ডেস্ক রিপোর্ট

১৩ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ১৮:১০

শিগগীরই পূর্ণাঙ্গ রায়: মার্চে কামারুজ্জামানের ফাঁসি

আসছে সপ্তাহে ফাঁসির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে ১৫ দিনের রিভিউয়ের সময় পাবেন রাজাকার কামারুজ্জামান। রিভিউ নিষ্পত্তি হবে খুব কম সময়ের মধ্যে, এরপর ফাঁসির আদেশ কারাগারে পৌঁছালে জেল কোডের দেওয়া ২১-২৮দিনের সময় পাবেন না যুদ্ধাপরাধিরা। ফলে মার্চেই কার্যকর হতে পারে ফাঁসি

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আসছে সপ্তাহেই প্রকাশ হতে পারে একাত্তরের মানবতাবিরোধী কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির পূর্নাঙ্গ রায়। এ সপ্তাহে রায় প্রকাশ হলে আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই।

দীর্ঘ তিন মাসের বেশি সময় পর কামারুজ্জামানের আপীল শুনানি গ্রহণকারী বেঞ্চের চার বিচারপতিই রায় লেখা শেষ করেছেন। সুপ্রীমকোর্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গত বছরের ৩ নভেম্বর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপীল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কামারুজ্জামানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি হলেন বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার সময় আদালত বলে, সর্বসম্মতিক্রমে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। অর্থাৎ চার বিচারপতির মধ্যে তিনজনই কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহালের পক্ষে রায় দেন এবং একজন অপরাধ প্রমাণের বিষয়ে একমত হলেও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন। তিনি কামারুজ্জামানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

সুপ্রীমকোর্ট সূত্র জানায়, চার বিচারপতির লেখা শেষ হয়েছে। রায়ের মধ্যে কোন ভুল-ত্রুটি আছে কি না, এখন তা দেখা হচ্ছে। ভুল-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের পর বিচারপতিরা রায়ে স্বাক্ষর করলেই অনুলিপি প্রকাশ করা হবে। তবে এতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলেও সূত্রটি জানিয়েছেন।

সূত্রমতে, মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রায় লিখেছেন ১৬৮ পৃষ্ঠা, এছাড়া বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ৩০ পৃষ্ঠা ও বিচারপতি এইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ৯৮ পৃষ্ঠা রায় লিখেছেন। এছাড়া বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিয়া রায় লিখেছেন ২৬৮ পৃষ্ঠা।

রায় ঘোষণার পর এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কামারুজ্জামানের ফাঁসি দ্রুতই কার্যকর হয়ে যাবে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা যাবে কি যাবে না সে বিষয়টি নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

এর আগে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায়ের পরেই এই রিভিউ আবেদন নিয়ে বিতর্কের শুরু হয়। ওই সময় সুপ্রীমকোর্ট কাদের মোল্লার রিভিউ সংক্রান্ত দুটি আবেদন খারিজ করে নিষ্পত্তি করে দেয়। তবে রিভিউ করা যাবে কি যাবে না সে বিষয়ে কোন মত দেয়নি। আপীল বিভাগ ওই সময় এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আদেশ দেয়।

২৫ নভেম্বর, ২০১৪ এ বিষয়ে সুপ্রীমকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর দেখা যায়, যুদ্ধাপরাধের আপীলের রায় রিভিউ করার আবেদন করা যাবে। তবে সাধারণ নিয়মে এক মাসের মধ্যে রিভিউর বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে সময় পাবে ১৫ দিন। সংবিধান অনুযায়ী রিভিউর সুযোগ না থাকার বিষয়ে আপীল বিভাগ তাদের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেন, সুপ্রীমকোর্ট তাদের অন্তনিহিত ক্ষমতা বলে এই সুযোগ দিয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউর সুযোগ দিলেও ওই রায়ে কারাবিধিতে থাকা ৭ থেকে ২১ দিনের বিধান প্রযোজ্য হবে না বলেই মত দেন। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই রায় দেন। এই বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন ট্রইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামান আপীল করেন। আপীল বিভাগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রায়টি সিএভি (রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ) রেখেছিল সুপ্রীমকোর্ট। এরপর গত ৩ নভেম্বর আপীল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে ট্রইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখে। মাত্র কয়েক মিনিটে দেয়া আপীল বিভাগের এই সংক্ষিপ্ত রায়ে আসামি কামারুজ্জামানের আপীল আংশিক মঞ্জুর করা হয়। সর্বসম্মতিক্রমে বেঞ্চের চার বিচারপতিই কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করলেও এক বিচারপতি তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ভিন্ন সাজা দেন। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে।

তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা এক নম্বর অভিযোগ একাত্তরে বদিউজ্জামানকে হত্যার দায়ে ট্রইব্যুনাল যাবজ্জীবন দণ্ড দিলেও আপীল বিভাগ খালাস দিয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে অমানবিক নির্যাতনের দায়ে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ১০ বছরের সাজা বহাল রয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে সোহাগপুর গ্রামে (বর্তমানে বিধবাপল্লীতে) গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের দায়ে ট্রইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। চতুর্থ অভিযোগে গোলাম মোস্তফাকে হত্যার দায়ে ট্রইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছে। সপ্তম অভিযোগে দারা ও টেপা মিয়াকে অপহরণ এবং পরে দারাকে হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আপীল বিভাগও তার রায়ে বহাল রেখেছে।

এখন এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়া গেলে এ রায়ের রিভিউ আবেদন করতে পারবে আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়ই। তবে পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে এই রিভিউ আবেদন করতে হবে। এর পর রিভিউ নিষ্পত্তি হলেই রায়ের অনুলিপি পাঠানো হবে ট্রাইব্যুনালে। এরপর ট্রাইব্যুনাল ওই রায়ের ওপর ভিত্তি করেই কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবে। এর আগে যেমনটি করা হয়েছিল জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে।

২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপীল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। প্রায় আড়াই মাসেরও বেশি সময় পর ৫ ডিসেম্বর আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ে কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়ার পক্ষে একমত ছিলেন না বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। রায়ের কপি প্রকাশের পর ৮ ডিসেম্বর সেটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল সেদিনই কাদের মোল্লার মৃত্যুপরোয়ানা জারি করে আদেশটি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। রায়ের কপি হাতে পেয়েই তার ফাঁসি কার্যকর করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এক্ষেত্রে তখন জেল কোড অনুযায়ী রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ২১ দিনের আগে নয় ও ২৮ দিনের পরে নয় যে বিধান রয়েছে তা অনুসরণ না করেই ফাঁসি কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের জন্য জেল কোডে প্রদত্ত সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করতে আসামিপক্ষের উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে চেম্বার জজ ১০ ডিসেম্বরে ফাঁসির আদেশ স্থগিত করেছিলেন। কাদের মোল্লার পক্ষে রিভিউ সংক্রান্ত দুটি আবেদন দায়ের করা হয়েছিল আপীল বিভাগে। এর একটি ছিল রিভিউ গ্রহণযোগ্য হবে কি হবে না এবং অন্যটি ছিল তার মূল রিভিউ আবেদন। এই দুই আবেদনেরই শুনানি করে ১২ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি কেবল ঘোষণা দেন যে, বোথ দ্য ক্রিমিনাল রিভিউ পিটিশনস আর ডিসমিসড। রিভিউ আবেদন খারিজের দিন রাতেই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কিন্তু রিভিউ আবেদন কী কারণে খারিজ হয়েছে তা স্পষ্ট করেনি আপীল বিভাগ। পরে গত বছরের ২৫ নভেম্বর এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা স্পষ্ট হয়।

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত