আজ মঙ্গলবার, , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

ভালোবাসা সন্ধানের দিনগুলো

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৮-১৯ ০০:৩১:০৯

জহিরুল হক মজুমদার:

অণুগল্প-১
ক্লাবের সামনে এসে তুই বললি—এটা শহীদ কাদরী’র বৃষ্টি। দেখ বৃষ্টির সন্ত্রাসে কেমন চারদিক ফাঁকা। এখন আমি একটা সিগারেট খাবো। তুমিতো সিগারেট ছেড়ে দিয়েছ। এই শহরে জোনাকি নেই। আমি সিগারেটে জোনাকি জ্বালবো। ছাত্রজীবনে আমাকে পাত্তা দাওনি। তুমি লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আমার বন্ধুদের সাথে গল্প করতে। আমিও তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তুমি পাত্তা দাওনি। আমিতো তোমার সরাসরি ছাত্রী ছিলাম না। অন্য বিভাগের ছাত্রী ছিলাম। পাত্তা দিলে কী হত!

এই টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে আমি ছাতা ধরে আছি তোর মাথায়। তুই আমাকে ছাতার নীচে দাঁড়াতে দিসনি। বলেছিস এটা আমার শাস্তি। তোর ঠোঁটে জোনাকি জ্বলছে। আর সেই জোনাকির আলোয় আমি তোর মুখ দেখছি। পাশের ল্যাম্পপোস্ট আলো গায়ে মেখে ঝির ঝির বৃষ্টি পড়ছে আমার মাথায়।

আমার হাতে ভাবনার জন্য এক সিগারেট লম্বা সময় আছে। এই এক অন্য জোনাকির আলোয় আমি আজ তোর মুখ দেখছি। জোনাকি নিভে যাওয়ার শেষ আলোর ছটায় আমি বুঝতে পারবো, আমি কি তোকে সত্যিই ভালোবাসি অথবা তুই আমাকে।

অণুগল্প-২
এই জায়গাটায় দুটো হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একজন ভিকটিম আমি আর আরেকজন ডেভিড। খুনগুলো কি আমরাই আগে শুরু করি? অন্তত মানসিকভাবে? তারপর মিডিয়া সেই খুনে শামিল হয়- প্রচারণার খুন। তারপর রাষ্ট্র এগিয়ে আসে বন্দুক হাতে। তাঁর লোকেরা এগিয়ে আসে বিচিত্র পোষাকে-সাদা, সবুজ আর কালো।

তুমি ডেভিডের মৃত্যু সংবাদ পড়েছ হয়তো। আমি ক্লাবে বসে বৈকালিক চা পান করছিলাম। এমন সময় ক্লাবের বেয়ারা তাহের এসে একটি পত্রিকা দেখিয়ে বলল, স্যার দেখেন কী তরতাজা ছেলে মাটিতে পড়ে আছে। আমি তাকিয়ে দেখি ডেভিড। সমাজে পরিচিত কুখ্যাত সন্ত্রাসী ডেভিড হিশেবে।

ডেভিড গাড়ি করে তার প্রেমিকা নিয়ে যাচ্ছিল। পেছনে তাড়া করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ডেভিড গাড়ি থামায়। এক দরোজা দিয়ে ডেভিড আর আরেক দরোজা দিয়ে তার প্রেমিকা নেমে পড়ে। ডেভিড পালাতে চেয়েছিল। নিরাপত্তা রক্ষীদের গাড়ি ছিল অনেক দূরে। আর রাস্তা ছিল জনাকীর্ণ। কিন্তু ডেভিড জানতোনা তারা কত দক্ষ শুটার।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর স্নাইপ শুটার মাত্র একটি গুলি করে। তারপর বাহিনী গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায়। তারা ডেভিড এর পড়ে থাকা দেহের কাছেও যায়না। তারা জানে ডেভিড আর নেই। এই বিশাল জনাকীর্ণ রাস্তায় গুলিটি ভুলেও অন্য কারো গায়ে লাগেনা।

এটা মালিবাগের সেই জায়গাটা যেখান থেকে বিশ্বরোড নামে একটি রাস্তা শুরু হয়েছে। আমি মাস্টার্স এর থিসিস এর কাজ ফেলে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম তোমাকে দেখার জন্য। একদিন কী মনে হল-সেই জায়গাটা থেকে সোজা হাঁটা দিলাম হলের দিকে। মনে হল, একজন মানুষের জীবন এরকম হওয়া উচিৎ নয় যে সে আরেকজন মানুষের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে- যখন সে মানুষটি তাকে ভালোবাসে কি না সেটা নিশ্চিত নয়।

সেই মুহূর্তে আমি পরাজিত না জয়ী হয়েছিলাম জানি না। অনেক দিন পর মনে হয় ডেভিড এর মতন আমিও কি নিহত হয়েছিলাম সেখানে?

অণুগল্প-৩
শীতের শেষ বিকেলে উত্তরের কুয়াশা মাখা এক মাঠে শুরু হয় গানের আয়োজন। ধ্রুপদী সংগীত কুয়াশার সাথে মিশে এক অদ্ভুত মোহ জাগানিয়া পরিবেশ তৈরি করে। তুমি বলেছিল চৌরাসিয়া’র বাঁশি শুরু হলে যেন তোমাকে শোনাই। আমি কল করি তোমাকে সাতসমুদ্র তের নদীর ওপারে। তুমি মোমবাতি জ্বালিয়ে এক আলোআঁধারিতে টেলিফোনে শুনতে থাকো মোহন বাঁশির সুর। আমি হ্যালো হ্যালো বলেও কোন সাড়া পাইনা।

পরের দিন বলেছিলে, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে বাঁশি শুনতে শুনতে। এক গভীর স্বপ্নমাখা ঘুম। আমি কিন্তু কলটা কাটিনি। শেষরাতের কুয়াশার শব্দের মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমি ঘরে ফিরি। আর টেলিফোন হয়ে তোমার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে যায় শিশিরের শব্দ। আমি কি ছিলাম তোমার স্বপ্নে? আজও জানা হয়নি।

এই এক না জানার সন্ধান চলছেই ভিতরে। আবার উত্তরটা পেতেও ভয়। যদি উত্তরটা ‘না’ হয়। তাই উত্তর না পাওয়াই হয়তো ভাল। চলুক না অসীম এক অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের নামই হয়তো ভালোবাসা।

আপনার মন্তব্য