রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯ ইং

সুখকেদারা এবং অতসীপ্রেম

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৪-১৭ ২৩:২২:৪৯

রেহানা বীথি:

এ বাড়িতে যেদিন আসি, সেদিন যৌবনে প্রথম পা রেখেছিলাম আমি। সর্বাঙ্গ আমার রূপ ঝলমল, পেলব মসৃণতায় যে কারো চোখের দৃষ্টি পিছলে যাবে। আর হাত তো বটেই। গা থেকে আমার একটু ঝাঁঝালো কিন্তু মোটেও উৎকট নয় এমন একটা গন্ধ ভুরভুর করে ছড়িয়ে পড়ছিলো বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত।

জন্ম হয়েছিলো আমার এ বাড়িতে আসার ঠিক একমাস আগে। সবার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মাত্র একমাসেই যৌবনপ্রাপ্তি? দেখুন, এত কৌতূহল যদিও আমার পছন্দ নয়, তবুও বলি, হ্যাঁ মাত্র এক মাসেই। তার আগে একটা বেশ মোটাসোটা সেগুন নামধারী বৃক্ষের কয়েক টুকরো কাঠ হয়ে কাঠমিস্ত্রির দোকানের এক কোণে অযত্ন অবহেলায় পড়েছিলাম। ভীষণ মন খারাপ হতো জানেন? হবে না, অবহেলা সহ্য করার একটা সীমা তো আছে! উইপোকা খাবো খাবো করছে, ঠিক এমন সময়ে হঠাৎ এলো এক সুখবর। গাঁয়ের সবচাইতে ধনী যে পরিবার, তার ছোট ছেলের জন্য একটা ইজিচেয়ার দরকার। শহরে লেখাপড়া করে বড় হওয়া সেই ছেলের নাকি শহর আর ভাল্লাগে না। গাঁয়েই থাকবেন এখন থেকে তিনি, সুন্দরী বউটিকে নিয়ে। যাক সে কথা, এই খবর শুনে মনে বড় আনন্দ হয়েছিলো আমার। বেকার পড়ে না থেকে কোনো কাজে তো লাগবো! কারো কাজেই যদি না লাগলাম, জীবনের কোনো দাম থাকে বলুন?

শহুরে সেই ছেলে এসে মিস্ত্রিকে খুব করে বুঝিয়ে দিলেন, ঠিক কেমনটি তার চাই। মিস্ত্রিও সেই মোতাবেক যথাসাধ্য মনপ্রাণ ঢেলে তৈরি করতে লাগলো আমাকে। প্রায় শেষ করে ফেলেছে, এমন সময় বেদম জ্বরে পড়ে কয়েকদিন কাজ করতে পারলো না সে। চারটে পায়ার কারুকাজ আর হাতলের লতাপাতার নক্সাগুলোতে একটু ফিনিশিং বাকি। সবশেষে দামী রেক্সিনের গদি আর বার্ণিশ, ব্যস। কিন্তু ওই জ্বরেই পিছিয়ে দিলো। নইলে আমার যৌবনপ্রাপ্ত হতে একমাস লাগতোই না!

মনে মনে একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে চলে এলাম এ বাড়িতে। মানে, আমাকে আনা হলো আর কী। বাড়িতে এসেই তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। কী বিশাল বাড়ি রে বাবা! একটু পুরোনো, কিন্তু বেশ খানদানী বাড়ি। কত লোকজন! গাঁয়ের বাড়ি হলেও শহুরে সবরকম সুযোগ সুবিধা বিরাজমান। বাড়ির ছোটছেলের লাইব্রেরী রুমে রাখা হলো আমাকে। ঘরের দক্ষিণ দিকে যে জানালা, দিগভ্রান্ত হাওয়ারা লুটোপুটি খেয়ে সারা ঘরময় খেলে বেড়ায় যে পথ দিয়ে এসে, সেই জানালার পাশেই স্থান পেলাম। জানালার ওপারে ঘন জঙ্গল, তার ওপারে কুলকুল করে বয়ে চলেছে নদী। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেলো। এ বাড়ির ছোট ছেলে অর্থাৎ আমার মালিক আমাকে পেয়ে পরম মমতায় আমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে বললেন, দারুণ বানিয়েছে তো! কী চকচক করছে! এখন থেকে এই জানালার ধারে হাওয়া খেতে খেতে বেশ বই পড়া যাবে। বলে আলমারি থেকে চওড়া একটা বই বের করে আমার কোলে বসে পিঠে হেলান দিয়ে পড়তে লাগলেন। পড়ছেন, কখনও একটু এপাশ ওপাশ করছেন, আবার কখনও বা আমার চ্যাপ্টা হাতলে হাত রেখে গভীর চিন্তায় মগ্ন হচ্ছেন। এভাবেই কেটে যেতে লাগলো একেকটি দিন, একেকটি রাত। আমার মালিক ছাড়া এঘরে তেমন কেউ আসে না। সকালে একবার কাজের মেয়ে এসে ঘরটর পরিষ্কার করে রেখে যায়, সাথে আমাকেও। সকাল বিকেল মালিকের সুন্দরী বউ এসে চা দিয়ে যান। কোনোকিছুর প্রয়োজন আছে কি না জিজ্ঞেস করেন। ব্যস ওটুকুই। কেন যেন মনটার মধ্যে একটু খচখচ করে। এ কেমন স্বামী স্ত্রী রে বাবা! কোনো ভাব ভালোবাসার কথাই নেই! শুনেছি বড়লোকেরা নাকি একটু গম্ভীর হয়, তা বলে এত! এমন কিছু বয়সও হয়নি তাদের যে প্রেমভাবটা কমে গেছে। তারওপর তো আবার ছেলেপুলেও হয়নি শুনেছি। তবে? কেন এমন দূর দূর ভাব?

চৈত্রের দুপুর, খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। জানালা দিয়ে ওই জঙ্গল পেরিয়ে নদীর দিকে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার মালিক। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে। কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো এসে বসলেন আমার কোলে। দু'হাতে মুখ ঢেকে বললেন, আমি পারছিনা অতসী, তোমাকে ভুলে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

ভারী চিন্তার কথা, কে এই অতসী? যতদূর জানি, মালিকের বউয়ের নাম তো ওটা নয়! যেন একটা ঘোরের মধ্যে উনি বলে চলেছেন,

তুমি এসো, তুমি এসো অতসী আমার কাছে। নইলে যে আমি বাঁচবো না! আমি শুধু তোমার কারণে এখানে এসেছি। তোমাকে সবসময় আমার চোখের সামনে রাখবো বলে। এখন তুমি দূরে সরে যাচ্ছো?

আচ্ছা মুশকিল! এ আবার কী রে বাবা! মালিকের অসহায় অবস্থা দেখে মায়াও লাগছে আবার রাগও হচ্ছে। নিজের বউ ছেড়ে উনি আবার কার জন্য হাহাকার করছেন? যাই হোক, এঘরে অতসী না আসা পর্যন্ত বিষয়টা খোলাসা হচ্ছে না। আমার মনের কথা বোধকরি অতসী শুনতে পেয়েছিলো। ছিপছিপে গড়ন, পিঠময় অবিন্যস্ত খোলা চুল আর একখানা মায়াভরা মুখ নিয়ে সন্তর্পণে, চুপি চুপি এসে দরজায় দাঁড়াতেই আমার মালিক বললেন, তুমি....তুমি এসেছো অতসী! বলেই এ ঝটকায় তাকে ঘরের ভেতর টেনে এনে দরজা বন্ধ করে দিলেন। নিবিড়ভাবে অতসীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি শুধু তোমাকেই চাই অতসী! তোমার জন্য চাকরি ছেড়ে, শহর ছেড়ে চলে এলাম। কিন্তু তুমিই আমাকে পর করে দিতে চাইছো? বলছো ভুলে যেতে?

শহরে থাকতেও তো ছুটি পেলেই ছুটে এসেছি তোমার কাছে। বিয়ে করেছি কোন পরিস্থিতিতে, কেনই বা তোমার কথা বলতে পারিনি কাউকে সবই তো তুমি বোঝো। কেন তবে এমন হয়ে গেছো তুমি?

-- কেন এমন করছি বোঝো না তুমি? এভাবে আর কতদিন?

-- যতদিন বাঁচবো।

-- তা হয় না। আশ্রিত আমি তোমাদের বাড়ির। বাবা মারা যাবার পর দয়া করে থাকতে দিয়েছিলেন তোমার বাবা আমাকে আর মা কে। কয়েকজন কাজের মেয়ের একজন ছিলো আমার মা তোমাদের বাড়ির। ভিন্ন ধর্মের হওয়ার পরেও আশ্রয় পেয়েছি বাড়ির এককোণে। লেখাপড়া, গাঁয়ের স্কুলে আমার মাস্টারি সবই তোমাদের দয়ায়। আমার কারণে তোমাদের কোনো ক্ষতি হোক তা আমি চাইতে পারি?

-- তোমার কারণে ক্ষতি হবে কেন? কোনো ক্ষতি হবে না।কেউ জানবে না অতসী!

-- নিজের স্ত্রীর প্রতি উদাসীন তুমি আমার কারণে। কিন্তু তার তো কোনো অপরাধ নেই! কেন আমাদের সম্পর্কের প্রভাব পড়বে তার ওপর? স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই তার সাথে তোমার, কষ্ট পায় সে, সেটা তাকে দেখেই বোঝা যায়। নিজেকে অপরাধী লাগে খুব তার মুখের দিকে তাকালেই। এখন তুমিই বলো, আমাদের কারণে কেউ কষ্ট পাক, নষ্ট হয়ে যাক কারো জীবন, এমনটা হওয়া উচিত?

-- না, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা? আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে তুমি? ভালোবাসো না তুমি আমাকে?

-- ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই দূরে সরে যেতে চাইছি। ভালোবাসি বলেই চাই, তুমি সুখী হও, সুখী করো তোমার বউকে।

-- আর তুমি?

-- জানি না, হয়তো বিয়ে করবো কিংবা করবো না। হয়তো হারিয়ে যাবো, হয়তো...... নাহ, ভেবো না, বেঁচে থাকবো। আমার মতো করে বেঁচে থাকবো। হয়তো এ গাঁয়েই, কিংবা হয়তো দূরে কোথাও!

পেরিয়ে গেছে বিশটি বছর! জানালার ধারে তেমনই আছি আমি। ফিকে হয়েছে গায়ের রঙ, চাকচিক্য নেই আর আগের মতো। গদিটা মেরামত করা হয়েছে বেশ অনেকদিন আগে। থরে থরে সাজানো বই নিয়ে আলমারিগুলো তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। চিকন সোনালী ফ্রেমের চশমা চোখে একজোড়া উদাসী চোখ জানালার ওপারে নদীটার বয়ে চলা দেখে আর হারিয়ে যায় অতীতের প্রেমস্পর্শে। একটু কি শিহরণ খেলে যায় শরীর মনে এতবছর পরেও! কোথায় আছে অতসী এখন? বদলী নিয়ে চলে গেছিলো সেই তো শেষ কথা হওয়ার কয়েকদিন পরেই। জানায়নি তার ঠিকানা। ইচ্ছে করলে আমার মালিকের পক্ষে ঠিকানা জোগাড় করা অসাধ্য ছিলো না। কিন্তু সে চেষ্টা তিনি করেননি। কিছুদিন যেন একেবারে পাথর হয়ে গেছিলেন। কখনও কখনও হাতে বই নিয়ে আমার কোলে বসে থাকতেন নিশ্চুপ। তবে ওই পর্যন্তই! বইয়ের একটি পাতাও উল্টে দেখতেন না। ভালোবাসা হারিয়ে কেউ যে এতটা ভেঙ্গে পড়তে পারে আগে বুঝিনি। কাষ্ঠময় এ জীবন আমার, বুঝবো কী করে! ভাগ্যিস আমার মালিক দয়া করে আমাকে এ বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিলেন তার এই নির্জন ঘরখানাতে। তাই তো আজ বুঝলাম, সবসময় পাওয়াতেই নয়, কখনও কখনও হারানোতেও প্রেমের সৌন্দর্যটুকু থাকে।

সে যাই হোক, সেই যে অতসীর চলে যাওয়া, সেই বেদনার পাথরটা হৃদয়ের ওপর থেকে সরাতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিলো আমার মালিকের। তারপর ধীরে ধীরে সয়ে গেছিলো। চেহারার দৈন্যদশাও কাটিয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে। স্ত্রীর সাথে শীতল সম্পর্কও উষ্ণতার ছোঁয়া পেলো। একটি মায়াবতী কন্যা এলো তাদের ঘর আলো করে। স্বামী স্ত্রীর দূরত্বটা যেন অনেক কমে গেলো কন্যার আগমনে।

তবুও মাঝে মাঝে উদাস হয় তো মন! এই যেমন এখন, জানালায় উদাস দৃষ্টি, ওপাশের জঙ্গল, নদী পেরিয়ে যেন কোন অজানায় খুঁজে চলেছে সেই সে অতসী! যেন খুঁজে চলেছে সেই সে অতসীপ্রেম!

আপনার মন্তব্য