সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

স্বপ্নচাষী

 প্রকাশিত: ২০১৯-০২-২১ ০০:৪০:৪৮

রেহানা বীথি:

একটা শব্দ কানে এলো।

যেন খবরের কাগজের পাতা ওলটাচ্ছে কেউ। আজকাল প্রায় প্রতি রাতেই অদ্ভুত অদ্ভুত সব শব্দ কানে আসে। ঘর অন্ধকার করে যখন ঘুমোনোর প্রস্তুতি নেয় বাদল, শব্দগুলো ঠিক তখনই হয়। অবশ্য এই শব্দের কারণে ঘুমের কোনো হেরফের হয় না। একটু এপাশ ওপাশ করে ও ঘুমিয়ে যায় নিশ্চিন্তে। আর ঘুম মানে একেবারে কাদা। ঘরের দরজা সশব্দে কেউ যদি ভেঙ্গে ফেলে তবুও ভাঙবেনা সেই ঘুম। এমনকি পাঁজাকোলা করে কেউ যদি তুলেও নিয়ে যায় তাকে, তবুও ঘুমের কোনো হেলদোল হবে না বোধহয়। আর ঘুমের সাথে বোনাস হিসেবে তো আছে মেঘের চাপা গুরুগুরু শব্দের মতো নাসিকাধ্বনি। ব্যস, আর কী চাই?

এই যে এত ঘুম বাদলের তারও তো একটা কারণ আছে। ক্লান্তি। সারাদিন ঠিকই চলে, কিন্তু যেই না সূর্যটা ডুবুডুবু, ও ক্লান্ত হয়। সূর্য ডুবে গেলে আরেকটু বাড়ে সেই ক্লান্তি। ঘড়ির কাঁটা যেমনই ন'টা ছুঁই ছুঁই, ক্লান্তির সুবিশাল আকাশটা তখন ঘোর অন্ধকার হয়ে চেপে বসে বাদলের দু'চোখে। ও ঘুমিয়ে যায়। সারাদিন হেঁটে হেঁটে দূরদূরান্তে গিয়ে গিয়ে ছাত্র পড়ানোর ক্লান্তিতে নেমে আসে ঘুম নামক শান্তির শব্দটা। নেমে আসে বাদলের ছোট্ট ঘরের আড়াই হাত চোকিটায়।

২.
বিরক্তির চরম সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে ছেলেটা। মানুষ এমন হতে পারে? এতটা নির্লিপ্তি কেন থাকবে কোনো মানুষের স্বভাবে? একেবারেই থম মেরে আছে যেন ওর জীবনটা। সামনেও এগুবে না, পেছোবে না পেছনেও। এই যে আগুপিছু কিছুই হচ্ছে না ওর জীবনে এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর তো থাকবে! নেই । প্রতিদিন কত কত মানুষের কত হাহাকার, তাদের এই হলো না, সেই পেলো না। এই চাই সেই চাই। চাইতে চাইতে জীবনটা ছ্যারাব্যারা হয়ে যাচ্ছে তবুও চাওয়ার কোনো শেষ নেই। পাচ্ছে যথেষ্ট। পাওয়াগুলোতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত কেউ কেউ, তবুও চাই। তবুও স্বপ্ন দেখে, টাকার পাহাড়ে উঠে পাউট করে সেলফি তুলছে।

যার ঘরের চালে হাজার ফুটো, পান্তা জুটলেও নুনের অভাব। সেও চায়, নুন জুটবে একদিন। চালের ফুটো বুজে যাবে ঢালাই ছাদে। বাড়ি হবে উঁচু, আরও উঁচু। সেই বাড়ির ছাদে বসে দূর আকাশের চাঁদটা মনে হবে কত কাছে, হাত বাড়ালেই ধরে ফেলবে!

অথচ এই ছেলেটা! দেখো কেমন ডবকা ঘুম। ঘুমের ঠেলায় পাশ পর্যন্ত ফিরতে চায় না। এই কচি বয়সেই দেখো কেমন নিশ্চিন্তি! যেন এখানেই থেমে থাকবে সে। যেন কোনোদিন ওর বিয়ে হবে না, সংসার বাড়বে না, বেশি টাকা রোজগার করতে হবে না। আশ্চর্য ছেলে বটে। একবারের জন্যও ডাকলো না আমাকে! এই যে রাশি রাশি স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, চাইলেই যত্ন করে বসিয়ে দেবো দু'চোখের পাতায়, কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই! মাঝে মাঝে নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করে, এই পৃথিবীর মানুষই তো এটা, অন্য কোনো গ্রহের নয় তো! নাহ, আর সহ্য করা যায় না। কিছু একটা করতে হবে। যেকোনো ভাবেই হোক কিছু স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিতে হবে ওর মধ্যে। স্বপ্ন বিহীন থাকবে কেন কেউ? স্বপ্ন ছাড়া বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়? এই তো, রাত শেষের পথে। পাতলা হবে হয়তো ওর ঘুম কিছুটা। এই সময়েই টুক করে গোটাকয় স্বপ্ন দিয়ে দিতে হবে ওর চোখের পাতা জুড়ে। কিন্তু দিতে আর পারি কই? ঘুম এত গভীর, স্বপ্ন নেয়ার জন্য তৈরিই হয় না সে। যেসব সময় মনে হয় ঘুম একটু পাতলা হবো হবো, আমি তৈরি স্বপ্ন দেয়ার জন্য, অমনি শুনি নাক ডাকার শব্দ।

মেজাজটাই খিচড়ে যায় একেবারে। মাসখানেক ধরে সন্ধ্যে হয়ে এলেই সব কাজ ফেলে ছুটে আসি এই উজবুকটার ঘরে। প্রতিরাতেই একবুক আশা নিয়ে বসে থাকি, এটা ওটা করে সময় কাটাই। খবরের কাগজও উল্টেপাল্টে দেখি। কী সব খুনখারাবি, ধর্ষণ, দুর্ঘটনা..... পাতায় পাতায় কেবল রক্তারক্তি কাণ্ড। মানুষ পারেও বটে! এই মানুষই আবার স্বপ্ন দেখে। আর যত্ন করে সেই স্বপ্নগুলো বিলিয়ে যাচ্ছি কিনা আমিই, এই অধম! যাইহোক, সন্তুষ্টি আসুক বা না আসুক, স্বপ্ন দেখতেই চায় সবাই। আমিও আমার কাজে কোনো ঘাটতি রাখি না। রাখতে চাইও না। কিন্তু এই ছেলেটা.... এই ছেলেটাকেই কায়দা করতে পারছি না যে কোনোভাবেই!

৩.
কিছু একটা বিসদৃশ লাগছে যেন। ঘরের কোণে ছোট্ট বুকশেলফটার দিকে তাকিয়ে এমনই মনে হলো বাদলের । প্রিয় কিছু বই আছে ওতে। আর আছে চাকরি পাওয়ার জন্য কিছু বই পুস্তক। অবশ্য ওগুলো আর ছুঁয়েই দেখে না বাদল। ঢাকা শহরে চাকরির খোঁজে এসে প্রথম কিছুদিন খুব পড়াশোনা করতো, তখনকার বই ওগুলো। বিরক্ত হয়ে যখন চাকরি খোঁজা বন্ধ করে টিউশনি শুরু করলো তখন থেকেই ওগুলো স্পর্শ করে না আর। চাকরি না হোক, টিউশনি তো আছে! আগে পিছে কেউ নেই, নিজের পেট কোনোমতে চলে গেলেই হলো। এতিমখানায় বেড়ে ওঠা বাদলের ওটাই যথেষ্ট। কোনোরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই মেসের এই ঘরখানা। কোনো শখ আহ্লাদ নেই, বিড়ি সিগারেটও খায় না। তবে কে জানে কেন খবরের কাগজটা প্রতিদিন নেয়। কোনোদিন চোখ বোলায় কোনোদিন বোলায় না। বুকশেলফ এর উপরের তাকে জায়গা হয় তাদের। ছোট ঘর, একা মানুষ, জিনিসপত্র তেমন কিছুই নেই। যা আছে পরিপাটি করে গুছানো। সেই গুছানো বুকশেলফটাই কেমন যেন এলোমেলো লাগছে আজ। খবরের কাগজের ওপর চোখ পড়তেই দেখলো, দু'তিনটে কাগজ এদিক ওদিক। মনে মনে ভাবলো, এমন হলো কেন? তখনই রাতের খবরের কাগজ ওলটানোর মতো শব্দের কথাটা মনে পড়ে গেলো হঠাৎ।

একলা ঘর, অন্ধকার রাত, ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে বাদল বিছানায়। এমন সময়ে কে ওলটাবে খবরের কাগজ? অশরীরী কেউ?

ধুর! কী সব ভাবছে সে ওলটপালট। একা থেকে থেকে মাথাটাই গ্যাছে তার। কারো সাথে তো মেশেও না তেমন। ওর ঘরের পাশে বাথরুম, তার ওপাশে যে ঘর সে ঘরের লোকটির সাথে কথা হয় মাঝে মধ্যে। কুদ্দুস আলী, বেশ মজার লোক। নানা বিষয়ে তার জ্ঞানের শেষ নেই। বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে বসে হকারি করে ওষুধ বিক্রি করে। এমন কোনো রোগ নেই যার ওষুধ নেই তার কাছে। ক্যান্সার, হাঁপানি, ডায়াবেটিস সহ সকল জটিল রোগের চিকিৎসায় একেবারে অব্যর্থ তার ওষুধ। আর যৌনরোগে তার ওষুধ সেবনে উপকার পায়নি এমন মানুষ নাকি খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। তো এই লোকের সাথে কথা হয় প্রায়ই। কেন যেন মনে হয় লোকটা তার মতো একা, আগেপিছে কেউ নেই তার। এছাড়া মেসের আর কারো সাথেই কথা বলে না বাদল। সেই লোকও তো গতসন্ধ্যায় আসেনি তার ঘরে! তাহলে কি বাদলই ? হতেও পারে। এলোমেলো বুকশেলফটার কথা ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরোতেই দেখা কুদ্দুস আলীর সাথে।

পানখাওয়া দাঁত বের করে বললো, আরে বাদল ভাই , কই যান? মুখটা কেমন যেন ভার ভার লাগে। অবশ্য আপনার মুখে হাসি বড় একটা দেখি না। কিন্তু যখন হাসেন, কী যে সুফি ভাব আসে আপনের চেহারায়! বুঝলেন ভাইজান, হাসি হলো আল্লার দান। হাসবেন, মন খুইলা হাসবেন। দেখবেন মন হালকা হবে।

জি, হাসবো। কেমন আছেন?

আলহামদোলিল্লাহ্ ভালো আছি । তয় আপনার কি মন খারাপ?

মন খারাপেরও ওষুধ আছে নাকি আপনার কাছে?

আছে আছে, অবশ্যই আছে।

তাই নাকি? কী ওষুধ? বলে হাসতে লাগলো বাদল।

কুদ্দুস আলী বললো, হেসে উড়িয়ে দিলেন ভাই। আসলেই আছে ওষুধ। বলি?

বলেন?

বিয়া করেন একটা। বিয়া করলে দেখবেন মনটা ফুরফুরা লাগবে। আমারও লাগতো। তারপর.......

তারপর? কৌতূহলী চোখে কুদ্দুস আলীকে দেখতে লাগলো বাদল। লক্ষ্য করলো, হঠাৎ করে লোকটার হাসি হাসি মুখটায় বেদনা ভর করেছে যেন। বললো, কী হলো কুদ্দুস সাহেব, তারপর?

নাহ বাদল ভাই, এখন যাই। আইজ তো শুক্রবার, তাড়াতাড়ি গিয়া জায়গা ধরতে হবে। নাইলে অন্য কেউ দখল কইরা নিবো।

যাই বাদল ভাই!

হনহন করে চলে গেলো লোকটা।

কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বাদল কুদ্দুস আলীর যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ। মনটা তার উদাস হয়ে উঠলো।

শুক্রবার আজ। ছুটির দিন। টিউশনির তাড়া নেই। নিজের ঘরে ফিরে এলো বাদল। মাথা থেকে বুকশেলফ এর চিন্তাটা যায়নি এখনও। সাথে যোগ হয়েছে কুদ্দুস আলীর অসমাপ্ত কথার রেশ। বাদল ভেবেছিলো একা মানুষ লোকটা, চিন্তা ভাবনা নেই কোনো, তাই সবসময় আনন্দে থাকে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তার মনের গভীরে কোনো দুঃখ গেঁথে আছে। আসলে ওপর থেকে দেখে আমরা কি বুঝতে পারি সব? পারি না। তাছাড়া, মানুষের মনের খবর জানার চেষ্টাও করি কি আমরা? ওপর ওপর মিশি, সুবিধায় পাশে থাকি, অসুবিধেয় সটকে পড়ি। আসলে কোনো দায় নিতে চাই না আমরা। নিজের কষ্ট নিয়েই ব্যস্ত আমরা, কারো দিকে নজর দেয়ার সময় কোথায়? এই যে পাশের ঘরের লোকটা, দেখেছে সে একা মানুষ, কোনোদিন কি জানতে চেয়েছে বাদল, বাড়ি কোথায় তার? কিংবা বাড়িতে কে কে আছে? চায়নি। অথচ প্রায় তিনবছর ধরে পাশাপাশি ঘরে বাস করছে তারা। নাহ, আজই জানতে চাইবে বাদল। কুদ্দুস আলীকে আজই জিজ্ঞেস করবে কী কষ্ট তার মনে?

৪.
সেই কখন থেকে গল্প করছে তো করছেই । অন্যদিন তো এতক্ষণ ঘুমানোর জন্য অস্থির হয়ে যায় উজবুকটা। আজ আবার পাশের ঘরের আধবুড়ো হকারটাকে জুটিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছে! একেবারে যা তা! গল্প করবি কর, তা রাতে কেন? রাত এসেছে, চুপটি করে ঘুমো বাবা। তা না, গল্পে মেতেছেন উনি। আর গল্পে মেতেছেন কার সাথে? না, আধবুড়ো এক হকারের সাথে! তোর বয়সী কারো সাথে গল্প করলে কী এমন হতো? অন্তত তাদের স্বপ্নময় জীবনের কথা শুনে হয়তো কিছুটা ঘোর লাগতো চোখে। হয়তো মনের ভুলে স্বপ্নের পথে পা বাড়াতি ! আটাশ বছরের টগবগে তরুণ তুই, ওই আধবুড়োর পোড়খাওয়া স্বপ্ন কি আর তোকে জাগাতে পারবে? যে স্বপ্নগুলো দেয়া হয়েছিলো ওকে তার একটাও তো সফল করতে পারেনি সে। এখন হাহাকার করে, নতুন স্বপ্ন চায়, ফিরে যেতে চায় অতীতে। অতীতের সমস্ত ভুল নাকি সে শুধরে নেবে। জীবন সাজাবে নতুন করে। তা কি হয়? যে সময় যায় তা কি আর ফিরে আসে? হাহাকার করলেও ফেরে না অতীত। ভুলগুলো ভুলই থেকে যায়।

এই যাহ্‌! ওদের দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে পা টা একটু হড়কে গেলো। আর পায়ের সামনেই ছিলো পলিথিনে মোড়ানো কিছু একটা। পায়ে লেগে খচমচ শব্দ হতেই চমকে তাকালো দু'জন আমার দিকে। অবশ্য তাকালেই কী! দেখতে তো আর পাবে না। কিন্তু বাদলের দৃষ্টিজুড়ে কেমন এক সন্দেহের তীর। এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন দেখতে পাচ্ছে আমাকে। অল্প সময়, তারপর আবার গল্পে ফিরে গেলো ওরা।

কুদ্দুস আলীর জীবনের কাহিনী শুনছে বাদল গভীর মনোযোগে। হকারের বিয়ে, বিয়ের পর একটি পরীর মতো মেয়েও হয়েছিলো তার। তার স্ত্রীর রূপ পেয়েছিলো মেয়েটি। স্ত্রী তার বড় রূপসী ছিলো। রূপের গরমও ছিলো খুব। কুদ্দুসের মতো ভিখিরির সাথে নাকি তার কপালদোষে বিয়ে হয়েছে। সারাক্ষণ খিচখিচ লেগেই থাকতো সংসারে। কোলের বাচ্চাটাকে রেখে একদিন এক ট্রাক ড্রাইভারের সাথে পালিয়ে গেলো সেই রূপসী। কুদ্দুস আলী একবছর বয়সের মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে। কুদ্দুসের বুড়ি মা ও একদিন মরে গেলো হঠাৎ করে। খেয়ে না খেয়ে মেয়েকে বড় করে তুললো কুদ্দুস আলী। মেয়ে যখন একটু বড় হলো, একলা মেয়েকে বাড়িতে রেখে হাটে বাজারে ওষুধ বিক্রি করে। স্কুলে যায় মেয়ে। একদিন সাঁঝের মুখে বাড়ি ফিরে দেখে মেয়ে বমি করছে। ডাক্তার বললো, পেটে বাচ্চা। এসব কথা বাতাসে ভেসে জেনে গেলো গাঁয়ের লোকজন। বিচার বসলো, অপমানের চূড়ান্ত। মেয়েটা একদিন গলায় দড়ি দিয়ে মরে গেলো। কুদ্দুস আলী চলে এলো ঢাকায়।

জীবনের এসব ঘটনা বাদলকে বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো লোকটা। বাদলের চোখও ছলছল করছে। আমারও খারাপ লাগছে খুব। কাঁদতে কাঁদতে আধবুড়ো লোকটা বলতে লাগলো বাদলকে, জানেন বাদল ভাই, ভুল কিছু আমারও ছিলো। ভিখিরি মানুষ, কী দরকার ছিলো অমন রূপসীকে বিয়ে করার? কী দরকার ছিলো সোমত্ত মেয়েকে একলা ঘরে রেখে হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ানির? জীবনটাই আমার ভুলে ভরা। আসলে গরিবের বোধহয় সবই ভুল।

বাদলের হাতটা চেপে ধরে বললো কুদ্দুস আলী, আপনার মনটা খারাপ কইরা দিলাম ভাই। মাফ দিয়েন। যাই এখন। ঘুমান আপনি। চোকি থেকে উঠে ধীরে ধীরে চলে গেলো লোকটা। বাদলও বেরোলো বাথরুমে যাওয়ার জন্য। এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো।

ঘরের জানালাটা খোলাই আছে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়েছে চোকিতে শোয়া বাদলের গায়ের ওপর। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাদল মায়াবী জ্যোৎস্নার দিকে। মনটা বড় বেশি খারাপ আজ তার। জীবনে প্রথমবার হয়তো নির্ঘুম রাত কাটাবে সে।

বিছানার পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসে আছি আমি। যে কিনা লাল, নীল, হলদে, বেগুনী, সবুজ সব রঙের স্বপ্ন বিলিয়ে বেড়াই ঘুমন্ত মানুষের চোখের পাতায়। আজ, এই রাতে আমারও মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত। স্বপ্ন চাষ করি আমি, এটুকুই আমার কাজ। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলোকে সার্থক করতে পারি না আমি। যদি পারতাম, যদি সেই ক্ষমতা থাকতো আমার! মাঝে মাঝে ভাবি এমন কথা। কিন্তু আবার এটাও তো ঠিক, কোনো মানুষ যখন নিজের চেষ্টায় একটি স্বপ্ন সফল করে তোলে, তখন তার মনে যে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়, সেই আনন্দ থেকে তাকে বঞ্চিত করার অধিকার তো কারোরই নেই। পাক মানুষ কিছু স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেয়ার আনন্দ নিজের চেষ্টায়। আমি শুধু স্বপ্ন বুনেই আনন্দে থাকি।

এপাশ ওপাশ করতে করতে বোধহয় ঘুমালো ছেলেটা। তবে ঘুমের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ছে মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝেই উসখুস করে উঠছে সে। অস্থির হয়ে আছে চিত্ত তার। এই চিত্তচাঞ্চল্য কাজে লাগাতে হবে। দেরি করা যাবে না। আমি বসলাম শিয়রে তার। এতদিনের পরিশ্রম বোধহয় সার্থক হতে চলেছে আমার। আমার মুঠোয় পুরে রাখা নানারঙের কিছু স্বপ্ন ছড়িয়ে দিলাম তার দু'চোখের পাতায়। স্বপ্নগুলো থেকে একটা অপার্থিব আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়লো পুরো ঘরে।
জ্যোৎস্নার মায়াবী আলো আর স্বপ্নের স্বপ্নময় আলো মিলেমিশে একাকার। মৃদু কেঁপে উঠলো বাদল। তারপরেই তার মুখটা ভরে গেলো প্রশান্তিতে। মিটি মিটি হাসছে সে।

৫.
একটা অচেনা জায়গা। ভীষণ অচেনা। একটা বাড়ি। উঠোনে ভাপানো ধান মেলে দেয়া। একঝাঁক কবুতর উড়ে এসে বসলো তাতে। ঠোঁট দিয়ে খুঁটে নিচ্ছে পাকা ধান। ঘরের দাওয়ায় লাঠি হাতে দু'পা সামনে ছড়িয়ে বসে আছে এক অল্পবয়সী মহিলা। পরনে তার গাঢ় সবুজ শাড়ি, পিঠে খোলা চুল। ছড়ানো পায়ের মাঝামাঝি পাঁচ ছ'মাসের একটা বাচ্চা হাত পা নেড়ে খেলছে, হাসছে। সেই মহিলা কথা বলছে পায়ের ওপর খেলা করা বাচ্চার সাথে অনর্গল।

কথা বলছে আর আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে তার বাচ্চাকে। কী যে মায়া লাগছে দেখে। কেন যেন বাদলের মনে হলো ওই বাচ্চাটিই সে, আর ওই মহিলা ওর মা। সে গিয়ে দাঁড়ালো মহিলার সামনে। দেখলো, মহিলার পায়ের ওপর খেলা করা বাচ্চাটি নেই সেখানে। মহিলা অস্থির হয়ে খুঁজছে বাচ্চাটাকে। বাদল বললো, আপনি কি আমাকেই খুঁজছেন?

মহিলা অবাক হয়ে বাদলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি কে?

বাদল বললো, আমি আপনার ছেলে, বাদল।

সন্দেহের চোখে বাদলকে দেখতে লাগলো সে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ধীরে ধীরে চোখ তার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। দু'হাতে বাদলকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ, বাদল.......তুইই তো আমার ছেলে। আমার হারানো ধন! আনন্দে দিশেহারা হলো সে, দিশেহারা হলো বাদলও, মায়ের মমতায়!

৬.
পর পর কয়েক রাত অনবরত স্বপ্ন দেখে চলেছে বাদল। নতুন নতুন স্বপ্নের বায়নায় আমি অস্থির এখন। গতরাতে এক সুন্দরী মেয়ের স্বপ্ন দিয়েছি ওর চোখে। আজ সারাদিন মনে মনে খুঁজেছে সে অমন মেয়ে। উঁকিঝুঁকি দিয়েছে লেডিস হোস্টেলের আশেপাশেও।

চাকরি একটা পেতেই হবে তাকে। যে সে চাকরি নয়, ভালো চাকরি। মাস্টার্স পাশ করেছে সে। যোগ্যতা তো কিছু কম নেই তার? আসলে সে চেষ্টা করেনি জোরেশোরে। এবার করবে। মন দিয়েই করবে। দু'টো টিউশনি বাদ দিয়ে বিকেলের আগেই ঘরে ফিরেছে আজ সে। ফিরে বইপত্রগুলো নিয়ে নতুন উদ্যমে পড়া শুরু করেছে বাদল।

বেশ লাগছে আমার।

আজ রাতে নিশ্চয়ই আবার স্বপ্নে দেখতে চাইবে মেয়েটাকে। হয়তো কোনো এক নাম না জানা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে দেবে একটা লাল গোলাপ মেয়েটির হাতে।দেবো, আজ রাতেও দেবো আমি মায়াবী সেই স্বপ্নটা বাদল নামের উজবুকটার দু'চোখ জুড়ে।

আমি যে স্বপ্নচাষী। নতুন নতুন জমিতে স্বপ্নের ফসল ফলানোই যে আমার কাজ।

আপনার মন্তব্য