রবিবার, , ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

হেমাঙ্গ বিশ্বাস: গণসঙ্গীতের প্রাণপুরুষ

 প্রকাশিত: ২০১৭-১১-২২ ১৯:১১:২০

অপূর্ব শর্মা:

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সহিংস ও অহিংস পন্থার পাশাপাশি আরেকটি আন্দোলন ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই আন্দোলনটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বিশেষ করে বাংলা ও আসামে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠে। সংস্কৃতসেবী রাজনৈতিককর্মীরা সময়ের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে এই আন্দোলনকে বেগবান করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপিত থাকায় বিপ্ল¬বীরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে বেছে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যার্থেও কাজ করেছেন তারা। আর সেই প্রেক্ষাপটে রচিত হয় একের পর এক জাগরণের গান। সেই গান ছড়িয়ে পড়ে হাটে মাঠে ঘাটে। সাধারণ মানুষের এই সঙ্গীত, গণসঙ্গীত হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

আর এই গণগাণের স্রষ্টাদের অন্যতম একজন ছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সিলেট অঞ্চলে সে সময়কার সংস্কৃতিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল মুখ্য। বিপ্লবী যুগের উত্তাল সময়ে তাঁর লেখা গান গানমানুষের চেতনাকে তরঙ্গায়িত করতে সক্ষম হয়েছিলো। নিজ মেধা ও সৃষ্টির কারণেই তিনি গণসঙ্গিতের প্রাণ পুরুষে পরিনত হন।


দুই
হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানার মিরাশী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরকুমার বিশ্বাস, মাতা সরোজিনি বিশ্বাস। তাঁর পিতা ছিলেন ক্ষুদে জমিদার। তাদের পরিবার ছিল রক্ষণশীল। পুরোহিততন্ত্র ও জাতবিচারের প্রাবল্য ছিলো তাদের পরিবারের মর্মমূলে।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শিক্ষা-জীবনের সূচনা ১৯১৮ সালে। হবিগঞ্জের মিডল ইংলিশ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। হবিগঞ্জ সরকারী স্কুল থেকে ১৯৩০ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। গণিত বিষয়ে দুটি লেটারসহ সুখ্যাতি লাভ করেন তিনি। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহনের জন্য সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজে আইএসসি প্রথম বর্ষে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন। এক বছরের মাথায় ইতিঘটে তাঁর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে আইনÑঅমান্য আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার শপথ গ্রহন করেন।


এ প্রসঙ্গে শ্রীহট্টের শ্রেষ্ঠ সন্তান গ্রন্থে বিজন বিহারী পুরকায়স্থ উল্লেখ করেছেন, ‘‘শৈশবে তখনকার স্বদেশী ভাবনার শরিক বলে পিতৃদেবের কোপানলে ছিলেন। তাই হবিগঞ্জের হাইস্কুলে মাত্র সপ্তমমানে পড়ার সময়ই যখন স্বদেশী স্বেচ্ছাসেবক আর জনসভার মিছিলের গায়ক, তখন আর রক্ষে আছে, ভিন্নমতাবলম্বী বাবা তাঁর ছেলেকে কঠের শাসক গুরুজী ‘ওম বাবার’ আশ্রম-বিদ্যালয়ে পাঠালেন সুদূর ডিব্রুগড়ে ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্তের কাছে। ওখানে আশ্রমে যা দেখলেন তাতে সারাজীবনের মতো ধর্মে অবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদীতে পরিণত হলেন। আর ঐ জীবনেই অহমিয়া জনজীবনের, সাধারণ মানুষের এবং অহমের জনসংস্কৃতি, লোকগীতি ও সংস্কৃতির যে পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন তাই যথার্থ হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মদিল, বাংলা ও অসম-এর মিলিত সংস্কৃতির এক যথার্থ প্রতিভু হিসাবে। অসমে সবচেয়ে জনবন্দিত বাঙালী হেমাঙ্গ বিশ্বাসই। ঐ সময়ের শ্রেষ্ঠ সমস্ত সংস্কৃতি প্রাণ বিদ্বান ও স্মরণীয় ব্যক্তিরা সকলেই তাঁর সঙ্গে সুগভীর প্রণয় ও মৈত্রীর সূত্রে আবব্ধ হলেন।’’

পরিবারের প্রবল আপত্তি ও বাঁধা হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে আন্দোলন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বিট্রিশদের নানা অমানবিক কর্মকান্ড এবং শোষন নিপীড়ন তাঁর দ্রোহি চেতনার স্ফুরণ ঘটনায়। বিট্রিশ বিতারণের স্বপ্নে তিনি এতটাই সংকল্পবদ্ধ হন যে শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে কুন্ঠাবোধ করেন নি। এরপর দলের কাজে হাটে-মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

উপনিবেশিক শাসকদের হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য গৃহত্যাগের পাশাপাশি উদ্দেশ্যবিহীন পথে পা বাড়ালেও তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি। যদিও তার ইচ্ছে ছিলো অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার, কিন্তু সে পথে ততটা অগ্রসর না হয়ে বেছে নেন সঙ্গীত সাধনার মাধ্যমে গনজাগরণ সৃষ্টির পথ। পারিবারিক উত্তরাধিকার তাকে সঙ্গীতমুখো করেনি, সুরেলা পথে অগ্রসর হতে তাঁর মায়ের ভূমিকা অনেকখানি।  
 
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মামাবাড়িতে সঙ্গীতশিক্ষা ও চর্চার পরিবেশ ছিল। দাদু রাজমোহন চৌধুরী ছিলেন সেই সময়কার একজন বিখ্যাত তবলাবাদক, সেইসূত্রে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর ভাই আফতাব উদ্দিন খাঁ প্রায়শই আসতেন তাঁদের বাড়িতে। সম্পর্কে দাদু জয়নাথ নন্দী ছিলেন একজন বিখ্যাত কবিয়াল, তাদের বাড়িতে প্রায়ই বসতো কবিগানের আসর। পিতার যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে সরোজিনী সঙ্গিতে তালিম নেন। তিনি ছিলেন সুরেলা কন্ঠের অধিকারী। সেই প্রবাহ হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে গায়ক থেকে গনসঙ্গিতের স্রষ্টাদের শীর্ষ তালিকার শীর্ষে অধিষ্ঠিত করে।  
 
তিন
হেমাঙ্গ বিশ্বাস সম্বন্ধে প্রয়ত নারী নেত্রী হেনা দাসের পর্যালোচনা ছিল অত্যন্ত সত্য নিষ্ঠ। তার চার পুরুষ কাহিনী গ্রন্থ থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি দেয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না । তিনি ঐ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “সারা ভারতে গড়ে উঠল গণনাট্য সংঘ ও তার শাখা-প্রশাখা। স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মেহনতী মানুষের লড়াই-সংগ্রামের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়াল গণনাট্য আন্দোলন। সিলেট গণনাট্য-আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন সিলেটেরই সন্তান উপমহাদেশখ্যাত কবি, সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী কমিউনিস্ট নেতা হিমাঙ্গ বিশ্বাস। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে ও সুরে অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন তিনি। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, শোষিত-বঞ্চিত শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতী মানুষের দুঃখযন্ত্রণা, অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ ও মরণপণ সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদের বীভৎস রূপ, জমিদার-মহাজন-কালোবাজারি মজুতদারদের শোষণ ও জুলুমের নগ্ন চেহারা প্রভৃতি বিষয় ছিল হেমাঙ্গদার গানের বৈশিষ্ট্য।...হেমাঙ্গদার নেতৃত্বে ও সব শিল্পী ও পরিচালকদের যৌথ সাধনায় যে অনন্য শিক্ষাটি আমরা লাভ করেছিলাম তা হচ্ছে, নিখুঁত নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা। প্রতিদিনের মহড়ায় ও দর্শনীর বিনিময়ে দর্শকদের সামনে অনুষ্ঠিত ‘শো’ গুলোতে প্রতিটি শিল্পী ও কর্মী ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে যে অসাধারণ নিষ্ঠা, দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতার পরিচয় দিতেন তাতে দর্শকরা মুগ্ধ ও অভিভূত না হয়ে পারতেন না। এভাবে গণনাট্য সংঘ অর্জন করেছিল দর্শকশ্রোতাদের ভূয়সী প্রশংসা। একটি অপেশাদার সাংস্কৃতিকগোষ্ঠী সব দিক থেকে এমন উচ্চমানের পরিচয় দিতে পারে তা ছিল জনগণের প্রত্যাশা ও ধারণার বাইরে। আমরা আমাদের স্কোয়াড নিয়ে সিলেট, শিলং, গৌহাটি, লামডিংসহ বিভিন্ন শহর, রেলজংশন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে গিয়েছি এবং আমাদের নির্ধারিত অনুষ্ঠানমালা টিকেটের বিনিময়ে পরিবেশন করেছি। মুগ্ধ দর্শকদের অনুরোধে কোন কোন জায়গায় দু’দিন তিনদিনও অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে হয়েছে। যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছি সেখানেই লক্ষ্য করেছি যে এই নতুন ধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন জনগণের মাঝে সৃষ্টি করেছে অভূতপূর্ব এক উত্তাল জাগরণ।”

“গণনাট্য, আন্দোলন কেবলমাত্র একটি স্কোয়াডের সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠানমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সকল ফ্রন্ট, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবক, মহিলা, শিশুকিশোরসহ সর্বশ্রেণীর গণমানুষের মাঝে। প্রতিটি গণসংগঠনে প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল গণসংস্কৃতি, বিশেষভাবে গণসঙ্গীত। প্রত্যেকটি গণসংগঠনের কর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য গানের স্কোয়াড। কমিউনিস্টি পার্টিরও ছিল নিজস্ব স্কোয়াড। হাটেবাজারে, গ্রামেগঞ্জে, শহরে-বন্দরে ঘরে ঘরে হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছিল বহু জনপ্রিয় গণসঙ্গীত। কতকগুলো গানের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। ভয়াবহ ম্যালরিয়া মহামারীতে যখন বানিয়াচঙ্গের হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছিল, পুরো গ্রাম প্রায় শ্মশানে পরিণত হয়েছিল তখন হেমাঙ্গদা একটি অসাধারণ গান রচনা করেছিলেন- ‘বাইন্যাচঙ্গের প্রাণবিদারী, ম্যালেরিয়া মহামারী, হাজার হাজার নরনারী মরছে অসহায়...’। আমার মনে আছে, এই গান গেয়ে আমরা দল বেঁধে রিলিফের চাঁদা তুলতে পাড়া মহল্লা ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের গানে অভিভূত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে পাড়ার মেয়ে পুুরুষ সবাই চোখের জল ফেলতে ফেলতে আমাদের চাঁদা দিতেন। হেমাঙ্গদার রচিত আর- একটি অনন্যসাধারণ গান সারা বাংলায় ও সুরমা উপত্যকার গ্রামেগঞ্জে সংগ্রামী কৃষকদের লড়াই-সংগ্রামের অনুপ্রেরণার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গানটি হল- ‘হেই সামালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শাণ হো, জান কবুল আর মান কবুল, আর দেবো না, আর দেবো না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো।”

জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনের ঐতিহাসিক তেভাগা, টংক আন্দোলন চলাকালে হাজার হাজার কৃষকের সমাবেশ ও মিছিলে অসংখ্য কণ্ঠে গাওয়া এই গান কৃষকদের মনোবল, দৃঢ়তা, সাহস ও উদ্দীপনাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। গানটি ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে ঘরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, আবালবৃদ্ধবনিতার কণ্ঠে কণ্ঠে।”

চার
সাংস্কৃতিক আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। দিনে দিনে তা মানুষের সুপ্ত প্রতিবাদকে করছে জাগরিত, ঠিত তখনই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। এই রোগটি তৎকালীন সময়ে ছিলো দুরারোগ্য ব্যাধি। কিন্তু এই ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করেই তিনি চালিয়ে গেছেন গণসঙ্গীতের সংগ্রাম। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে লড়াই ও বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাবার সঙ্গীত একের পর এক রচনা করেছেন। তবে দুর্দিনে বন্ধুর মতোই পাশে দাড়িয়েছিল তাঁর প্রিয় পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টি মায়ের মতোই আগলে রেখেছিল তাঁকে।

‘গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস’ স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে খালেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘তখনকার আমলে যক্ষ্মা রোগ দুরারোগ্য ব্যধি ছিল, তাই সবার মনেই এ ব্যাপারে দারুন ভীতি ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি তাকে সম্পূর্ণ আলাদা একখানা ঘরে থাকতে দিয়েছিল। সব রকমের দেখাশোনার ব্যবস্থা করেছিল। সেই আলাদা ঘরে তিনি একা থাকতেন এবং গান রচনা করতেন। আমরা যখন গানের মহড়া দিতাম, তখন ঐ ঘরেরই আর এক প্রান্তে বসে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রেখে মহড়া দিতাম।’

চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থেকেই তিনি একের পর জীবনবোধের গান লিখেছেন। তাঁর সঙ্গীতের ঢেউয়ে উদ্বেলিত হয়েছে কৃষক, শ্রমিক মজুর থেকে শুরু করে গৃহিণীরা। সাধারণের মনকে তিনি সুরের মুর্ছনায় করেছেন প্রতিবাদী। তাঁর লেখা ‘জাগো, দুঃখের রাতের ঘোর তমসা ভেদি, স্বাধীনতার দিন এল যে ফিরে’- গানটি প্রভাত ফেরিতেও গাওয়া হত। কখনও সুস্থ, আবার কখনও অসুস্থ। কিন্তু তাতে দমে জাননি তিনি।  

‘‘১৯৪৪ সালে যখন কলকাতায় মহম্মদ আলী পার্কে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের নামকরণ হয় এবং যে সম্মেলন হয়। ঠিক তার আগে সিলেটের করিমগঞ্জ অঞ্চলের পাথারকান্দি নামক গ্রামে একটি কিষাণ সম্মেলন হয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শরীর আবার খারাপ হয়ে পড়া সত্ত্বেও তাঁকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হল অথবা বলা যেতে পারে তিনি স্বেচ্ছায়ই সেখানে গেলেন। তার থাকার বিশেষ ব্যবস্থাা করা হল। সেখানকার সমস্যা নিয়ে, তার সঙ্গে বাংলার দুর্ভিক্ষকে যুক্ত করে সেই অঞ্চলের প্রচলিত জারী গানের সুরে রাতারাতি একটি দীর্ঘ গানও রচনা করলেন। গানের কথা ছিল এই রকম : ‘ও আরে কৃষক মরিলায়/ ডুবিল ডুবিল তরী অকূল দরিয়ায়/.../ পিতা ছাড়ে পুত্র আর পতি ছাড়ে সতী/ মা বেঁচে দেয় কোলের ছেলে হায়রে কি দুর্গতি/ মানুষ যত পশুর মত পথে খাটে মরে/ দিন দুপুরে টেনে নেয় শিয়াল ও কুকুরে/ হায় কৃষক মরিলায়...’’।

এই গানটি সুষ্ঠুভাবে পরিবেশনা ও এর ফলশ্রুতিতে জনমনে যে প্রভাব পড়ে তা দেখে দারুণভাবে উৎসাহিত হয়ে উঠেন তিনি। অসুস্থ শরীরে গেলেও ফিরে আসেন সুস্থ হয়ে।

পাঁচ
আজন্ম সংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাস মানবতার প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন। ছিলেন শান্তির পক্ষে। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গান। সমসাময়িক ঘটনাই বর্ণিত হয়েছে তাঁর রচনায়। সুর ও কথা তাঁর গানকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। তাই আজও আমরা তার গানে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাই।

তিনি শিল্পী ও কমিউনিষ্ট হিসেব কখনও অবসর গ্রহণ করেন নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার জীবনের পথ ছিলো ধাবমান। গোঁড়ামি পছন্দ করতেন না, বয়স বৃদ্ধি পেলেও তারুণ্যে সতেজ ছিলেন সব সময়। তার চারিত্রিক বৈশিষ্টে অসম্ভব ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘‘রোগ, চিকিৎসা, বিলম্বিত পারিবারিক জীবন, পুত্র কন্যা ও বাংলা এবং ভারতের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির প্রতিনিধিদের সকল আত্মীয়তা সত্ত্বেও কোথায় যেন তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, একা।’' কিন্তু ভেঙ্গে যাননি, মচকানওনি। নিজের আদর্শে সবসময়ই ছিলেন অবিচল। লক্ষ্য ছিলো নির্ধারিত। শত প্রতিকূলতাও সে পথে ছন্দপতন ঘটাতে পারেনি।

প্রতিকূল পরিস্থিতি দেশ ছাড়লেও জন্মভূমির প্রতি তাঁর অগাদ ভালবাসা ছিলো। সেই ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায় তার লেখনিতে। মাটির টানে সর্বশেষ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সফরে আসেন। ১৯৮১-তে গানের দল ‘মাস সিঙ্গার্স’কে নিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলাদেশ ভ্রমন করেন। এই সফর তাঁর নিজের মতে তাঁর জীবনে একটা গুরত্বপূর্ণ ঘটনা।’ জীবদ্দশায় তিনি প্রায়ই বলতেন- ‘আমি আবার জন্ম নিলাম নিজের দেশে গিয়ে’।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সংগ্রামী জীবন
১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। এ সময় কংগ্রেস-এর ভলাণ্টিয়ার হিসাবে গান গাইতেন। রোহিণী রায়ের গ্র“পে মুখ্য গায়ক ছিলেন তিনি। এ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিটিং করার অপরাধে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। লবণের প্যাকেট হাতে নিয়ে পায়ে হেঁটে ত্রিপুরা পর্যন্ত প্রচার অভিযানেও অংশ নেন তিনি। এই অপরাধে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৩২ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। কারারুদ্ধ অবস্থায় কাটান ২ বছর ৬ মাস। নগাঁও ও গুয়াহাটি জেলে বন্দী জীবন অতিবাহিত করেন। নগাঁও জেলে কংগ্রেস নেতা বিমলা প্রসাদ চালিহার সঙ্গে পরিচয় হয়। চালিহার মুখে শোনেন অসমীয়া লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্য ও ব্যাপ্তির বিশালতা। তাঁর কণ্ঠেই প্রথম শোনেন অসমীয় বিহুগীত ও আইনাম। কারান্তরীন অবস্থায়ই তিনি যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। কংগ্রেস নেতা বিধানচন্দ্র রায়ের পরামর্শ মতো চিকিৎসা চলে। এসময় বণ্ড সই করে মুক্তির সুযোগ পেলেও তাতে রাজী হননি। তবে শেষ পর্যন্ত জেলের মেয়াদ শেষ হবার আগেই বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৩৫ সালে যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় তিন বছরকাল চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে উঠেন। সেখান থেকে বিশ্রামের জন্য শিলঙ চলে যান।

ত্রিশের দশকে গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনের একজন কর্মী হলেও একসময় এই আন্দোলনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। দেহলী ও হিজলী জেলের নব্য মার্কসবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হন। ‘হিন্দুস্থান টাইম্স’ সংবাদপত্রে এই সময় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সোভিয়েত সংবিধান (স্তালিনকৃত) পড়ে বলশোভিক্ আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে শয্যাগত অবস্থায় বার্নার্ড শ’, এইচ,জি,ওয়েলস্ প্রমুখ ফেবিয়ান সমাজবাদীদের রচনা, গোর্কীর ‘মা’, মোবিস হিন্দোজের Humanity Uprooted এবং তাছাড়াও On Guard for the Soviet Union ইত্যাদি গ্রন্থ অধ্যয়ন করে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৩৭ সালে বলশেভিক পার্টির সদস্য হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে মুজফ্ফর আহমেদকে চিঠি লেখেন। সিলেটের তরুণ সংঘের কমিউনিস্ট সদস্যদের কাছ থেকে লাভ করেন মার্কসবাদের শিক্ষা।

১৯৩৮ সালে খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও জমিদারতন্ত্রবিরোধী কৃষক আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। শিলঙ শহরে কৃষকদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। বিশ্বাসের গান ‘আগে আগে চল মজুর কিষাণ’ তখন কৃষকদের মুখে মুখে ফিরতো। এ সময় সিলেট জেলার কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির (C.S.P) নেতা ফণি দত্ত পার্টির নির্দেশক্রমে শিলঙ যান এবং প্রায় দু মাস শিলঙে থাকাকালীন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে কিছুদিন অবস্থান করেন। এর দিন কয়েক পর সিলেটের তরুণ সংঘের নেতা শিবেন দাস শিলঙ যান এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাঁর মাধ্যমেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস সিলেট কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদের জন্য আবেদন জানান শিলঙ থেকে। ঐ বছরের শেষ নাগাদ সুস্থ হয়ে হবিগঞ্জে ফিরে যান।

১৯৩৯ সালের ৭ নভেম্বর তারিখে কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু সিলেট থেকে হবিগঞ্জের ভ্রমণসূচী নিয়ে উপস্থিত হন। তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা জানানো হয়। সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।

শ্রমিক আন্দোলনের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কাছাড় জেলার অরুণাবন্দ চা বাগানের শ্রমিকদের সংগ্রামে অংশগ্রহণ, ডিগবয় তেল কোম্পানির কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের ওপর গুলিচালনার প্রতিবাদে সিলেট টাউন হলে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৯ সালের ২৯ এপ্রিল। এই সভায় গুলিচালনার তীব্র নিন্দাসহ ভাটিপাড়া কৃষকদের উপর জারি করা section 145 G.P.C. তুলে নেবার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নেতৃত্বে।

১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট মতাদর্শের জন্য পিতার সঙ্গে আদর্শগত বিরোধ ও বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। সেখান থেকে শিলঙ চলে যান। এরপর পরই সিলেট কমিউনিস্ট পার্টি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ার কাজে তাকে প্রেরণ করে। এই সময়টাতেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস ঘনিষ্ঠভাবে মেশেন দশগ্রাম, পাঁচগ্রাম প্রভৃতি গ্রামের কৃষকদের সাথে। ১৯৪২ সালে রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গান ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান, কিষাণ ভাইরে।’ ১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই তারিখে সিলেট টাউনের গোবিন্দচরণ পার্কে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিতে দাবিতে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড সুরমাভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড গঠন করেন।

প্রগতি লেখক সংঘ ও গণনাট্য সংঘ-এর কাজকর্মের মধ্য দিয়ে কলকাতার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ স্থাপিত হয় তাঁর। ১৯৩৩ সালের ২০ জুন তারিখে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি।  ১৯৪৫ সালে ‘সুরবাভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’ নিয়ে এক মাস দশ দিনব্যাপী সারা আসাম পরিভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। তেজপুর, নওগাঁ, জোরহাট, ডিব্র“গড় ইত্যাদি শহরে মোট ২৭টি অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয় তার নেতৃত্বে। অনুষ্ঠানসূচিতে ছিল কুশকুমারের ফাঁসি, ক্যাবিনেট মিশনের কার্টুন নৃত্য, দুর্ভিক্ষ নৃত্য, নৌবিদ্রোহের উপর গানের অনুষ্ঠান ও ছায়া নাটক।

১৯৪৬ সালের ১৫ জুন থেকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রিক্সাচালক শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। এই সালের এপ্রিল মাসে শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় মহামিলনের সাংস্কৃতিক উৎসব, এই উৎসবে আসামের প্রায় সব জনগোষ্ঠীর লোকসংস্কৃতি পরিবেশিত হয়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের আসাম প্রাদেশিক কমিটি। জীবনশিল্পী জ্যোতিপ্রসাদকে সভাপতি ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত করা হয় উৎসবে।

১৯৪৮ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আত্মগোপন করেন। এসময় অসুস্থ জ্যোতিপ্রসাদের সঙ্গে শিলঙে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। মাউণ্টব্যাটেন-প্রস্তাবিত ‘স্বাধীনতা’য় জ্যোতি প্রসাদের অনাস্থা প্রকাশ, জনগণবিরোধী কংগ্রেস দলের চরিত্র সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে জ্যোতিপ্রসাদ মন্তব্য করেন- There is something wrong in the state of Denmark। এই উক্তিটি থেকেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনা করেন (সেদিন রাত্রে) তাঁর বিখ্যাত আলোড়নকারী ব্যঙ্গাত্মক গান ‘মাউণ্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য’।

১৯৫২ সালে জুন-জুলাই মাসে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হয় ২য় প্রাদেশিক সম্মেলন। সম্মেলনে পুনরায় সম্পাদক নির্বাচিত হন। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পরামর্শ মতো ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারির দিনটি সারা আসামব্যাপী ‘রূপকোঁয়র দিবস’ হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৫ সালে গুয়াহাটিতে গণনাট্য সংঘের ৩য় প্রাদেশিক সম্মেলনে পুনরায় সম্পাদক নির্বাচিত হন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।

১৯৫৭ আবার যক্ষ্মারোগের তীব্রতা বৃদ্ধি, ফলে শরীর ভেঙে পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে চিকিৎসার জন্য এপ্রিল মাসে চীন যাত্রা। প্রায় আড়াই বৎসরকালে সেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৫৯ সালে চীন থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। একই সালে শ্রীমতী রাণু দত্তের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৬০ সালে আসামে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ হয়। এ সালের ২৭ আগস্ট গণনাট্য সংঘের শান্তি সম্প্রীতির অভিযানে ভূপেন হাজারিকা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের যৌথ রচনা ও দ্বৈত কণ্ঠের বিখ্যাত প্রেরণাময়ী গান ‘হারাধন রঙমন কথা’র পরিবেশ সমগ্র আসামে দাঙ্গা-বিধ্বস্ত নিরীহ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করে। ১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর তিনি কলকাতার একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।

সাহিত্য সংস্কৃতি
সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অবদান অতুলনীয়। ‘‘তিরিশ ও চল্লি¬শ দশকের একটা বড়ো সময়, গণনাট্য ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল জোয়ারের সময়টা, হেমাঙ্গ বিশ্বাস শ্রীহট্টের সুরমা উপত্যকা ও অসমে অতিবাহিত করেছেন। অসম গণনাট্য সংঘ তাঁর হাতে তৈরি এবং তার জীবনে অসমীয়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি একটা খুব বড় জায়গা নিয়ে আছে। অসমে কবি, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে পশ্চিম বঙ্গের থেকে তিনি কিছুটা বেশিই পরিচিত।’’

১৯৬১ সালে বাংলা কাব্যগ্রন্থ ‘সীমান্ত প্রহরী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে অসমীয়া ভাষায় ‘আকৌ চীন চাই আহিলোর’ (অসমিয়া) প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। একই সালে প্রকাশিত হয় ‘শঙ্খচিলের গান’ ও ‘আবার চীন দেখে এলাম’-গ্রন্থ। ১৯৭৭ সালের মে মাসে ‘আকৌ চীন চাই আহিলো’র দ্বিতীয় খণ্ড ও ‘চীন থেকে ফিরে’, ১৯৭৮ সালে ‘লোকসঙ্গীত সমীক্ষা : বাংলা ও আসামা’ প্রকাশ। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান’। ১৯৮৩ সালে অসমীয়া ভাষায় ‘জীবনশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৫ সালে অসমীয়া কাব্যগ্রন্থ ‘কুল খুরার চোতাল’ প্রকাশ। এছাড়াও ‘কুলো কুড়োর চতাল’ (অসমীয়া), সঙ্গীত ও সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে ‘বিষাণ’, ‘গণগীতি’, ‘নতুন দিনের গান’, ‘গানের বাহিরানা’; আত্মজীবনী ‘উজান গাঙ বাইয়া’ (১৯৯০) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।  নিপীড়িত মানবতার আর্তনাদ তাঁর কবিতা ও গানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘সঞ্জয় সেন’ ছদ্ম নামে তিনি অনেক গান লিখেছেন।

১৯৬১ সাল থেকে ৬৮ সাল পর্যন্ত সময়ে অসংখ্য নাটক, চলচ্চিত্র ও যাত্রায় সংগীত পরিচালনা করেছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তন্মধ্যে ‘কল্লে¬াল’, ‘তীর’, ‘তেলেঙ্গানা’, ‘লাল লণ্ঠন’, ‘লেনিন’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘বিদুন’, ‘রাইফেল’, ‘রাহুমুক্ত রাশিয়া’, ‘মানুষের অধিকারে’, ‘কাঙ্গাল হরিশ’, নাটক ও যাত্রায় ‘চাঁদমনসার নৃত্যনাট্য’ ও ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্র উল্লেখযোগ্য। লালন চলচ্চিত্রে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সুরে গান গেয়ে হেমন্ত মুখার্জী রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি গঠন করেন ‘মাস-সিঙ্গার্স’।

তথ্য সুত্র
১. সিলেটের দুইশত বছরের আন্দোলন, তাজুল মোহাম্মদ
২. সিলেটের সাহিত্য: শ্রষ্টা ও সৃষ্টি, নন্দলাল শর্মা
৩. উজান গাঙ বাইয়া, হেমাঙ্গ বিশ্বাস
৪. শ্রীহট্টের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা, বিজন বিহারী পুরকায়স্থ
৫. প্রতিক্ষন, ২ জানুয়ারি, ১৯৮৮

আপনার মন্তব্য