বৃহস্পতিবার, , ১৫ নভেম্বর ২০১৮ ইং

কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের স্মৃতি

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৬-২৩ ১৩:১১:৩৩

জহিরুল হক মজুমদার:

আমি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন মাঝে মাঝে কুমিল্লা শহরে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলাম বাড়ি থেকে। কুমিল্লা শহরে আমার যাওয়ার কারণ ছিল বই কেনা। সেই সময়ের ভাষায় “আউট বই”। পাঠ্য বইয়ের বাইরের যেকোনো বইকে এই নামেই ডাকতেন গাঁওগেরামের সাধারণ শিক্ষিত লোকেরা। বন্ধুদের মধ্যে আউট বইয়ের বিনিময় হত। ভাল ছাত্র মানেই তার অনেক আউট বই পড়া থাকতে হবে, এটাই ছিল তখনকার গ্রামের মানুষদের ধারণা।

আমাদের মধ্যে অনেকেরই পাঠ্যবইয়ের অতিরিক্ত বই কেনার পয়সা ছিলনা। আমি কুমিল্লা শহরের কেন্দ্রে কান্দিরপাড়-এ এসে সবচেয়ে পুরনো পত্রিকার দোকানটির সামনে হা করে দাঁড়িয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকা আর সেবা প্রকাশনীর বই দেখতাম। আর পকেটে হাত দিয়ে ভাবতাম কোনটা কিনি- অর্থাৎ টাকায় কোনটা কুলাবে। একদিন পৃথিবী কিনে ফেলার আনন্দ নিয়ে কিনে ফেললাম এক কপি “রহস্য পত্রিকা”।

মনে আছে এখনো সেখানে একটি লেখা ছিল “প্রতিভার আদি পুরুষ ইমহোটেপ”। পিরামিডের আদি স্থপতিদের একজন ছিলেন এই ইমহোটেপ।

একই সাথে ওই রহস্য পত্রিকার সুবাদেই আমার পরিচয় ঘটে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সাথে। রহস্য পত্রিকা কবিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল কিশোরদের সাথে। কবির যে কাব্যগ্রন্থটি এই কিশোর সাময়িকীটি আলোচনায় এনেছিল তা হচ্ছে “পার্থ তোমার তীব্র তীর”। তখন গাঁওগেরামের ছেলে হিশেবে ‘পার্থ’-কে বা কী কিছুই বুঝিনি। পরে জেনেছিলাম ‘পার্থ’ মহাভারতের ‘অর্জুন’ এর আরেক নাম।

আরও অনেক পরে যখন স্যার এর সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে পরিচয় হয়, তখন স্যারকে বলেছিলাম যে, আপনাকে আমি ক্লাস নাইন থেকেই চিনি। স্যার খুব অবাক হয়েছিলেন।আমাকে স্নেহে বেঁধে নিয়েছিলেন তখনই।

স্যারের সাথে যখনই শিক্ষক ক্লাবে দেখা হত তখনই তিনি আলাপ করতেন কাব্য, কবিতা আর ভাষা নিয়ে। মাঝে মাঝে শব্দ ভেঙে পান (pun) করতে পছন্দ করতেন। আমাদের আরবি কিংবা ফারসি নামকে বাংলায় অনুবাদ করে চমক লাগিয়ে দিতেন। সেই নামের বঙ্গানুবাদ এতই প্রাঞ্জল হত যে মনে হত এই নামটিই নিয়ে নি।

তাঁর নিজের বর্ণনায় শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যোগদানের দিনগুলো কী নিদারুণ কষ্টে কেটেছে তাঁর। স্বল্প আয়ের মধ্যেও বাইরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন। সেই সময় স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে ছোট বাচ্চাদের বাসায় একা রেখে যাওয়ার কষ্ট স্মরণ করতে গিয়ে চোখ ছল ছল করে উঠেছিল তাঁর। আবার কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছেন পাড়ার সেই ঠিকা বুয়াটিকে যিনি বাচ্চাদের সাথে থাকার দায়িত্ব নিয়ে স্যারকে হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ’ ছিল তাঁর প্রথম জীবনের দুঃখ-গাঁথার একাংশ।

কিন্তু পরবর্তীতে অনেক বছর সংসার যাপন করার পর যখন স্যার এর স্ত্রী রোগে ভুগে মারা গেলেন, তাও ছিল স্যার এর জন্য অনেক কষ্টের। ভাবীর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে শিউরে উঠেছিলেন আমাদের সামনে।

কাব্য চর্চার বাইরে কবিতার একজন সংগঠকও ছিলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ‘একবিংশ’ নামে একটি কবিতাপত্র সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘদিন।

শিক্ষক রাজনীতি থেকে দীর্ঘসময় দূরে থাকা কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন কর্মজীবনের শেষদিকে এসে আওয়ামী লীগ সমর্থক নীল দলের সাথে জড়িত হয়েছিলেন। দল থেকে ডিন পদে নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমরা সবাই আশান্বিত হয়েছিলাম যে একজন কবি এই প্রথমবারের মত কলা অনুষদের ডিন হতে যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের হতাশ করে দিয়ে কবির ওপর পরাজয়ের বিপর্যয় নেমে আসলো। কলা অনুষদের নীল দলের একাংশের ষড়যন্ত্রের ফলেই এটা হয়েছে বলে তিনি মনে করতেন। সেই অংশটি জামাতপন্থী শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেই চলে সবসময়।

ডিন নির্বাচনের সমসাময়িক সময়েই তিনি “মাস্টার দা’ সূর্যসেন হল” এর প্রভোস্ট এর দায়িত্ব পান।আমরা যারা স্যার এর আড্ডা ঘনিষ্ঠ, আমরা বলতাম যে স্যার, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কবি প্রভোস্ট। কথাটা আমরা অনুরাগীরা যত হাস্যরস নিয়েই বলি না কেন, এটাতো সত্য ছিল যে তিনিই আসলে প্রথম কবি প্রভোস্ট। সূর্যসেন হলের কোন সাবেক ছাত্র অনেক বছর পর তাঁকে স্মরণ করে চমকে উঠবে যে তিনি ছিলেন তাঁদের কবি প্রভোস্ট।

প্রভোস্টের দায়িত্ব তিনি সুচারুভাবেই পালন করার চেষ্টা করেছেন। তবে এই রাজনৈতিক দখলদারির যুগে হলের সব ব্যাপারে প্রভোস্ট এর যে পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবেনা তা যেন আমরা মেনেই নিয়েছি। সেই সীমাবদ্ধতা আর বেদনা মেনে নিয়েই তিনি যতদূর সম্ভব ভালভাবেই ছাত্রদের অভিভাবকত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের মতাদর্শের উপাচার্য নিয়োগ দান করেন। কিন্তু হল প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় জামাত-শিবির এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রভোস্ট এবং হাউজ টিউটর থেকে যায়।
খোন্দকার আশরাফ হোসেন যখন মাস্টারদা’ সূর্যসেন হলের প্রভোস্ট হন তখন এই হলের হাউসটিউটরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি চক্র তাঁর কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে থাকে। তিনি খুবই দক্ষতার সাথে এই সংকট মোকাবেলা করেন।

স্যার যখন ত্রিশালে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন তখন আমরা খুব খুশী হয়েছিলাম। এই রকম একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কবি উপাচার্যইতো কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে স্যার চলে গেলেন।

হঠাৎ করে খবর পেলাম স্যার মারা গেছেন। একজন বন্ধু ফোন করে বললেন, স্যার আর নেই। আড্ডার সঙ্গী ছিলাম বলে তাড়া দিয়ে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা হবে, যেন মিস না করি।

স্যার ল্যাব এইডে ভর্তি হয়েছিলেন কিছু শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে। ভর্তির পর শারীরিক জটিলতা আরও বাড়ে এবং সেখান থেকে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। দিনটি ছিল ১৬ জুন, ২০১৩।

জানাজার পর সূর্যসেন হলের সামনে স্যার এর শবদেহের মুখখানি দেখি। সেই তারুণ্যমাখা মুখ যা উত্তর ষাটেও একইরকম ছিল, আর এখন মৃত্যুতে কিছুটা ম্লান। এক কাব্য-পার্থ আর কখনো তীর ছুঁড়বেনা। জীবনের কুরুক্ষেত্র থেকে চিরবিদায় নিলেন মহাপ্রস্থানের পথে।

আপনার মন্তব্য