের হাড় জ্বালানোর দুষ্টুমিতে ক্লাসের অন্য ছাত্ররাও একাত্মতা প্রকাশ করতো তার মধ্যে আনোয়ার ও শাহজাহান ছিল অন্যতম।

ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার পর হঠাৎ করেই শামু’র আর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না!

তারপর কত খোঁজাখুঁজি শামুরা যেখানে থাকতো সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম শামুর বাবা অনত্র বদলি হয়েছেন সরকারী চাকুরীসুত্রে, তবে শামুদের কোন ঠিকানা কিছুই পাইনি অনেক চেষ্টা করেও। আনোয়ার আর আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোন লাভ হয়নি তখন।

আমি ক্লাস সিক্সে হাই স্কুলে ভর্তি হই সবার সাথে যারা আমার সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ছিল- কিন্তু ছিল না শুধু শামু আর ফজলু তো অনেক আগে থেকেই নিরুদ্দেশ।

তারপর কেটে গেল প্রায় ১৫ বছর ততদিনে বন্ধুদের অনেকে পড়াশোনা শেষ করে যারযার কাজে মন দিয়েছে আর কেউবা চাকুরীর সন্ধানে। সময় তাঁর নির্দিষ্ট স্রোতে চলতে চলতে হারিয়ে গেলেও ছেলেবেলার বন্ধুত্বগুলো রয়ে গিয়েছিলো মনের গহীনে। সবার কথা প্রায়ই মনে পড়তো। হঠাৎ একদিন ফেইসবুকের কল্যাণে হারিয়ে যাওয়া ফজলু’র সাথে কনভারসেশন হয়; সে তখন ঢাকার নামী একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষানবীশ। খুব আনন্দ অনুভূত হয়েছিল সেদিন, মনে হয়েছিল অপ্রাপ্তির অনেকটা পেয়েছি।

ফজলুকে পাওয়া গেলও শামুর কোন হদিস পাচ্ছিলাম না। শামুর বাবার একটি টেলিটক নাম্বার চা বাগানের অন্যান্য কর্মকর্তাদের থেকে যোগাড় করতে পারলেও সে নাম্বার বন্ধ থাকায় কখানো যোগাযোগ হয়ে উঠেনি। বন্ধুতের একটা জায়গা শূন্য রয়ে গেছে, জানি না শামুর সাথে দেখা হবে কি-না! তবে আক্ষেপের ডালি উজাড়
হোক, দেখা হোক বন্ধুর সাথে। এই অভিপ্রায়ে বন্ধুর কাছে খোলা চিঠি।

(পেলে উত্তর দিস)

ইতি

পল্লব পলাশ

আপনার মন্তব্য

আলোচিত