বৃহস্পতিবার, , ১৮ অক্টোবর ২০১৮ ইং

আহমদ ছফা’র গুরু অন্বেষণ

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৮-০১ ০১:০৮:২২

 আপডেট: ২০১৮-০৮-০১ ০১:১৮:০০

জহিরুল হক মজুমদার:

আহমদ ছফা প্রয়াত হয়েছেন ২৮ জুলাই ২০০১ সালে। তখন বাইশ বছর পর ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের শেষ বছর। ছফার নিজের প্রেক্ষিত থেকে দেখলে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে ছফা আওয়ামী লীগের দু’টি শাসনামল দেখে যেতে পেরেছেন। একটি বঙ্গবন্ধুর এবং অপরটি শেখ হাসিনার। আওয়ামী লীগের একজন সমালোচক আহমদ ছফা; কিন্তু সহানুভূতিশীল সমালোচক। তাই ছফার মুখ থেকে শোনা যায়-আওয়ামী লীগ জিতলে শুধু আওয়ামী লীগই জিতে; কিন্তু আওয়ামী লীগ হারলে হেরে যায় গোটা বাংলাদেশ।

আহমদ ছফা রাজনীতির মানুষ ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকে পার্টি ভেঙে গেলে একবার আদিবাসীদের অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে গিয়েছিলেন। কামলার কাজ নিয়েছিলেন এক আদিবাসী পরিবারে। কাজ না পারায় ‘মগদা’ গালি শুনতে হত। চাকমা ভাষায় ‘মগদা’ মানে ‘মরা’। যতটা না জীবিকার তাগিদে তারচেয়ে জীবনকে বুঝার তাগিদ ছিল বেশী, এটা বুঝা যায়।

ছফা দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন না। চট্টগ্রাম শহরে নিজেদের বাড়ি ছিল। সেই বাড়ি বেচে টাকা নিয়ে এসেছিলেন। একটা ভাল কিছু করবেন বলে ভাবছিলেন। কিন্তু ভাবতে ভাবতে সেই টাকা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই ষাটের দশকেও ঢাকা অনেক আগ্রাসী একটা শহর ছিল এটা বুঝা যায়। কিংবা ছফা হয়তো উদার হাতে বিলিয়েছেন। আহমদ ছফা কপর্দকহীন, আশ্রয়হীন এবং গৃহহীন হয়ে যান।

ছফার মধ্যে এ নিয়ে কোন খেদ ছিলনা। হয়তো নিজের মধ্যে বসবাস করবেন বলেই বাড়ি হারানোর কোন খেদ ছিলনা।

আহমদ ছফার আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রবল। ষাটের দশকে পার্টি ভেঙে যাওয়ার পর অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কমরেড বলেছিলেন- ছফা, আস, বাসায় থাক, বাজার কর। এমনটিই আমরা ছফার সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি। ছফা লজ্জা পেয়েছিলেন এই ধরণের কথায়। কিন্তু আদিবাসীর বাড়িতে মজুর এর কাজ নিয়ে ‘মগদা’ গালি শুনতে কার্পণ্য করেন নি। কারণ ওটা ছিল নিজের পছন্দের জীবন অন্বেষণের অংশ।

কিন্তু ছফার মূল অন্বেষণ ছিল তাঁর গুরুরা। তিনি বসতি করেছেন নিজের ভিতর, কিন্তু গুরুর আশ্রয় অস্বীকার করে নয়। তাই গুরুদের তিনি নিরীক্ষণ করেছেন তীক্ষ্ণভাবে। কিন্তু ছফা সবসময় নির্মোহভাবে এই মূল্যায়ন করেননি। তাই মূল্যায়ন সবসময় সঠিক হয়নি। তাঁর গুরুদের নিয়ে তাঁর প্রধান দু’টি বই হচ্ছে “গাভী বিত্তান্ত” এবং অপরটি হচ্ছে “যদ্যপি আমার গুরু”।

“গাভী বিত্তান্ত” বইটি মূলত একজন উপাচার্যকে কেন্দ্র করে। বইটি সম্পর্কে শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক নয়। অনেকেই মনে করেন, এই বইটি অতিকথন দোষে দুষ্ট এবং কথনের মধ্যে শিল্পের অভাব আছে। এ ছাড়া শিক্ষক সমাজের জন্য অবমাননাকর বলেও মনে করেন অনেকে। যেমনটি অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেছেন- এই বইটি পড়ে মনে খুব কষ্ট পেয়েছি। শিক্ষকতাকে যারা আবেগের চোখে দেখেন এরকম যে কেউ এই বই পড়ে কষ্ট পাবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে জায়গা থেকে দেখলে ছফার প্রতি সুবিচার করা যায় তা এই যে-ছফা দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিকৃতি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।

হয়তো আহমদ ছফার সময়ে আদর্শবাদী শিক্ষকের সংখ্যাই বেশী ছিল। তাই প্রফেসর সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের কাছে এই লেখা ভাল লাগেনি। কিন্তু বর্তমান সময়ের গত দুই দশকের উপাচার্যদের দিকে তাকালে মনে হয় ছফার প্রতীকী বয়ান একেবারে ফেলনা নয়। তাই “গাভী বিত্তান্ত” একেবারে অপ্রাসঙ্গিক ফ্যান্টাসি নয়, বরঞ্চ ভাবীকালের একধরণের দলিল হিশেবেই যেন ছফা লিখেছেন। তাই বইটি অনেক বছর আগে লেখা হলেও তার মোড়ক উন্মোচন হওয়া উচিৎ ছিল এই সময়। “গাভী বিত্তান্ত” আমাদের এই সমকালে খুবই প্রাসঙ্গিক। তাই এটি “অকাল মোড়ক উন্মোচিত” একটি গ্রন্থ।

“যদ্যপি আমার গুরু” গ্রন্থে ছফা তাঁর বাস্তব গুরুদের অনেককেই নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কেন্দ্রে ছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। মুনির চৌধুরী যখন ছফাকে বললেন, ছফা অস্ট্রেলিয়াতে চলে যাও, এখানের পড়াশুনা শেষ করে, আমার বন্ধুরা আছে সেখানে, বলে দেব। ছফা আবেগাপ্লুত হয়েছেন। পাঠকের কাছে স্বীকার করেছেন, জীবনে কখনো কোন শিক্ষকের ভালবাসা পাননি। তাই মুনির স্যার এর কথায় আবেগ বোধ করেছেন।

আবার এমএ-এর ফলাফল বের হওয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি ফেলোশিপের আবেদন করে বসেছেন। সেখানে ছিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। যেখানে বোর্ডের সবাই অবাক হয়েছেন যে এমএ পাশ ছাড়া কীভাবে পিএইচডি ফেলোশিপ মিলতে পারে, সেখানে প্রফেসর কবীর চৌধুরী দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন যে- ছফা’র ব্যাপারটা আমাকে দেখতে দাও। এইসব ভালবাসা ছফাকে আপ্লুত করেছে।

কিন্তু মূল গুরু হিশেবে তিনি আব্দুর রাজ্জাককেই মেনেছেন। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক হিশেবে পেতে তিনি তাঁর বাড়িতে হাজির হন। চৌকিতে শয়নরত আব্দুর রাজ্জাক। কিন্তু চৌকির একটি পায়া বই এবং ইট দিয়ে ঠেকা দেয়া। আর চারদিকে অনেক বই। ছফা স্যারকে প্রস্তাবটি দিতেই তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লেন। অদম্য ছফা চেষ্টা করছেন বারবার বিভিন্ন কথা বলে গুরুর করুণা পেতে। কিন্তু পণ্ডিত রাজ্জাক নির্বিকার আলস্য এবং নিদ্রা অন্বেষণে। এক পর্যায়ে আহমদ ছফার আবেগি চিৎকারে আব্দুর রাজ্জাক বাস্তবে ফিরে এলেন। ভালবাসার চোখে তাকালেন এক আবেগি তরুণ ছফার দিকে। রচিত হল গুরু শিষ্যের সম্পর্ক।

কিন্তু সেই বাড়িটি এখন নেই। সেই জায়গায় এখন শিক্ষকদের থাকার জন্য একটি বহুতল ভবন করা হয়েছে। প্রথমে নাম ছিল “টাওয়ার ভবন”। বর্তমান নাম “মুনীর চৌধুরী ভবন”। আমাদের ছাত্রজীবনেও লাল ইটের সেই বাড়িটি দেখেছি। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক গুলশানে তাঁর ভাইয়ের ছেলে আবুল খায়ের লিটু এর পরিবার এর সাথে থাকতে গেলে সেই বাড়িটিতে থাকতেন শিল্পী শামীম শিকদার। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্মৃতির প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিষ্ঠুরতা কেন?

আহমদ ছফা পিএইচডি গবেষণাকালীন থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলে। সেখানে থাকতেন অনেক শিক্ষক তাঁদের পরিবার নিয়ে। তাঁর সেই জীবন নিয়ে তিনি লিখেছেন “পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ”। আন্তর্জাতিক হলে তাঁর সামাজিক সম্পর্ক, খোলা জায়গাটুকুতে কৃষিকাজ আর জীবনের আরও অনেক মাত্রা যা এমনকি আন্তর্জাতিক হলের বাইরের তাও উঠে এসেছে এই লেখায়।

আমি জানিনা আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হল দেখলে আহমদ ছফা কী লিখতেন কিংবা কী বলতেন। গত এক যুগের ও বেশী সময় ধরে আন্তর্জাতিক হলের কর্তৃত্ব করছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। বিএনপির শাসনামলে জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা হয়েছেন এই হলের প্রভোস্ট। আবার আওয়ামী লীগের শাসনামলেও সমন্বয়ের রাজনীতির নামে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদেরই এই হলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে হলে বসবাসকারী আন্তর্জাতিক ছাত্রদের উপযোগী এখানকার ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিবেশ। জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের উদ্ভট আচরণ দেখলে হয়তো ছফা তাঁর লেখাটি ফিরিয়ে নিয়ে অন্য কিছু লিখতেন।

তাছাড়া আজকের হাতাহাতি চিৎকারের শিক্ষক রাজনীতি এবং বালখিল্য আচরণদুষ্ট উপাচার্যদের কাণ্ডকারখানা দেখলে আহমদ ছফা হয়তো ভাবতেন আরেকটি “গাভী বিত্তান্ত” লেখার।

প্রার্থনা করি আহমদ ছফা’র সত্তা নিয়ে কারো আবির্ভাব হোক আবার। হয়তো ভিন্ন নামে। ক্ষতি নেই। যারা অপেক্ষায় আছে তাঁরা চিনে নেবে।

আপনার মন্তব্য