শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

ধ্রুব গৌতম

০৫ অক্টোবর, ২০১৯ ১৭:১৪

শৈশবের দুর্গোৎসব : ডেডলাইন মুন্সিবাড়ি

সে বয়সে বইয়ের সাথে এতোটা দায়বোধ জন্মেনি। বাবা-মায়ের বেতুয়া বাঁশের সিংলার বাড়িতে বাধ্য হয়ে যতটুকু সম্পর্ক হয় ঠিক ততোটুকুই। ষাণ্মাসিক পরীক্ষার পর দুর্গা পূজা উপলক্ষে স্কুলে লম্বা ছুটি। পরীক্ষার সময় মায়ের কাজও বেশ বেরে যেত। তখন নতুন কাপড় পরার খুব প্রচলন বা সাধ্য আমাদের ছিলো না। পুরাতন কাপড় ধুয়ে পরার প্রচলনই ছিলো বেশী। মা কাপড় ধুয়ে ধুয়ে বিছানার জাজিমের নীচে রেখে দিতেন, ইস্ত্রির কাজ হয়ে যেত। নয়তো কাঠের আংরায় লোহার ভারি ইস্ত্রি দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করে দিল্লী স্টিল মিলের বড় ট্রাংকে রেখে দিতেন। মায়ের ট্রাংকে কাপড় সাজানোতে বুঝতাম দুর্গা পূজায় দাদুর বাড়ী যাবার সময় এসে গেছে।

প্রতিটি পূজার আগে দাদুর দুটি চিঠি বাড়িতে আসত এক সাথে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে। একটি চিঠি ঠাকুরমা ঠাকুরদার কাছে পূজার নিমন্ত্রণসহ মেয়ে নাতি নাতনিকে পূজোয় পাঠিয়ে দেবার জন্য আর অন্যটি বাবার কাছে আমাদের নিয়ে আসার জন্য।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শমসেরনগর মুন্সিবাজারের শ্রীনাথপুর গ্রামের মুন্সিবাড়ি মায়ের বাপের বাড়ি। জীবনে মায়ের এই একটা সময় এক অজানা আনন্দে মাতোয়ারা হতে দেখি। ট্রেনে চড়ে শমশেরনগর, সেখান থেকে মাইলের পর মাইল রিক্সায় চড়ে শ্রীনাথপুর। সে সময়ে রিক্সায় শাড়ী দিয়ে পেঁচিয়ে যাত্রী চলাচল হত। আমাদের বেলাও তাই ঘটতো। কৈলাস থেকে ঊমা আসতেন দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে, আর আমাদের জন্মদাত্রী মা ছুটতেন তাঁর দুই মেয়ে তিন ছেলে নিয়ে। রিক্সার হুড কাপড়ে বেঁধে দিলে আশপাশ দেখা যেত না বলে আমি বসতাম রিকশাওয়ালার সিটের নীচের রড দুটি ধরে।

প্রখর রোদে উদাস হাওয়ায় ঘুমঘোরে ঢুলে ঢুলে পড়তাম। তবুও চোখ দুটি ধান ক্ষেত আর বাঁশ ঝাড়ের ফাঁকে তালগাছের মাথা আর সমাধি মন্দির খোঁজে বেড়াতো। মাটির রাস্তায় হেলে দুলে চড়তে চড়তে হঠাৎ চোখে পড়ত তালগাছের মাথা আর সমাধি মন্দির। তখন যে কি বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ। শাড়ীর আড়ালে থাকা ভাই বোনেরাও নিজে না দেখে ঈদের চাঁদ দেখার খবর শোনার আনন্দের মত আনন্দিত হত।

হরিতকি গাছের ছায়ায় মায়ের পথের পাণে চেয়ে থাকতেন তাঁরই বাবা মন্মথ কুমার দাস চৌধুরী। যত দূর চোখ যায় ততো দূর অপলক দৃষ্টি থাকত স্থির হয়ে। তিনি মুন্সিবাড়ী দেবোত্তর এস্টেটের বিশিষ্ট জমিদার। ফার্সি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়ায় তদানীন্তন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে ইংরেজ সরকার তাঁরই পূর্ব পুরুষ স্বর্গীয় শিবপ্রসাদ দাস চৌধুরী মহাশয়- কে “মুন্সি” উপাধিতে ভূষিত করে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসনকালে ফার্সি ভাষায় লিখিত বাদশাহি আমলের রেকর্ডপত্র পাঠোদ্ধারের জন্য শিবপ্রসাদ মুন্সিকে সরকারী কাজে নিযুক্ত করে এবং পরবর্তীতে সরকারী কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।

মুন্সি শিবপ্রসাদের উপাধি অনুসারে তৎকালীন শ্রীহট্ট জেলার দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার অন্তর্গত কমলগঞ্জ থানাধীন ছয়চিরি পরগণাভূক্ত শ্রীনাথপুর গ্রামে অবস্থিত তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির নাম মুন্সিবাড়ি, বাজারের নাম মুন্সিবাজার। তবে বাড়ির সামনে তাদের বাজারের নাম বাবুরবাজার। মুন্সি শিবপ্রসাদ, তদীয় ভাই মুন্সি কালী প্রসাদ দাসের হাতে জমিদারী প্রতিষ্ঠা এবং কালী প্রসাদ দাসের কনিষ্ঠপুত্র শিক্ষানুরাগী, দানবীর নবকিশোর দাস চৌধুরীর মাধ্যমে জমিদারীর প্রসার লাভ করে।

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার লাভের জন্য নবকিশোর চৌধুরীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। তিনি ১৮৯৫ সালে তাঁরই এস্টেটভুক্ত হরিস্মরণ মৌজায় পিতার নামানুসারে কালীপ্রসাদ এম.ই (মিডল ইংলিশ) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি চৈত্রঘাট, বৃন্দাবনপুর, রামেশ্বরপুরসহ নানা স্থানে লোয়ার প্রাইমারী স্কুল স্থাপন করেন। মুন্সিবাজার ডিসপেনসারি, ডাক্তারদের বাসস্থান, সুপেয় পানীয় জলের জন্য বৃন্দাবনপুর, কাঠালতলীসহ নানা স্থানে দীঘি খনন, মুন্সিবাজার পোস্ট অফিস স্থাপন তাঁরই একক অবদান। তিনি দশবছরেরও বেশী সময় ধরে দক্ষিণ শ্রীহট্ট লোকেল বোর্ডের সম্মানিত সদস্য এবং উনিশ বছরেরও বেশী সময় যাবত মুন্সিবাজার ডিসপেনসারির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সরকার বাহাদুরকে মোটা অংকের অর্থঋণ প্রদান করেন। সে সময়ের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় নিজের মাধবপুর চা বাগান বিক্রি করে বন্যাপীড়িতদের আর্থিক সহযোগিতা করেন।

মৌলভীবাজার মহকুমার প্রথম এবং কমলগঞ্জে প্রথম কালীপ্রসাদ এম.ই (মিডল ইংলিশ) স্কুলটি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীতকরণের জন্য ১৯৬০ সালে নবকিশোর চৌধুরীর পৌত্র মন্মথ কুমার দাস চৌধুরী (আমার মায়ের গর্বিত পিতা), খ্যাতিমান লেখক ও পুরাতত্ত্ববিদ মো: আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব আবদুল বারী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসাহিত্য বিশারদ চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ প্রমুখ জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

মন্মথ কুমার দাস চৌধুরী মৌলভীবাজার মহকুমা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। সে কারণে দেওয়ান ফরিদ গাজীসহ সম পর্যায়ের লোকদের সাথে ছিলো তাঁর চলাফেরা। মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব আজিজুর রহমান সাহেব তাঁরই হাতে গড়া সংগঠক ও কর্মী। ছেলেরা মুক্তিযোদ্ধা। দাদুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর সন্তানেরা মতিয়া গ্রুপের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। তিনি একজন শিক্ষানুরাগীও। নিজের উদ্যোগে তাঁর পিতার নামে বাড়ীর সামনে বাবুর বাজারে মহেন্দ্র কুমার পাঠশালা নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

মুন্সিবাড়ীর দুর্গাপূজার শুরু ঠিক কবে থেকে তার কোন সঠিক ইতিহাস জানা যায় নি। তবে তাঁর উত্তরসূরিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, আনুমানিক সাত পুরুষ পূর্বের পূর্বসূরিরা এ উৎসবের আয়োজন করেন। তবে এ তথ্যের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হলো এ বাড়ীর সংগ্রহে রাখা পঞ্জিকাগুলো। দীর্ঘ বছরের পুরাতন পঞ্জিকাগুলোয় পূজার তারিখে সিঁদুরের ফোটা দেয়া আছে এবং এ বাড়ির ভিটেতে বসবাসকারী পুরোহিতরা সাত-আট পুরুষ থেকে এখানে বসবাস করছেন বলে জানা যায়।

রিক্সা থেকে নেমেই বলের মত গড়িয়ে গড়িয়ে পরতাম এ মহামানুষের পায়ে প্রণাম দিতে। কারণ এই তাঁরই শাসনে আসনে করুণায় থাকতে হবে মাসখানেক, দ্বিতীয়ত তাঁকে খুশী করলে মাও খুশী হোন বাচ্চাদের শিষ্টাচার শিখিয়েছেন বলে। প্রণাম পর্ব শেষ করেই বাড়ীর ভিতরে ভোঁ দৌড়। ডান বামে চেয়ে দেখে নিতাম বাড়ীতে খেলার সাথীরা ঠিকঠাক আছে কি না। আমাদের দেখে সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতেন, “এই সবি আইচে বে, সবি আইচে”।

সবি, আমার মা, জন্মদাত্রী মা। ভালো নাম সবিতা। সবিতা থেকে সবি। জগজ্জননী দুর্গার মত তিনিও বাপের বাড়ি এলে আশপাশের সবাই আনন্দে মেতে উঠে। কারণ আশপাশে মায়ের খুড়া জ্যাঠাদের সাথে বৈষয়িক বাদানুবাদ কদাচিৎ হলেও এই একটা সময় সব কিছু শিথিল হয়ে যেত।

সে সময়ে লেখাপড়ার চাপ না থাকলেও জীবন যাপন করতে হত রুটিন মাফিক। ভোরের আঁধারে বাগিদারের “তি....তি....তি....তি.... হ্যা....র....রা” হাল বাওয়ার শব্দ শুনেই ঘুম ভেঙ্গে যেতো। নাটমন্দির থেকে ফুলের সাজি নিয়ে আমরা ছুটে যেতাম শেফালী গাছের তলে, তারপর এগাছ ওগাছ থেকে ফুল তুলে এনে দিতাম। ইতোমধ্যে রানা মামার ছেলে-মেয়ে সাগর, কৃষ্ণা, ফাল্গুনী, রাতুল, কেতকী মামার ছেলে ঝিনুক গলা ছেড়ে প্রতিযোগিতা করে পড়ত। পড়া শেষে পুকুরগুলোয় ছিপ নিয়ে মাছ ধরা, রান্না ঘর থেকে ডাকলে সবাই মিলে সরিষার তেল আর ক্ষেতের মুখি সিদ্ধ দিয়ে জাউভাত খেতাম।

পূজার মাস দেড়েক আগ থেকে প্রতিমা গড়ার কারিগররা বাড়িতে আস্তানা গাড়ত। সারা বাড়িতে সোঁদা মাটির গন্ধ খেলে খেলে যেত। চোখের সামনে দেখতাম খড়কুটো কিভাবে প্রতিমা হয়ে উঠে। রঙের শিল্পীরা যখন তুলির আঁচড়ে পুরো কাঠামকে জীবন্ত করে তুলতেন তখন মনে হত সত্যিকারের দেবী দুর্গা মণ্ডপ ঘর আলোকিত করে আছেন। পূজোর আগেই চলে আসতেন নারায়ণের শালগ্রাম বিগ্রহ। মা ভোরবেলা নাটমন্দিরে গাইতেন, “রাঈ জাগো রাঈ জাগো”, “প্রভাত যামিনী উদিত দিনমণি”, দুপুরে ভোগারতিতে “ভালি গৌরা চন্দেরো আরতি বলি,”সন্ধ্যায় “ভব সাগর তারণ কারণ হে...” ইত্যাদি।

মা মামা মাসীরা বাড়িতে গেলে তাদের পুরাতন আত্মীয় স্বজনেরাও আসা শুরু করেন। আমরাও পরিচিত হই। কেউ কেউ কোলে নেন, আদর করেন, পাশে বসায়ে রাখেন। একবার মা একজন প্রৌঢ় লোককে প্রণাম করছেন দেখে অবাক হই। কারণ অধিকাংশ লোকই এসে মাকে প্রণাম করতে দেখি। সেই প্রোঢ় লোকের কাছে আমাদের ডেকে এনে মা একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেদিনের সেই প্রোঢ় লোক হলেন “অবনী মাস্টার”। মায়েদের শিক্ষক। তিনি মায়েদেরকে তাঁর টোলে পড়াতেন। মায়ের গুরুভক্তি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম।

আরেকদিন এরকম আরেকজন প্রৌঢ় লোক এলেন, তিনি শ্রদ্ধেয় সুরেন্দ্র বাইন। সংগীতগুরু। এলাকায় সুরেন্দ্র বাইনের গানের সুখ্যাতি ছিলো সর্বক্ষেত্রে। তিনি মুন্সিবাড়ি এস্টেটের জমিদার মন্মথ চৌধুরীর সেতার শিক্ষক এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সঙ্গীত শিক্ষক হওয়ায় সম্মানিত বোধ করতেন। এখনকার সময়ে সঙ্গীতজ্ঞ সুরেন্দ্র বাইনের মতো এমন গুণীজন এ তল্লাটে পাওয়া যাবে না।

মহালয়ার আগে সারা বাড়ি ধোয়ামোছা করে রাখা হত। সে সময়ে গ্রামের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। পেট্রোমাস বা হ্যাজাক লাইট ছিলো ভরসা। রাতে মেনথেলের আলোয় আলোকিত পুরোটা বাড়ী। আলোর সাথে শা শা শব্দ হত। অভয়চরণ, ঈরেশ মামা, পরেশ মামা ছিলেন পেট্রোমাস জ্বালানোর ওস্তাদ।

বেল গাছের তলায় বিল্বষষ্ঠির মাধ্যমে পূজার শুরু। ঢাক ঢোল কাসরের সাথে উলুধ্বনি আর ধূপের ধোঁয়ায় মোহিত হত পবিত্র অঙ্গন। আমাদের মাঝেও উন্মাদনা। এতদিনে মায়ের সব ভাই-বোনেরা স্বামী-স্ত্রী-সন্তানাদি এসেছেন। জগেশ ঠাকুর মায়েদের বাড়ীর কূল পুরোহিত। উনার ছেলে পেঁচন মামাও সার্বিক সহযোগিতা করতেন। তবে পূজার্চনার মূল কাজ করতেন জেলা শহর থেকে আসা শাস্ত্রজ্ঞ কালীপ্রসন্ন মহাশয়। তাঁর দরাজ কণ্ঠের সাবলীল ও সুস্পষ্ট সংস্কৃত মন্ত্রপাঠ উৎসবকে পূণ্যময় করে তুলতো।

পূজা শুরুর আগে চৈত্রঘাট গোপীনাথ মন্দির থেকে নারায়ণ বিগ্রহকে নাইওর আনা হত। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে ভাবামৃত বৈষ্ণব ঠাকুর ছিলেন পুরোহিত। সবার কাছে বৈষ্ণব ঠাকুর নামে পরিচিত হওয়ায় তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নামটা মুছে গেছে সবার মন থেকে। ভোর বেলা থেকে মা, মেজমাসী, বৈষ্ণব ঠাকুর আর বৈষ্ণবী মিলে গাইতেন “প্রভাত সময়কালে শচীর আঙ্গিনার মাঝে, গৌরচাঁদ নাচিয়া বেড়ায়রে”, “রাঈ জাগো রাঈ জাগো, শুক সারী বলে”, “শুতিয়াছে গৌরাচাঁদ শয়ন মন্দিরে”, “ভজ গৌরাঙ্গ, লহো গৌরাঙ্গ, কহো গৌরাঙ্গের নামরে, যে জন গৌরাঙ্গ ভজে, সে হয় আমার প্রাণরে”, মায়েদের গানের সুর এমন ছিলো যেন ভোরের সুমধুর সমীরণের সাথে সুরগুলোও নেচে গেয়ে উঠতো ঘুম ভাঙ্গা পাখীর মত।

দুপুর ও রাত্রিতো নারায়ণের ভোগারতি হত কাসর, করতাল, ঝাঁঝর আর হারমনি বাজিয়ে। সন্ধ্যারতিও হত একই রূপে। কিন্তু দুর্গা মায়ের পূজা ও ভোগারতির সময় ঢাক ঢোলের বাড়িতে বাতাস প্রকম্পিত হত। বাজনা যত দ্রুত ও সুউচ্চ হয়, সাথে উলুধ্বনিও হয় উচ্চস্বরে।

পূজা শুরুর আগে প্রতি গ্রামের লোকদের নিমন্ত্রণ করতে হত গলায় গামছা ঝুলিয়ে। নিমন্ত্রণে ত্রুটি হলে আর কথা নেই। কানাঘুষা, দল পাকানো শুরু হয়ে যেতো। তার মধ্যে কেউ পাঁচরবাদ বা পঞ্চায়েত বিবর্জিত হতেন, তাকে আর নিমন্ত্রণ আমন্ত্রণে ডাকা হত না। তবে মুন্সিবাড়ির বেলা সে নিয়ম শিথিল ছিলো। কারণ সবাই শহর থেকে বছরে একবার গ্রামে গিয়ে পূজার আয়োজন করতেন, সেখানে কেউ কাউকে বাদ দিয়ে চলতে চাইত না। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিনই লোক সমাগম হত। দুপুর বেলা সবাই মিলে ধুনি ঘরে মাটিতে বসে কলা বা পদ্ম পাতায় প্রসাদ খেত। সবার খাওয়া শেষ হলে আমাদের ডাক পড়ত। পূজায় আমাদের কমন কাপড় ছিলো। মার্কিন কাপড়ের লম্বা পায়জামা আর বগল কাটা বা ছিকা গেঞ্জি। ধীরে ধীরে পায়জামার বদলে পিছনে ‘Lee’ লিখা গ্রেবার্ডিনের পেন্ট পরা শুরু হলো।

দশমীর সকালে কলাবউ নিয়ে গ্রামের পুরুষেরা বের হতেন গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে মুষ্টিভিক্ষার জন্য। সবাই কলা বউকে ধূপধুনা দিয়ে পূজা দিতেন, ধান, চাল, সবজি, ফলমূল, টাকা পয়সা দিতেন যার যেমন সামর্থ্য। রাতে হত প্রতিমা বিসর্জন। প্রতিমা বিসর্জনের আগে কীর্তন হত। সারা গ্রামের কীর্তনিয়া খোল করতাল, ঝাঁঝর নিয়ে কীর্তন গাইতেন, আর সবার গানের মাঝে মিশে রইত কান্নার সুর আর অঝরে অশ্রুপাত। কীর্তন শেষে নারিকেলে তেল মাখিয়ে পিচ্ছিল করে লুট দেয়া হত। পূজার ঘটের উপর থাকা নারিকেলটা যে লুটে নিতে পারতো সে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করত।

বাড়ির সামনের তালগাছওয়ালা বড় পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন করা হত। প্রতিমার বড় কাঠাম থেকে এক এক দেবদেবী ও তাদের বাহনকে পৃথক পৃথক করে নেয়া হত। আমাদের ছোটদের হাতে দেয়া হত পেঁচা, ইঁদুর, হাঁস, ময়ূর, তীর-ধনুক, বীণা, ঘট ইত্যাদি। আমরা তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতাম। পুকুরে স্নান করে এসে আবারও কীর্তন, শুরু হত “মারে ভাসাইয়া জলে, কেমনে ফিরিব ঘরে, সোনার গৌরী জলেতে ভাসাইয়া গো” এই গান দিয়ে। হরির লুটে তা শেষ হত। দেবী বিসর্জনের ব্যথা ভোলাতেন তাদের এই ঠাট্টামিতে।

দুর্গা পূজা শেষ হলে ক’দিন পর লক্ষ্মী পূজা। দাদুর বাড়িতে দুলু, সমর ও জ্যোতিষ নামে তিন ভাই থাকতেন, আমরা তাদের মামা বলেই সম্বোধন করতাম এবং তাদের আপন বলেই জানতাম। দুলু, সমর ও জ্যোতিষ মামা ম্যাজিক আর সার্কাস দেখাতেন। কালী প্রসাদ দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে সার্কাস দেখেছি, সে আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেই তিন ভাই মিলে শিব গৌরী আর হনুমান সেজে লক্ষ্মী পূজায় আমাদের ভয় দেখাতেন।

পূজার আয়োজন শেষে আমরা আশপাশের এলাকায় ঘুরে বেড়াতাম। নারায়ণের নাইওর শেষে ফিরলে আমরাও যেয়ে মন্দির ঘুরে আসতাম। ঠাকুরবাণীর থালায় যেতাম। রাজেন্দ্র গোঁসাই তখন জীবিত। রাজেন্দ্র গোঁসাইয়ের একমাত্র ছবি যেটি এখন ভক্তদের মন্দিরে, আসনে, পঞ্জিকায় ব্যবহৃত হয়, সেটা আমার আপন মাসতুতো ভাই প্রয়াত ব্যাংক কর্মকর্তা সন্জয় কুমার রায় দাদার তোলা।

পূজার আয়োজন শেষে আবার নিজ বাড়িতে ফেরা। আবার স্কুল, আবার নিয়মে ঘেরা স্বাভাবিক জীবন। স্মৃতির তর্পণে সেদিন আজো সুখময়।

ধ্রুব গৌতম: সংস্কৃতিকর্মী।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত