বুধবার, , ১৭ অক্টোবর ২০১৮ ইং

মিলু কাশেম: ষাটেও কাশফুল মন, আজও সজীব তরুণ

সাক্ষাৎকার

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৯-২০ ১৯:৫৯:২৬

ধ্রুব গৌতম:

কোন গুণধর মানুষের সাথে যদি প্রকৃতির কোন উপাদান বা উপকরণ উপমা হিসেবে ব্যবহার করতে হয় তাহলে তা খুব ভেবেচিন্তে করাই বাঞ্ছনীয়। পৃথিবীর সব সুন্দরের উপমা যেন নারীদের বেলাই প্রযোজ্য। পুরুষের বেলায় সে কর্ম কঠিন।

দোলনচাঁপা। বাংলাদেশে এক জনপ্রিয় ফুল। চার পাপড়ির সমন্বয়ে দুধেল সাদা রড়ের এ ফুলের সুবাস মনোমুগ্ধকর। দোলনচাঁপা ফুলকে আজ যে গুণধর পুরুষের উপমা করব তিনি হলেন। তুখোড় ছড়াকার, সংগঠক, সাংবাদিক ও ভ্রমণপিপাসী শিশুসাহিত্যিক লেখক। দোলনচাঁপার চার পাপড়ির চার গুণ। দুধেল সাদার মত তাঁর মন। নৈতিকতায় অটল অবিচল।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার এ গুণী ব্যক্তিত্বের ষাটতম জন্মদিন অতিক্রম করেছেন। তাই তাঁকে শুদ্ধচিত্তে শ্রদ্ধা জানাই। ষাটতম জন্মদিনকে কেন্দ্র করে কথা বলেছিলাম মিলু ভাই’র সাথে; সিলেটটুডের পাঠকদের জন্যে তা বিস্তারিত।

ধ্রুব গৌতম: আদাব মিলু ভাই, কেমন আছেন?
মিলু কাশেম: অবশ্যই ভালো আছি সকলের দোয়া ও ভালোবাসা নিয়ে।

ধ্রুব গৌতম: সম্প্রতি আপনি ষাট বছর অতিক্রম করেছেন, কেমন লাগছে?
মিলু কাশেম: খুবই ভালো লাগছে। কারণ মানুষের স্বাভাবিক গড় আয়ুর সীমানা অতিক্রম করেছি সুস্থ দেহে প্রশান্ত মন নিয়ে, পরিবার পরিজন বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে, সেটা কম কিসে।

ধ্রুব গৌতম: আপনার পৈত্রিক বাড়ী সৈয়দপুর, জন্মেছেন সুনামগঞ্জের ষোলঘরে আবার বেড়ে উঠেছেন সিলেটে, কিভাবে ?
মিলু কাশেম: আমার পৈত্রিক নিবাস সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে। বাবা সৈয়দ রাছ উদ্দিন আহমদ সরকারি চাকুরীজীবী ছিলেন। চাকুরীর সুবাদে মা সৈয়দা দয়া বেগমকে সাথে নিয়ে সুনামগঞ্জের ষোলঘরে বাস করতেন, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সালে আমার জন্ম। সুনামগঞ্জে বসবাসকালে চার ভাইয়ের জন্ম সেখানেই। ১৯৬৬ সালে বাবা সিলেটে বদলী হয়ে এসে দাড়িয়াপাড়ায় বসবাস শুরু করেন। আজ যেখানে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কোয়ার্টার সেখানে পুরাতন জমিদার বাড়ী ছিলো। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত দাড়িয়াপাড়া বসবাস করে পরে ১৯৬৯ সাল থেকে বড়বাজারে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে বনানী ভবন-১৪০, বড়বাজার, আম্বরখানা,  সিলেটের স্থায়ী বাসিন্দা।

ধ্রুব গৌতম: আপনারা ভাই-বোন কতজন এবং কে কি করছেন ?
মিলু কাশেম: আমরা  ৬ ভাই ৪ বোন মিলে দশজন। আমি সবার বড়, ৪ ভাই ও ১ বোন যুক্তরাজ্যে, ১ বোন যুক্তরাষ্ট্রে ও বাকি সকলেই বিবাহিত এবং আপাতত দেশেই আছেন। আমার ২য় ভাই সৈয়দ আবুল মনসুর লিলু, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবসায়ী হলেও লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে তারও রয়েছে পরিচিতি, তিনি বাংলাদেশের অনেক পত্রপত্রিকার লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন, রাজনীতিবিদ ও কমিউনিটি লিডার হিসেবে তার রয়েছে আলাদা পরিচিতি, বর্তমানে তিনি লন্ডন প্রবাসী। ৩য় ভাই সৈয়দ আবু জাফর হিরু, তিনি একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, এক সময় অধ্যাপনা করতেন, সচিত্র ক্রাইম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, তিনিও বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্রার্ডফোর্ড নিবাসী। ৪র্থ ভাই সৈয়দ আবু নাসের দিলু যিনি দিলু নাসের নামে খ্যাতিমান ছড়াকার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, তিনিও লন্ডন প্রবাসী। ৫ম ভাই সৈয়দ আবুল মহসিন লিটু যুক্তরাজ্যের লিভারপুল নিবাসী ব্যবসায়ী। ৬ষ্ঠ ভাই সৈয়দ মঞ্জুর আহমদ মঞ্জু দেশে থাকেন ব্যবসায়ী। এক বোন সৈয়দা ফাতেমা চৌধুরী শিল্পী, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন নিবাসী।

ধ্রুব গৌতম: আপনার ভাই-বোনেরা কি আপনার মত শিল্প-সাহিত্যে সম্পৃক্ত?
মিলু কাশেম: আমাদের দশ ভাই বোনদের মধ্যে অধিকাংশই প্রবাসী এবং সকলেই আপন গুণে উদ্ভাসিত। এদের মধ্যে সৈয়দ আবুল মনসুর (লীলু), লন্ডন প্রবাসী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা। সৈয়দ আবু জাফর (হিরু), ব্রাডফোর্ড প্রবাসী শিক্ষাবিদ ও কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ। সৈয়দ আবু নাসের (দিলু), লন্ডন প্রবাসী প্রখ্যাত ছড়াকার, সাংবাদিক, উপস্থাপক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। সৈয়দ আবুল মহসিন (লিটু) লিভারপুল নিবাসী তরুণ ব্যবসায়ী। সর্বকনিষ্ঠ ভাই সৈয়দ মনজুর আহমদ (মনজু), গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও তরুণ ব্যবসায়ী।

ধ্রুব গৌতম: আপনার সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
মিলু কাশেম: সুনামগঞ্জে মফস্বল শহরে জন্মগ্রহণ করলেও আমার লেখাপড়া ও বেড়ে উঠা সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে। আমার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ছিলো খুব। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাকে খুব বেশী টানতো। এরই সাথে ছড়া কবিতা লেখার প্রতি আমার ঝোঁক বেড়ে যায়। লেখার সাথে সাথে আমার নাম দিকে দিকে পরিচিতি লাভ করে সুনাম সঞ্চয় করে। সত্তরের দশকে আমার প্রচুর ছড়া, কিশোর কবিতা এপার বাংলা ওপার বাংলার বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, সংকলন, উৎসব স্মারক ইত্যাদিতে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছড়া সাহিত্যে নিয়মিত লেখা চালিয়ে গেছি।

ধ্রুব গৌতম: আপনার লেখা প্রথম কবে কোথায় প্রকাশিত হয়?
মিলু কাশেম: ১৯৭৩ সালের ৩০ জুলাই পনের বছর বয়সেই সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু নামে জাতীয় দৈনিকে ‘দেশের তরে লড়বো’ শিরোনামে আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়।

ধ্রুব গৌতম: বাংলাদেশের ছড়াকারদের পরিচিতিমূলক প্রথম গ্রন্থ ‘ছড়া ও ছড়াকার’ নিয়ে কিছু বলুন।
মিলু কাশেম: ১৯৭৬ সালে ‘বাংলাদেশের ছড়া ও ছড়াকার’ নামে বাংলাদেশের ছড়াকারদের পরিচিতিমূলক প্রথম গ্রন্থ কিশোর বাংলা ঢাকা থেকে আমরা প্রকাশ করি। বইটির ৩ জন সম্পাদক সম্পাদনা করি। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার,  কবি সৈয়দ আল ফারুক ও  আমি সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু।

ধ্রুব গৌতম: ছড়াকার রফিকুল হক (দাদু ভাই), গীতিকার ফজল-এ-খোদা, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, কথাশিল্পী অধ্যাপক মনিরা কায়েস এর এর সাথে আপনার সম্পর্ক কিভাবে?
মিলু কাশেম: দৈনিক পূর্বদেশ এর ছোটদের পাতা ছিল চাঁদের হাঁট। আমি ছিলাম চাঁদের হাটের একজন কিশোর সদস্য। রফিকুল হক দাদু ভাই ছিলেন চাঁদের হাটের পরিচালক এবং একজন জনপ্রিয় ছড়াকার। আমি তাঁর ছড়ার মুগ্ধ পাঠক। চাঁদের হাটে লেখালেখির মাধ্যমে দাদু ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। ঢাকায় যাওয়া-আসার মাধ্যমে সেই পরিচয় থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠে। গীতিকার ফজল-এ-খোদা ছিলেন বাংলাদেশ বেতার এর প্রকাশনা সম্পাদক, তাঁর সম্পাদনায় বের হত ছোটদের জনপ্রিয় পত্রিকা শাপলা শালুক। ফজল-এ-খোদা পরবর্তীতে শাপলা শালুকের আসর (রেডিও ক্লাব) নামে একটি শিশু কিশোর সংগঠন গড়ে তোলেন। শাপলা শালুকে লেখালেখির সু-বাদে ফজল-এ-খোদার সাথে আমার ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক। সেই সুবাদে আমরা সিলেটের শাপলা শালুকের আসর গঠন করি। এভাবেই ফজল-এ-খোদার সাথে আমার হৃদ্যতা গড়ে উঠে যা আজও বিদ্যমান। লেখালেখির সুবাদে রিটন, শাহরিয়ার ও মনিরার সাথে আমার পরিচয়। প্রথম দিকে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ থাকলেও পরবর্তীতে যা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যায় যা আজও অব্যাহত আছে।

ধ্রুব গৌতম: রঙিন কিশোর সংকলন ‘ঝিঙে ফুল’ কবে প্রকাশিত হয়?
মিলু কাশেম: স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সিলেটের সাড়া জাগানো জাতিয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘শাপলা শালুকের আসর’ থেকে ১৯৭৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় রঙিন কিশোর সংকলন ‘ঝিঙে ফুল’। আমি ছিলাম এ সংকলনের সম্পাদক এবং প্রধান সম্পাদক ছিলেন লোকমান আহমদ। এ সংখ্যাটির মাধ্যমে অনেক নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে যারা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

ধ্রুব গৌতম: সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু থেকে মিলু কাশেম হিসেবে কখন লেখা শুরু করেন?
মিলু কাশেম: জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’র শিশুপাতা ‘সাতভাই চম্পা’য় সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু থেকে ‘মিলু কাশেম’ নামে পরিচিতির সূত্রপাত ঘটে।

ধ্রুব গৌতম: ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ছড়া লিখিয়েও ছড়া বিষয়ক সংবাদপত্র ‘ছড়া সন্দেশ’ সম্পর্কে জানতে চাই।
মিলু কাশেম: বাংলা ভাষায় প্রথম ছড়া লিখিয়েও ছড়া বিষয়ক সংবাদপত্র ‘ছড়া সন্দেশ’ ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় কবি তুষার কর ও আমার যৌথ কর্মপ্রচেষ্টায়। যা উভয় বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আমি ছিলাম এর অন্যতম সম্পাদক। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আকাশবাণী কলকাতায় আলোচনা অনুষ্ঠানে সংখ্যাটির বিস্তর আলোচনা করে ভূয়সী প্রশংসা করেন। ৬/৩ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা থেকে প্রকাশিত সে সময়ের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর পত্রিকা ‘তেপান্তর’ সম্পাদক ও শিশু-সাহিত্যিক নির্মলেন্দু গৌতম চিঠি দিয়ে ‘ছড়া সন্দেশ’ প্রকাশে অভিভূত হয়ে সম্পাদকদের অভিনন্দন জানান।

জাতিয় দৈনিক পত্রিকা দৈনিক বাংলার শেষের পাতায় প্রখ্যাত সাংবাদিক হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘লোক লোকালয়ে’ ‘ছড়া সন্দেশ’ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা লিখেন এবং তিনিও ছড়া বিষয়ক এ ভিন্নমাত্রার নান্দনিক  কাজকে “ভারী সুন্দর এবং চমৎকার একটি কাজ” হিসেবে অভিহিত করেন।

ধ্রুব গৌতম: দীর্ঘ বিরতির পর আবার কবে লেখালেখিতে যুক্ত হলেন?
মিলু কাশেম: প্রবাসে চলে যাওয়ায় আমার বিরতি চলে লেখা লেখির জগতে। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় পাণ্ডুলিপিগুলো সংগ্রহ থেকে হারিয়ে যায়। দেশে ফিরে তথ্য ও প্রযুক্তির জনপ্রিয় ফসল ফেসবুকে নতুন করে আবার লেখালেখির জগতে ফিরে আসি। সিলেটের কবি সংগঠন বৃন্দস্বরের গুরুজন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক নৃপেন্দ্র লাল দাশ ও সংগঠনের গোষ্ঠীপতি শামসুল আলম সেলিমসহ অন্যদের উৎসাহে আমি আবার প্রাণের ভুবনে সরব হই।

ধ্রুব গৌতম: আপনি লেখালেখির জগতে অনেক বছর ধরে আছেন, আপনার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা কয়টি ও কি কি?
মিলু কাশেম: লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সাথে আমার সম্পৃক্ততা প্রায় অর্ধশত বৎসরেরও অধিক সময় ধরে। কিন্তু সে অনুপাতে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। তবুও গুটি চারেক গ্রন্থ প্রকাশে সক্ষম হই। মার্চ ২০১০ সালে ভ্রমণকাহিনীমূলক গ্রন্থ ‘দূরের দেশ কাছের দেশ’ মার্বেল প্রকাশন থেকে প্রকাশ করে আমার অনুজ দিলু নাসের। কবি সংগঠন ‘বৃন্দস্বর’ এর পক্ষে গীতিকার শামসুল আলম সেলিমের প্রকাশনায় কবিতা গ্রন্থ ‘সংগোপন স্বপ্নে’ ১৪২১ বাংলায় প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে প্রকাশনা সংস্থা ‘নাগরী’ থেকে শিশুতোষ ছড়া-কবিতা গ্রন্থ ‘পদ্মপাতায় প্রীতির নাম’ প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালের বইমেলায় হাওর প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় কবিতার বই ‘চলো যাই গ্রামে ফিরে’। ২০১৮ সালের বইমেলায় আরেকটি ভ্রমণকাহিনীমূলক গ্রন্থ দিয়া প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় ‘ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ’ শিরোনামে।

ধ্রুব গৌতম: লেখক হিসেবে আপনার সুখকর স্মৃতি কি আছে?
মিলু কাশেম: দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার শিশুদের সাহিত্য পাতা ‘শাপলা কুঁড়ির আসর’ পাতাটি ‘গল্প বুড়ো’ ছদ্মনামে সম্পাদনা করতেন শ্রদ্ধেয় শিশু সাহিত্যিক বিমান ভট্টাচার্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে ১৮ মার্চ ১৯৭৪ সালে তাঁকে নিবেদিত শাপলা কুঁড়ির আসরের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেদিন সম্পাদক বঙ্গবন্ধুর হাতে সংখ্যাটি তুলে দিলে বঙ্গবন্ধু মনোযোগ সহকারে অন্যান্যদের লেখার সাথে আমার লেখাও পড়েন। এ সময়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সে মূহুর্তের স্থিরচিত্র ধারণ করেন যা পরবর্তীতে বাংলার বাণী পত্রিকায় ছাপা হয়।

ভবানী প্রসাদ মজুমদার, বর্তমান সময়ে যাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘ছড়া সম্রাট’ বলে অভিহিত করা হয়। সেই ছড়া সম্রাট ভবানী প্রসাদ মজুমদার মাহবুব হাসান’র সম্পাদনায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ছড়া বিষয়ক লিটলম্যাগ ‘ছড়া’র সাথে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি ৭ম সংখ্যায় ‘বাংলাদেশ আমায় বড়ই টানে’ শিরোনামে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ছড়াকারদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নামসহকারে তিনি তাঁর অগ্রজ, সমসাময়িক ও অনুজদের বিষয়ে ‘এরা সকলেই আমার প্রিয় ও ভালো লিখেন’ মর্মে উল্লেখ করেন, যাদের মধ্যে আমার নামও উল্লেখ করেন। এটাকেও আমি আমার লেখক জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে মনে করি। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে প্রকাশিত ছড়া পত্রিকার ‘রাশেদ রউফ সংখ্যা’য় পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ছড়া পত্রিকা ‘টুকলু’র সম্পাদক ছড়াকার অমল ত্রিবেদী তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে তাঁর প্রিয় ও পরিচিত ছড়াকারদের কথা বলতে গিয়ে সিলেটের লেখক হিসেবে আমার নাম উল্লেখ করেন।

ধ্রুব গৌতম: সাংবাদিক ও সৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে আপনার বর্ণাঢ্য জীবনের কথা তুলে ধরুন।
মিলু কাশেম: ১৯৭৬ সালে সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার কিশোর সংবাদদাতা হিসাবে আমার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে আমি ঢাকা ও লন্ডনের বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করি। সে সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত খবর গ্রুপের ‘সাপ্তাহিক মনোরমা’য় বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল তারকা, টেনিস তারকা ও সঙ্গীত তারকাদের জীবনী ও সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনেক ফিচার ও প্রতিবেদন লিখি, যা সে সময়ে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তৎকালীন পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনাকে নিয়ে ‘কংক্রিট সভ্যতার জঙ্গলে ম্যাডোনা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রচ্ছদকাহিনী রচনা করি এবং সে প্রচ্ছদের ছবিটিও ছিলো আমার নিজ হাতে তোলা। ১৯৮৫ সালে ম্যাডোনার ইউরোপ সফরের সময় দুদিন প্যারিসের ব্যস্ততম রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রচ্ছদের ছবিটি তুলেছিলাম। আমি একজন শৌখিন ফটোগ্রাফার। প্রবাসে থাকাকালে অনেক খ্যাতিমান তারকাদের ছবি তুলেছি, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান ফুটবল তারকা ব্যাকেন বাওয়ার, ডাচ ফুটবল তারকা রুড গুলিত, ফান বাস্টেন, টেনিস তারকা বরিস বেকার, স্টেফিগ্রাফ, জার্মান সংগীত তারকা নীনা খ্রিস্টিনা ব্রাক প্রমুখ। এদের অনেকেরই অটোগ্রাফ এখনো আমার সংগ্রহে আছে। আমি ভ্রমণেও সুখবোধ করি। বিশ্বের অনেক দেশ ঘুরে ঘুরে সে দেশের মানুষের জীবন জীবিকা কৃষ্টি সংস্কৃতি উপলব্ধি করে আমার লেখা ভ্রমণকাহিনীগুলোকে বাস্তব নির্ভর  করেছি, এবং সে সাথে সে সব দেশের ডাকটিকেট, মুদ্রা ও ভিউকার্ড সংগ্রহ করেছি যা আজও আমার কাছে সযত্নে সংগৃহীত।

 ১৯৮১ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক যুগ প্রবাসে কাটিয়ে দেশে ফিরে আমি আবারও সাংবাদিকতা শুরু করি। তখন আমি ঢাকার সংবাদচিত্র গ্রুপ অব পাবলিকেশন এর সিলেট ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করি। পরবর্তীতে সিলেটের বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রয়াত খায়রুল আমিন মঞ্জুর সাথে মিলে সিলেটের প্রথম রঙ্গিন পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘পনের দিন’ প্রকাশ করি। এর সম্পাদক ছিলেন খায়রুল আমিন মঞ্জু ও আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক। এর কিছুদিন পর সাপ্তাহিক সচিত্র ক্রাইম নামে একটি পত্রিকা আমি নিজেই প্রকাশ করি। সাপ্তাহিক সচিত্র ক্রাইম এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন আমারই ছোটভাই সৈয়দ আবু জাফর এবং সে নিজে ছিলো এর প্রধান সম্পাদক।

 এ সময়ে আমি ঢাকার এইচআরসি মিডিয়া লিমিটেডের ‘সাপ্তাহিক প্রতিচিত্র’র বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। এর সম্পাদক ছিলেন বরুণ শঙ্কর। পরবর্তীতে এইচআরসি মিডিয়া জাতীয় দৈনিক ‘যায় যায় দিন’র মালিকানা ক্রয় করলে বরুণ শঙ্কর এরও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং আমি সেই সাথে যায় যায় দিনের বিশেষ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করি।

২০০০ সালের দিকে সিলেটে ‘দৈনিক কাজির বাজার’ নামে নতুন পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হলে আমি নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি এবং আমার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পত্রিকাটি ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করে। আমি বিভিন্ন সময় ঢাকার খবর গ্রুপ অব পাবলিকেশন, আজকের বিচিত্রাসহ বাংলাদেশ, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে আজও কাজ করে আসছি। জনপ্রিয় জার্মান সংবাদ মাধ্যম ‘ডয়েচেভ্যালে’, ‘রেডিও জাপান’ ও ‘বিবিসি’র বিভিন্ন তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগি হিসেবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। উল্লেখ্য ‘বিবিসি’র খ্যাতিমান সাংবাদিক MICHAEL PALIN এর তথ্যচিত্র ‘ভুটান টু বাংলা’র বাংলাদেশের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

ধ্রুব গৌতম: সংসার জীবনে আপনি কতটা ছন্দবদ্ধ? আপনার সন্তানেরা কে কি করছেন?
মিলু কাশেম: সংসার জীবনে আমি যথেষ্ট সুখী ও গর্বিত অভিভাবক। ১৯৯০ সালে সৈয়দা নাজমিন আক্তার রোজীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। আমি চার কন্যা সন্তানের গর্বিত জনক। আমাদের ঘর আলো করে সৈয়দা সাবরিনা শাহনাজ প্রিয়া, সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছে। দ্বিতীয় কন্যা সৈয়দা সামিরা শাবনাজ (নওরীন) মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ৩য় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। ৩য় কন্যা সৈয়দা সামিনা শারমিন (নুপুর) আম্বরখানা গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্রী। সব ছোট মেয়ে সৈয়দা সামিয়া শাহরিন (প্রীতি) এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থী। এই চারটি কন্যা সন্তান ও স্ত্রী নিয়েই আমার স্বর্গসুখ।

ধ্রুব গৌতম: ছড়াকার হওয়ার পিছনে আপনার অনুপ্রেরণাকারী কারা?
মিলু কাশেম: আজকের এ খ্যাতিমান ছড়াকার হওয়ার পিছনে যে সকল অগ্রজ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন তাদের মধ্যে কবি দিলওয়ার, ফজল-এ-খোদা, রফিকুল হক (দাদু ভাই), শামসুল করিম কয়েস, মাহমুদ হক, তুষার কর, রোকেয়া খাতুন রুবী অন্যতম।

ধ্রুব গৌতম: জাতীয় পর্যায়ের অনেক লেখকের সাথে আপনার হৃদ্যতা রয়েছে জানি।
মিলু কাশেম: দ্রোহ ও প্রেমের কবি হেলাল হাফিজ, দেশবরেণ্য ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, বর্তমান সময়ের খ্যাতিমান কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, খ্যাতিমান কথাশিল্পী অধ্যাপক মনিরা কায়েস, কবি সৈয়দ আল ফারুক আমার কৈশোরের বন্ধু, যার রেশ আজও বহমান।

ধ্রুব গৌতম: আপনার সমসাময়িক লেখক কারা, যারা আপনাকে ছড়াকার হতে সহযোগিতা করেছেন?
মিলু কাশেম: আমার সমসাময়িক যেসব লেখকরা আমাকে নানা সময়ে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের মধ্যে গোবিন্দ পাল, সন্তু চৌধুরী, শেখর ভট্টাচার্য’র নাম উল্লেখযোগ্য।

ধ্রুব গৌতম: আপনার প্রিয় ও হৃদ্যতাসম্পন্ন ছড়াকার কারা?
মিলু কাশেম: আমার প্রিয় ছড়াকারদের মধ্যে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, ছড়াকার ফারুক নেওয়াজ, ছড়াকার আনোয়ারুল কবির বুলু ও ছড়াকার দিলু নাসের এবং অনুজ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে সিলেটে- জয়নাল আবেদীন জুয়েল, অজিত রায় ভজন, শাহাদত বখত শাহেদ প্রমুখ।

ধ্রুব গৌতম: ‘দূরের দেশ কাছের দেশ বইটি নকল হওয়ার ঘটনা আমাদের একটু জানান।
মিলু কাশেম: আমার প্রথম ভ্রমণ কাহিনী দূরের দেশ কাছের দেশ প্রকাশনার সাথে সাথে পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। দেশে-বিদেশে অনেকেই বইটি পাঠ করে আমাকে তাদের ভাল লাগার কথা জানান। জনপ্রিয় টিভি-চ্যানেল, চ্যানেল আই তাদের “বই এবং বই” অনুষ্ঠানে দূরের দেশ কাছের দেশ নিয়ে আলোচনার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। অনুষ্ঠানটি প্রচার হওয়ার পর বইটি আরও জনপ্রিয়তা পায়। সেই সুবাদে ঢাকার নীলক্ষেতের এক পুস্তক ব্যবসায়ী বইটি আমার অনুমতি ছাড়াই পুনঃপ্রকাশ করে বাজারে ছেড়ে দেয়। একদিন গুগলে সার্চ করে আমার এক বন্ধু এটা জানতে পেরে আমাকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে আমি আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর মাধ্যমে সেই পুস্তক ব্যবসায়ীর সন্ধান পাই। পরবর্তীতে তারা এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আমার সাথে একটি সমঝোতায় আসেন।

ধ্রুব গৌতম: আপনি একজন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আপনার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্পর্কে জানলাম, নিজের তিনি ও আদর্শকে ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। যে কোন অন্যায়ে আপোষ করেননি। বিতণ্ডা না করে এড়িয়ে গেছেন কত শত জঞ্জাল। তাইতো আজও আপনি মধ্য দিনের সূর্যের মত জ্বলজ্বলে আলোকময়। শততম অতিক্রম করুণ এই রূপ রস গন্ধের সমন্বয়ে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, শুভ জন্মদিনের এ শুভ কামনা নিরন্তর।
মিলু কাশেম: অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে এবং তোমার মাধ্যমে সকল পাঠক, সুহৃদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।

আপনার মন্তব্য