রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ইং

হাসু বুবুর কাছে যাবো

 প্রকাশিত: ২০১৯-১০-১৯ ০০:৪৯:৫২

 আপডেট: ২০১৯-১০-১৯ ০০:৫৩:২৭

ছবি: সংগৃহীত

শিব্বীর আহমেদ:

শেখ রাসেল!
কী অপরাধ ছিল এই শিশু বালকের?
নির্মম নিষ্ঠুরতার চরম হাত সেদিন
রক্তে লাল করেছিল তাকেও।
ঘাতকের বুলেট
শিশু রাসেলের মগজ ও চোখ
বের করে নিয়েছিল।
মার কাছে যেতে চাইবার আগে
ভয়ে যখন কেঁদে উঠে বলেছিল
‘আমাকে ওরা মেরে ফেলবে নাতো!’
তখনও সেই নারকীয় ঘটনার সাক্ষী
৩২ নম্বর বাড়ির গৃহকর্মীর
একবারের জন্যও মনে হয়নি
শিশুটিকে হত্যা করতে পারবে জল্লাদরা।
আর স্নেহময়ী মাতার মৃতদেহ দেখে যখন
সে তাকে তার
হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য
আর্তচিৎকারে বলেছিল,
হাসু বুবু,
আমি হাসু বুবুর কাছে যাবো
আমাকে হাসু বুবুর কাছে পাঠিয়ে দাও।
ঠিক তখনই পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে এসেছিল।
জল্লাদের বুলেট
শিশু রাসেলের মগজ ও চোখ বের করে নিয়েছিল।
কী অপরাধ ছিল এই শিশু বালকের?

মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট
ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে
অন্য সকলের সঙ্গে
না ফেরার দেশে চলে যায় শিশু রাসেল।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে
এক এক করে সকলকে হত্যা করার পরে
বাড়ির নিচে আনা হয় শিশু রাসেলকে
ঘাতকের লক্ষ্যে পরিণত হয় ও
বুলেটবিদ্ধ করবার আগে
ওয়ারলেসে কথা বলে নেয় হত্যাকারীরা।
কান্নারত ভীত শিশুটিকে
তার মাকে দেখাতে নিয়ে যেতে বলা হয়।
বন্দুকধারী ঘাতকরা তাকে
মৃত্যু ও রক্তের স্রোতের ভেতর দিয়ে হেঁটে নিয়ে
মৃত মায়ের কোলের কাছে উপস্থিত করে।
মায়ের মৃতদেহ দেখে
আর্তচিৎকার করে কেঁদে উঠে মিনতি করেছিল
শিশু রাসেল।
বেঁচে থাকার জন্য বলেছিল,
‘আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন’।
সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত রাতের শেষ ভোরের কান্না
সেই বাড়ি থেকে নিস্তব্ধ হয়ে যায়
সেদিন মার মৃতদেহ দেখে শিশু রাসেল
তার প্রিয় বড় বোন শেখ হাসিনার কাছে
যেতে চেয়েছিল কেন?
সে সময় শিশু রাসেলের বুবু
শেখ হাসিনা বিদেশে ছিলেন। মৃত্যুর হিমশীতল
আস্তানার মাঝে
রাসেল কি বুঝেছিল তার হাসু আপা
একদিন এই ঘাতকদের বিচার সম্পন্ন করবেন?
রাসেল, তুমি জানতে পারলে না
কী অধীর আগ্রহে আমরা প্রতীক্ষা করেছিলাম
ঘাতকদের বিচারের আশায়। সেই আশা
তোমার হাসু বুবু পূরণ করেছেন।
তুমি ঠিক মানুষটির কাছেই
যেতে চেয়েছিলে। কারণ তোমার হাসু বুবু
দুঃখ জয় করে
সমগ্র দেশের মানুষের মাঝে
শুধু তোমাকে দেখতে পেয়েছিলেন।
সেদিন সৃষ্টিকর্তার এক নাটকীয় আখ্যান
প্রস্তুত হচ্ছিল। তুমি যে
তোমার হাসু বুবুকে ডাকবে
এটা ছিল সেই প্রতীক, যা এখন
আমরা বুঝতে পারি।
আর তাইতো আমাদের সংকটে
আমরা তোমার প্রিয় বুবু
শেখ হাসিনার কাছেই সবসময় ছুটে আসি।
যেনো তিনিই আমাদের শেষ ভরসারস্থল!

শিশু রাসেলের কত স্মৃতি
গণভবনের সামনে লেক,
সেই লেকে রাসেল মাছ ধরত
মাছ ধরেই খুশিতে আবার ছেড়ে দিত
শেখ হাসিনার ছেলে জয় এবং রাসেল সে সময়
প্রায় প্রতিদিন বেড়াতে আসত গণভবনে
শেখ হাসিনার কোলে চড়ে
এক কি দেড় বছরের রাসেল
মিষ্টি হাসিতে চেয়ে থাকা,
পিতার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রাসেল
তার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া অথবা
খাবার টেবিলে বাবার ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা
ভাই কামাল ও ভাবী সুলতানার বৌ-ভাতের দিন
বাবা ও ভাবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা
কৌতূহলী বালক রাসেল। বাবার কোলে কিংবা ভাই
শেখ কামাল ও শেখ জামালসহ পিতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা।
আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে
বাবার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে
রাসেলের এরকম কত হাজারো স্মৃতি
আজো আমাদেরকে তাড়িত করে।
আর সেই তাড়নায় আমরা বারবার
শিশু রাসেলের প্রিয় বুবু
শেখ হাসিনার কাছেই ফিরে যাই
যেনো তিনিই আমাদের শেষ ভরসারস্থল!
যেনো শেখ হাসিনাই
বাঙালি জাতির মুক্তির শেষ আশ্রয়স্থল!
যেনো শেখ হাসিনাই
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার শেষ ভরসারস্থল!
যেনো শেখ হাসিনাই
সকল অন্যায় জুলুম নির্যাতন আর
অবিচারের বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতীক।

শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'সব হারিয়ে এমন বেঁচে থাকতে তো
আমি চাইনি। এই যে প্রতিদিন পলে পলে দগ্ধ হওয়া,
এই যে সকল হারানোর প্রচণ্ড দাবদাহ
সমস্ত অন্তর জুড়ে,
এই যে তুষের আগুনের ধিকিধিকি
জ্বলুনির জীবন,
এ জীবন তো আমি চাইনি।
এর চেয়ে মা, বাবা, ভাইদের সঙ্গে যদি
আমিও চলে যেতে পারতাম, তবে
প্রতিদিনের এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে তো বেঁচে যেতাম।
আমার জন্য সেটাই ভালো হতো'।

যদি সেদিন সকলের সাথে
শেখ হাসিনাও চলে যেতেন,
যদি শিশু রাসেলের মতো জল্লাদের বুলেট সেদিন
শেখ হাসিনাকেও স্তব্ধ করে দিতো!
তাহলে আমাদের মতো যারা
রয়ে গেছে তাদের কী হতো?
কে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতো?
কে জেল হত্যার বিচার করতো?
কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক হতো?
রাজাকার আলবদরদের বিচার
এই বাংলার মাটিতে কে করতো?
কার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সংগ্রাম শুরু হতো?

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট
ঠিক ফজরের নামাজের সময়
ধানমন্ডির বত্রিশ নং সড়কের বাড়িতে ইতিহাসের
কলঙ্কতম অধ্যায় রচিত হয়।
ঘাতকের দল বাঙালি জাতির মহানায়ক
বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে
নির্মমভাবে হত্যা করে
সেদিন ঘাতকের হাত থেকে রেহাই পায়নি
শিশু-নারীরাও। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে
জনগণের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে
প্রথমবারের মতো অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া
শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর
৩ নভেম্বর জেলহত্যা, একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা,
সিপাহি-জনতার বিপ্লবের নামে একটার পর একটা ক্যু তাণ্ডব
ফাঁসি ফায়ারিং স্কোয়াডে সামরিক অফিসার সৈনিকদের হত্যা,
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড;
দেশ বিরোধী রাজাকার আলবদরদের
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা; স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার
প্রাণান্ত চেষ্টা! স্বাধীনতার পর যে রাজাকারকে খাঁচায় বন্দী করে
মানুষকে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেই
রাজাকারকে মুক্ত করে তার গাড়িতে স্বাধীন বাংলার
পতাকা তুলে দেয়া হয়েছিল!
তারপরেও আমাদের বিবেক জাগ্রত হয়না!
তারপরেও মানুষের বিবেক কেন জাগ্রত হয়না?

ঘাপটি মেরে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে ঘাতক ও
তাদের অনুসারীরা
সময়ের সুযোগে উদয় হওয়ার জন্য?
একাত্তুরের হায়েনারা আজো হায়েনার মতো তাকিয়ে আছে
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিকে নিশ্চি‎হ্ন করার
তীব্র আকাঙ্ক্ষায়; আজো স্বাধীন বাংলাদেশে
দেশবিরোধী যুদ্ধাপরাধীর উলঙ্গ নৃত্য; ১৫ আগস্ট
খালেদা জিয়ার মিথ্যা জন্মদিন জঙ্গিবাদ মৌলবাদ
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ধর্মীয় উন্মাদনা আর তেঁতুল তত্ত্বের কি
দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়ে যখন আমরা কাতর
ঠিক তখনই
শিশু রাসেলের মুখটি আমাদের মনে পড়ে।
কী অপরাধ ছিল এই বালকের?
কী অপরাধ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষশক্তির?
কী অপরাধ আমাদের?
শিশু রাসেলের ঘাতকের বুলেট
আজো আমাদেরকে তাড়া করে ফিরছে
আজো আমরা রাসেলের মতো চিৎকার দিয়ে বলি,
হাসু বুবু
    হাসু বুবু;
        বুবুরে!
বুবু তুমি কোথায়?
    আমি আমার হাসু বুবুর কাছে যাবো।
আমাকে হাসু বুবুর কাছে নিয়ে যাও;
আমাকে হাসু বুবুর কাছে নিয়ে যাও।
হাসু বুবু।

আপনার মন্তব্য