মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ইং

বিজিত কুমার আচার্য্য

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৮:১৩

ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শতাধিক নাম জানা অজানা অনেক নদ- নদী। এ সকল নদ-নদীর বেশির ভাগ উৎপত্তিস্থলই হল ভারতের হিমালয়ের পাদদেশ। বাংলাদেশে নদ-নদী বেশি থাকার কারণেই তখনকার সময়ে যোগাযোগে আমাদের বর্ষা মৌসুমে একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। আর নৌকাকে ঘিরেই হয়ে উঠত সারা বছর ব্যাপী আমাদের কত না আনন্দ উৎসব। এর মধ্যে নৌকা বাইচ হল - আমাদের দেশে নৌকা নিয়ে বর্ষা মৌসুমে এক রকমের অন্যতম খেলা। যা আমাদের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদও অংশ।

আবহমান বাংলার হাজার রকম লোক ঐতিহ্যের মধ্যে নৌকা বাইচ লোক কৃষ্টির অঙ্গ। রূপ বৈচিত্র্যের বাংলার মধ্যে সিলেট অঞ্চলের মানুষ কৃষ্টি ধারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে আমরা নানা রকম লোককৃষ্টি ভুলে গিয়ে জীবনযাত্রায় এনেছি অনেক পরিবর্তন বিবর্তন। আগের মত আমাদের নৌকাবাইচ জমে উঠে না। আমাদের এইসব ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরা অতীব জরুরী। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেলেও তা আবার নতুন করে শুভ সূচনা হয়েছে। এতে করে গ্রাম বাংলার আবাল বৃদ্ধ বনিতা নতুন করে গৃহ কেন্দ্রিক বিনোদন ত্যাগ করে অতীতের গ্রাম বাংলার কৃষক শ্রমিক জনতার বিনোদনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছে। নৌকা বাইচ হল একটি দৃষ্টি নন্দন রোমাঞ্চময় লোক সংস্কৃতির অনন্য দৃষ্টান্ত।

নৌকা বাইচের ইতিহাস :
নৌকা বাইচ এর সঠিক ইতিহাস আজও জানা যায় নি। তবে বাইচ শব্দটি ফার্সি । এর অর্থ হল বাজি>বাইজ> বাইচ/প্রতিযোগিতা/ খেলা। কালের পরিক্রমায় ‘মেসোপটেমিয়ার’ মানুষের শুরু করা নৌকা বাইচ খেলা আমাদের দেশেও চলে আসে । যা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এরকম নৌকা বাইচের আয়োজন করত। এরপর মিশরের নীল নদ এবং ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ছড়িয়ে পড়ে।‘‘ বাইচ’’ শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে অনুমিত হয়েছে যে মধ্য যুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীরা যাদের নৌবাহিনী ছিল তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের নদী কেন্দ্রিক নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে দুটি জনশ্রুতি আছে।

১) জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা উপলক্ষে স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকা নিয়ে মাঝিরা নদী পারাপারে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয় । এ থেকেও নৌকা বাইচের শুরু জনশ্রুতি আছে।

২) পীর গাজীকে কেন্দ্র করে আঠারো শতকের শুরুর দিকে মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোন নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হয়। নদী ফুলে ফেঁপে উঠল। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারাও খবর পেয়ে নৌকা নিয়ে ছুটে আসেন। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে । এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়া পত্তন।

সিলেট অঞ্চলে নৌকা বাইচ বহু পুরাতন হলেও তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং সিলেটের সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক মরহুম আব্দুজ জহির চৌধুরী, সাবেক জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরীর প্রচেষ্টায় বাংলালিংক টেলি কমিউনিকেশনের উদ্যোগে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্ট সুরমা নদীতে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন রূপ লাভ করে।

নৌকার গঠন ও নাম:
নৌকা বাইচের নৌকা হয় সরু এবং লম্বাটে । কারণ সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুত গতিতে চলতে পারে। নৌকার সামনে সুন্দর করে সাজানো হয়। কখনো ময়ূরের মুখ , কখনো রাজ হাঁসের মুখ বা পাখির ঠোঁটের অবয়ব তৈরি করে নৌকা বানানো হয়ে থাকে। এতে অতি উজ্জ্বল রং করে ফুল, লতা ,পাতা, আরও অনেক রকম জিনিস এঁকে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে থাকেন। সিলেট অঞ্চলে সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহার করা হয়। এর আকার কোশা ও ছিপ জাতীয় বাইচের নৌকার মতই সরু, লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৫-৬ ফুট হয়। নৌকা তৈরিতে সাধারণত শাল, শীল কড়ই, গর্জন, জারুল কাঠ ব্যবহার করা হয়। নৌকাগুলোর নামও রাখা হয় ভিন্ন ভিন্ন। যেমন সোনার তরী, পঙ্খীরাজ,ময়ূরপঙ্খী ইত্যাদি।

নৌকা বাইচের নিয়ম বা আনুষ্ঠানিকতা :
নৌকা বাইচের আগে মাঝিরা প্রথমে পাক পবিত্র হয়ে বা গোসল করে নতুন গেঞ্জি আর মাথায় গামছা পরে নৌকায় উঠে। তাদের কারো কারো হাতে থাকে কাঁসর, করতাল, ঢোল, ডপকি। সবার মাঝখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। প্রতিটি নৌকায় ৭,২৫, ৫০, ১০০ জন মাঝি থাকতে পারেন। নৌকার দুই পাশে মাঝিরা সারি বেঁধে বসে পড়েন বৈঠা হাতে নিয়ে। একজন নৌকা পরিচালনা করার জন্য থাকেন তাকে গায়েন বলা হয়। তিনি বসে থাকেন নৌকার গলুইয়ে। মাঝিরা একত্রে নৌকা জয়ধ্বনি করে ছাড়ার সাথে সাথে সমবেত স্বরে গান ধরে থাকেন এবং ঝোঁকে ঝোঁকে বৈঠা টানতে থাকেন সেই সাথে নৌকা ও এগিয়ে যেতে থাকে। সবার নৌকা যখন ছুটতে থাকে তখন প্রতিযোগিতা শুরু হয় । কার আগে কে যেতে পারে। সমস্বরে ঝোঁক তুলে গাইতে থাকে হৈ হৈ হৈয়া হৈ হৈয়া। নৌকার গতিও বেড়ে যায় অনেক। নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় দূরত্ব হয় ৬৫০ মিঃ। এক নৌকা থেকে আরেক নৌকার দূরত্ব থাকবে ১০ মিঃ।

নৌকা বাইচের গান :
নৌকা বাইচের গানকে সারি গান বলা হয়। এ গান শ্রমিকের গান হিসাবে পরিচিত। সিলেট অঞ্চলের অনেক মরমী সাধক নৌকা বাইচ নিয়ে অসংখ্য সারি গান লিখে আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। শাহ আব্দুল করিম লিখেছেন-১) আল্লার নাম, নবীর নাম লৈয়ারে ২) কোন মেস্তরী নাও বানাইল ৩) মহাজনে বানাইয়েছে ময়ূরপঙ্খী নাও ইত্যাদি, হাছন রাজা লিখেছেন -ছাড়িলাম হাছনের নাওরে ; সৈয়দ শাহ নুর লিখেছেন- পাক পানি চিনিয়া নাও বাইও ; ও সোনা ভাবী গো লিখেছেন তৈমুর রাজা চৌধুরী ; এছাড়া অজ্ঞাত শিল্পীদের মধ্যে প্রচলিত গানগুলো হল – রঙ্গিলা মাঐ গো, সোনামুখীর জামাই আইছে, সোনা দাদার বৌ গো ইত্যাদি।

আমাদের নৌকা বাইচের নদীগুলো সুরমা ,কুশিয়ারা, খুয়াই, মহসিং ,বাদাঘাটের চেঙ্গের খাল সহ অনেক নদী দখলদারদের দখলে গিয়ে নদীর প্রকৃত গতিপথ হারিয়ে ফেলছে । সেই সাথে নদী ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়ে নৌ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আমাদের উচিত অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদীর দখলমুক্ত করে নদী শাসন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতি নৌকা বাইচ সহ আরও অনেক সংস্কৃতি সমূহকে পুনরুদ্ধার পূর্বক আমাদের লালিত স্বপ্ন আমাদেরই মাঝে বেঁচে থাকুক অম্লান।

তথ্য সংগ্রহ: ইন্টারনেট, উইকিপিডিয়া, লোক সংস্কৃতি, সৈয়দ মোস্তফা কামালের সিলেটের মরমী সাহিত্য এবং প্রবীণদের দেয়া তথ্য সংগ্রহ।

বিজিত কুমার আচার্য্য: কৃষিবিদ; উপ-সহকারী কৃষি অফিসার, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত