বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ ইং

ফেরা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৫-১৬ ২১:২৫:০১

রেহানা বীথি:

রহস্যময় অন্ধকার রাত। মিটমিটে জোনাকির আলো ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। মাথার উপরে তারাভরা খোলা আকাশ। ঠিক যেন এক আকাশ জোনাকি। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা আওয়াজ, নিঝুম এই রাতের রহস্যময়তাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। নদীর একেবারে ধার দিয়ে বয়ে চলেছে ডিঙি নৌকাটা। সুজয়ের ছায়ামূর্তি অনড় বসে আছে নৌকায়। মাঝি দাঁড় টেনে চলেছে....ছপ্ ছপ্ ছপ্...

ফস করে দেশলাই জ্বালানোর শব্দ হলো। লাল আলোয় আঁধারের বুকে একটি ঘামেভেজা তেলতেলে মুখের ছবি ভেসে উঠলো। দৃঢ়তায় ভরা একটি মুখ। এক মুহূর্ত, তারপর আবার আঁধারে তলিয়ে গেলো মুখটি, ছায়া হয়ে। একঝলক এলোমেলো হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেলো যেন। পাটাতনের ওপর এলিয়ে পড়লো সুজয়ের শরীর পরম আবেশে।

বাউকুমঠা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে, ওরে ... হঠাৎ গেয়ে উঠলো মাঝি। নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান। ধমকে উঠলো সুজয় চাপা গলায়। গান গাওয়ার আর সময় পেলি না? থাম বলছি! আবার থমথমে সব। নদীর পাশের গ্রামটি ঘুমিয়ে গেছে চুপটি করে, সেই কখন! তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা এই নদীর বুকে ছপ্ ছপ্ দাঁড় টানা ডিঙিটার সাধ্য কী, ভাঙায় সে ঘুম!

নৌকার ধাক্কায় তৈরি হওয়া ছোট ছোট ঢেউগুলো থেকে থেকে ফণা তুলছে সাপের মতো। তবে বড় লাজুক সেই ফণা। একটুতেই গলে জল। নদীর পাড় ধরে যতদূর চোখ যায় ঘন গাছপালা। নিকষ আঁধার এই রাতে একটা থেকে আরেকটা আলাদা করা যায় না তাদের। গভীর কালো পাহাড়ের মতো মিশে আছে এই আঁধার রাতের শরীরে, নদীর জলে ছায়া হয়ে। দূর নক্ষত্রের মিটমিটে আলোয় চিকচিকে সর্পিল কালো জলের দিকে তন্ময় তাকিয়ে সুজয়ের চোখও যেন চিকচিক করছে কোনো স্বপ্নআবেশে। সংসারের মায়াজাল হয়তো। কিন্তু তা কি করে হয়? ও তো ছিন্ন করেছে সেই মায়াজাল! সাথে জুটেছে এই জয়নাল, খেটে খাওয়া পেশিবহুল দু'হাতে শক্ত করে ধরেছে যে নৌকার বৈঠা। জীবনের বৈঠা কেন যেন ধরতে পারেনি তেমন শক্ত করে! হেরে গেছে। যেমন হেরে গেছে সুজয়। তীক্ষ্ণ হাসির শব্দ ভেসে এলো ঘন গাছের ভেতর থেকে। অন্ধকার রাতগুলোতে এমন ভয়ানক আতঙ্ক ছড়ানো হাসির মতো শব্দ করেই ডেকে ওঠে যেন কোন সে পাখি! জানে ওরা, তবুও এই নিস্তব্ধ রাতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো ওদের। মনে হলো আতঙ্কের চেয়ে বেশি করে উপহাস ছড়িয়ে দিচ্ছে হাসিটা ওদের প্রতি। পাখিটা কি জেনে গেছে ওদের উদ্দেশ্য?

মাঝনদীতে ডুবে যাবে ওরা আজ। এই নিকষ অন্ধকার রাতে বিসর্জন দেবে দু'টি প্রাণ নিজেদেরকে। কোনো মায়া নেই, নেই কোনো পিছুটান। সুজয় আর জয়নাল, আজ বাঁধা পড়েছে অভিন্ন এক ইচ্ছের কাছে। বেছে নিয়েছে তারাভরা এই রাতটিকে। বেছে নিয়েছে জনারণ্য থেকে বহুদূরের এই জল থৈ থৈ নদীটাকে। ভাদ্রের কাছে রেখে যাওয়া শ্রাবণের অথৈ জলরাশির মাঝে ওরা হারিয়ে যাবে আজ ইচ্ছে করেই। হয়তো ভেসে উঠবে প্রাণহীন হয়ে এখানেই কিংবা আর একটু দূরে! কিংবা হয়তো অনেকটা দূরে, নাম না জানা কোনো মোহনায় ভেসে উঠবে নামহীন হয়ে। ধুর! যাই হোক না কেন, ভাববে না আর ওসব নিয়ে। ভাইজান, ঘুমায়া পড়লেন নাকি? মনে লয় মাঝগাঙের কাছাকাছি আইসা পড়সি। আর যা আন্ধার রাইত, কাকপক্ষীতেও টের পাইবো না।

এটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে? এই যে এমন ভরা নদীতে আত্মহত্যা! যেকোনো ভাবে, যে কোনো জায়গাতেই তো দিতে পারতো নিজের প্রাণ। বিষ, কিংবা নিজের ঘরে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়া! এই নদীতে, এক আসমান তারার নীচে, ভাদ্রের গরমে তামা তামা রাতের কাছে এসে কেন? তাও আবার সঙ্গী জুটিয়ে, যে সঙ্গী কিনা আত্মহত্যা করতে এসে গেয়ে ওঠে গলা ছেড়ে! কিভাবে যেন ভাব হয়ে যায় জয়নালের সাথে। মাসছয়েক ধরে চরমে ওঠা অশান্তি নিয়ে কখনও কখনও শহর ছেড়ে গাড়ি ছুটিয়ে সুজয় এই নদীর কাছে এসে বসতো। বিকেলে এসে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায় তার। কখনও একটু বেশি রাত। মাথার উষ্কখুষ্ক চুলগুলো ছিঁড়ে ফেলতে চায়, আর্তনাদ করে কাঁদতে চায়, কখনও হয়তো শূন্যে ছুঁড়ে দেয় ঘুসি। চলতি পথে চেয়ে দেখে কেউ কেউ অবাক হয়ে। জয়নালও। যার এমন সুন্দর বেশভূষা আর এমন চকচকে একখান গাড়ি, কি দুঃখ থাকতে পারে তার? বোধে আসে না।

আরব দেশের খেজুরের মিঠে গন্ধ আর আতরের খুশবুতে মোহিত হয়ে কচি কলাপাতা বউটা তার ভেগে গেলো। সে না হয় মনের দুঃখে ডিঙিটা কূলে ভিড়িয়ে বসে বসে ওই আকাশে সূর্যটাকে মিলিয়ে যেতে দেখে রোজ। দেখে আর ভাবে, এমনভাবে মিলিয়ে যাবে একদিন সে নিজেও! কী দাম আছে তার? কে আছে তাকে দাম দেয়ার? উস্টা খাওয়া জীবনে এলাচি এলো। ভেঙে যাবো যাবো মাটির দেয়াল উঠলো আবার নতুন করে। মনের হাউসে লতাপাতা আঁকে এলাচি সে দেয়ালে। সাদা সাদা লাউয়ের ফুলে ভরে যায় ঘরের চাল। নৌকা ভিড়িয়ে ঘরে ফিরে ভাপ ওঠা গরম ভাত খায় জয়নাল, তৃপ্তি করে। ঘরের পেছনের জঙ্গলে ঘেরা ডোবা থেকে কিলবিলিয়ে উঠে আসা ঢোড়া সাপ দেখে বউটা যখন ভয়ে চেপে ধরে ওকে, ও তখন ঢঙ করে আরও বেশি জোরে চেপে ধরে। যেন মিশিয়ে নেবে শরীরের সাথে। ওই উঠোনের ডালিম ফুলের মতো রঙ লাগে তখন বউটার গালে, ঠোঁটে। বড় সুখ, বড় সুখী জয়নাল!

--- ও জয়নাল!

গা জ্বলে যায় জয়নালের, ঠোঁটকাটি হুরমনের ডাকে। খায়া দায়া কুনু কাম পায় না, খালি মাইনষের গীবত গাওয়া। স্বভাবদোষে বিয়া পর্যন্ত হয় নাই, তাও খাইসলোত গেলো না। যাইবোও না কুনুদিন। খালি গীবত.... খালি গীবত। দোজখের আগুনরে ডরায় না একটুও!

ত্যক্ত হয়েও, কি হইলো? জানতে চাইলো জয়নাল।

হারাদিন বাড়ির বাইরে থাহিস, বউডারে তো ভালা ঠেকে না রে! আরব ফ্যারোত কুদ্দুসের লগে না জানি কি করে। তোর ঘরের থিইকা বাইরাইতে দেহি যহন তহন।

জানতো, এমনই কিছু শুনবে সে। কোটনামি ছাড়া আর কিছু পারে কি হুরমন? ঠোঁটকাটি নাম তো আর সাধে হয়নি! রাগের ঠেলায় মাটি কাঁপিয়ে চলে গেলো জয়নাল। পেছন থেকে শুনতে পেলো...

ভালা বুইজা কইতে গেলাম, তো জমিদারের ব্যাটার দেমাগ দেহো! বুজবি, বুজবি, একদিন বুজবি...

সত্যিই বুঝেছিলো জয়নাল। খুব বেশি দেরি হয়নি। একদিন বাড়ি ফিরে দেখে, লাউয়ের মাচা থেকে সড়সড় করে নেমে চলে গেলো ঢোড়া নয়, একটা বিষাক্ত সাপ।

সেদিনই মনে মনে ঠিক করে নেয় জয়নাল, রাখবে না এজীবন। খেয়াঘাটের মাঝি সে। বৈঠা ফেলে বসে থাকে নদীর ধারে। ভুলতে পারে না কচি কলাপাতাকে। ভুলবে কেমন করে? ও যে ভালোবেসেছিলো। সেই ভালোবাসাই যখন ছেড়ে গেছে তাকে, তখন আর বেঁচে থেকে কি হবে? পারের কড়ি কি আর আরব দেশের টাকার কাছে লাগে? কিন্তু এই যে ভদ্রলোক, যাকে দেখলেই ভয়ে হোক আর ভক্তিতে, তার মতো ফাটল ধরা গাঁয়ের লোকেরা সালাম ঠুকবে, সে কেন এত বিক্ষিপ্ত! কিসের অভাব, কোন সে কষ্ট কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে? পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে চকচকে লোকটার পিঠে হাত রেখেছিলো জয়নাল। তার সে হাতের মৃদু স্পর্শে মমতা ছিলো, বুঝতে পেরেছিলো সুজয়। প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে লাগলো সেই মমতা, দু'জনেরই। জীবনের প্রতি মমতা হারিয়ে ফেলা দু'টি মানুষ জড়িয়ে গেলো একে অপরের সাথে।

তারা খসে পড়লো একটা। অবাক ব্যাপার, কষ্ট তবে তারাদেরও কম নয়? অভিমানে খসে পড়ছে আকাশের গা থেকে! পড়ে কোথায় গেলো? হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো কী? নাকি আকাশের মায়া ছেড়ে নতুন করে মাটির ওপর ছেয়ে থাকা সবুজ ঘাসের মায়ায় জড়িয়ে গেলো! শেষ হবে না তবে কি তারাটির জীবন? বাঁচবে সে নতুন করে! বাঁচে কি সবাই নতুন করে পুরোনো বেদনা ভুলে? ছোটবেলায় খসে পড়া তারাদের নিয়ে গল্প শুনেছে অনেক। চোখ বুজে চটপট চেয়ে নিতে হয় নিবিড় কোনো চাওয়া, খসে পড়া তারাদের কাছে। যান্ত্রিক শহরে যন্ত্রের মতো বেড়ে উঠতে উঠতে দেখা হয়নি কোনোদিন তেমন তারা। আসলে সুযোগই হয়নি কোনোদিন। আজ এই রাতে এমন সুযোগ পেয়ে যাবে ভাবেনি সে। চেয়ে ফেলবে কি কিছু? কোনো একান্ত ইচ্ছে জানিয়ে ফেলবে কি তীব্রবেগে খসে পড়া ওই তারাটির কাছে? ভাবনার আকস্মিকতায় চমকে গেলো সুজয়। বিরক্তও হলো নিজের ওপর। বাঁচতে দেবে না, এই রাতেই শেষ করে দেবে জীবনকে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? তবে কি এখনও অবশিষ্ট আছে কিছু! কোনো একান্ত চাওয়া? নিশ্চয়ই আছে। তাই তো মনের অজান্তেই চাইতে ইচ্ছে হলো। জীবন আছে বলেই ইচ্ছে বেঁচে আছে। জীবন আছে বলেই দুখের পরে সুখের আশা, অসুন্দরের মাঝেও সুন্দর হাতড়ে বেড়ানো! বেঁচে থাকাই সুন্দর, বেঁচে থাকাই সুখের। মৃত্যুতে কোনো সৌন্দর্য নেই...ভালোবাসা নেই, আছে শুধু বিভীষিকা।

এ কী করছে সে! সেই মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে চলেছে। সেই বিভীষিকাকেই! কেন? কিছু আঘাত তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে বলে? সে তো সবাইকেই করে। তাই বলে পালিয়ে যাবে জীবনের কাছ থেকে? না না, কোনো সমাধান নয় এটা। উপরন্তু একজন অশিক্ষিত মানুষকেও উদ্বুদ্ধ করেছে সে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে! বড় অন্যায়, বড় বেশি অন্যায় করে ফেলেছে সে। ফিরতে হবে তাকে, ফেরাতে হবে জয়নালকেও।

ফেলে দিলো সুজয় নদীতে বালির বস্তা দু'টো। নিজেদের শরীরে বেঁধে ডিঙিটায় কয়েকটা ফুটো করে ডুবে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো তাদের। সাঁতার না জানা সুজয়ের কোনো সমস্যা হতো না ডুবতে। কিন্তু নদীর জলে জীবন কাটানো জয়নাল তো ডুববে না সহজে। তাই পাকা ব্যবস্থা করেছিলো ওরা। কেমন যেন হাস্যকর মনে হলো এসব এখন। হাসতে লাগলো সুজয় জোরে জোরে। অবাক জয়নালের স্বপ্রশ্ন চাহনি এই আঁধারেও দেখা গেলো একেবারে স্পষ্টভাবে।

বললো সুজয়, ফিরে চল জয়নাল, বাঁচি আমরা...

আপনার মন্তব্য