সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ইং

নাদিম মাহমুদ

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:২৬

দাড়িতে জীবাণু ও রঞ্জিত সংবাদ!

সম্প্রতি বিবিসি একটি সংবাদ করেছে, যার শিরোনাম ছিল ‘Dogs are cleaner than beards' say Swiss scientists, অর্থাৎ কুকুর দাড়িওয়ালাদের চেয়ে বেশি পরিস্কার’। বিবিসির এই সংবাদটি বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। সংবাদটিতে আংশিক তথ্য আসায় এ নিয়ে বিতর্ক চলছে।

কিন্তু কেন এই সংবাদ?

গত বছর ৩০ জুলাই ‘ইউরোপিয়ান রেডিওলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘Would it be safe to have a dog in the MRI scanner before your own examination? A multicenter study to establish hygiene facts related to dogs and men’- পড়ে যতটুকু জানলাম, তাতে আমার কাছে স্পষ্ট মনে হচ্ছে বিবিসির সংবাদটি নানা কারণে বিতর্ক তৈরি করে দিয়েছে।

গবেষণাটির উদ্দেশ্যে ছিল, ইউরোপজুড়ে যে ৮০ মিলিয়ন পোষা কুকুর আছে, সেইসব কুকুরের পশু চিকিৎসার সময় ব্যয়বহুল এমআরআই যন্ত্র সব পশু চিকিৎসালয়ের কেনা সম্ভব হয় না, তাই একই যন্ত্রে মানুষ ও কুকুরের এমআরআই করানো কি স্বাস্থ্যসম্মত? আর তা জানার জন্য, তারা কুকুরে পশম ও মানুষের দাড়ির নমুনা সংগ্রহ করে।

প্রকাশিত জার্নালে বলা হয়, তারা ১৮ জন পুরুষের দাড়ির নমুনা এবং ৩০টি কুকুরের পশমের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে মানুষের দাড়ি ও কুকুরের পশমে বিভিন্ন মাত্রায় মাইক্রোব পাওয়া গেছে।

জার্নালটিতে লেখা হয়েছে, A total of 18/18 men displayed high microbe counts, while 7 dogs exhibited moderate microbe counts and 23 dogs had high microbe count।

সাধারণত আমাদের শরীরের চামড়া, মুখ, নাক, চুলের প্রতিরক্ষা মাধ্যম হিসেবে প্রায় ১৯ টি গোত্রের এক হাজার প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যাদেরকে আমরা স্কীনফ্লোরা বলি, যেগুলো প্রাথমিক ইমিউন্যূ সিস্টেমের বড় অংশ। সুতরাং শরীরের অন্যান্য জীবাণুর হাত থেকে রক্ষার জন্য ব্যাকটেরিয়া বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

তবে সাময়িকীতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, In 7/18 humans and 4/30 dogs, we found human-pathogenic bacteria. However, this difference does not meet statistical significance; অর্থাৎ ১৮টি নমুনার মধ্যে ৭ জনের মধ্যে পাঁচজনের কাছে Enterococcus faecalis আর দুইজনের কাছে Staphylococcus aureus ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আর এই ব্যাকটেরিয়াগুলো প্যাথজেনিক হলেও চামড়াতে অহরহ পাওয়া যায়। যেগুলোকে বলা হয় স্কীনফ্লোরা।

অন্যদিকে, ৩০টি কুকুরের ঘাড়ের পশমের যে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেখানে ৪টি কুকুরের তিন প্রজাতির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া Staphylococcus aureus (১), Moraxella spp (১) এবং Enterococcus sp (২) পাওয়া গেল।

সাময়িকীতে এইসব তুলনাকে পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্ববহন করে না বলে জানানো হলেও বিবিসির প্রতিবেদনে কোথাও সেই কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং তারা লিখেছে, Seven of the men had so much beard bacteria, there was a risk of them getting sick।

সাতজনের দাড়িতে দুই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া আর চার কুকুরের তিন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া, কোনটি বেশি গুরুত্ব পেল তা সংবাদে উঠে আসেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, গবেষণার উদ্দেশ্য যদি মানুষ ও কুকুরের এমআরআই এক সাথে করানো সম্ভব কীনা, তা হয় তাহলে মানুষের কেন দাড়িকে নমুনা হিসেবে ধরা হয়েছিল, কেন চুল, হাতের পশম নয়?

পশুদের শরীরে যে শতশত fleas or worms থাকে সেটা কিন্তু গবেষণায় আসেনি। এছাড়া এমআরআই করতে দাড়ি যতটা যন্ত্রের যন্ত্রাংশে স্পর্শ করে তার চেয়ে তার শরীরের চামড়া বেশি বেশি কন্ট্রাক্ট থাকে, তাহলে দাড়ি কেন নমুনা হল?

জগতের যারা জীবাণু ও তার প্রতিষেধক তৈরিতে গবেষণা করেছেন সেই বিজ্ঞানীদের কাতারে সিংহভাগই ছিলেন দাড়িওয়ালা, তাহলে কি তারা অসুস্থ ছিলেন?

যারা এই গবেষণাটি রিভিউয়ারের দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি এই বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়েছিলেন? নাকি বিবিসিও বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আঘাত দিতে কি এমন সংবাদটি পরিবেশন করলেন?

  • নাদিম মাহমুদ: গবেষক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত