শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

কবি, স্থপতি রবিউল হুসাইন: স্মৃতিচারণায় যতটুকু পাই তাঁকে, কর্ম ও অভিজ্ঞানে

 প্রকাশিত: ২০১৯-১১-২৮ ১১:০৪:১৫

তুষার গায়েন:

সাঙ্গ হল তাঁর শব্দ আর রেখা নিয়ে জীবনভর যত কাব্য আর স্থাপত্যের লীলাখেলা! সব ছন্দ আর নির্মাণের নন্দনতত্ত্বের হিসাব মিটিয়ে দিয়ে কবি, স্থপতি রবিউল হুসাইন লোকান্তরিত হলেন নভেম্বরের ২৬, ২০১৯। পিছনে পড়ে রইল তাঁর বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের বিবিধ অর্জন যা একজন মানুষের পক্ষে এককভাবে সম্পন্ন করার নজির খুব বেশি আমাদের দেশে নেই।

ঘন শ্যামবর্ণ, মাথা থেকে অপসৃত তবু কানের দু'পাশ দিয়ে নেমে আসা সাদা-কালো বাবরি চুলের উচ্ছ্বাস, বড় নিবিড় দু'চোখে আবেগ ও সৃষ্টিযোগের আলোছায়া, সদা কর্মব্যস্ত রবিউল হুসাইন সৃষ্টির এক ক্ষেত্র থেকে আরেক ক্ষেত্রে অনায়াসে যাতায়াত করছেন- সে তো নিজের চোখে দেখেছি যখন সোভিয়েত থেকে স্থাপত্যের পাঠ শেষ করে শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসে তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রায় এক বছর (১৯৯৪-১৯৯৫) কাজ করেছি। বসে আছেন তিনি বড় সাদা ডিজাইন টেবিলের ওপাশে, টেবিলের প্রস্থ বরাবর আনুভূমিক সমান্তরালে বিন্যস্ত সুতাবন্দি স্বচ্ছ স্কেল ও হাতে পেন্সিল যা কোনো বিশাল ভবন অথবা এলাকাকে দশ আঙুলের সৃষ্টিতৎপরতায় নিয়ে আসতে পারে। পিছনের দেয়ালে সাঁটা তাঁর ডিজাইন করা সুন্দর কিছু ভবনের ছবি, বিভিন্ন পেইন্টিং ও টুকিটাকি শিল্পসংক্রান্ত কিছু কাটপেস্ট। তাঁর টেবিল জুড়ে ট্রেসিং পেপার, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন বইপত্র, নির্মাণ উপকরণের ছোট-ছোট বিবিধ নমুনা, অফিস পিয়নের দিয়ে যাওয়া চা তাঁর অবহেলায় জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হচ্ছে। কোম্পানির প্রধান স্থপতি হিসেবে তিনি কোনো ডিজাইনের মূল আইডিয়া পেন্সিলস্কেচে খসড়া করেছেন, এবার ডেকেছেন কোনো তরুণ স্থপতিকে সেই ডিজাইন কাগজে-কলমে পরিপূর্ণ রূপ দিতে। এর মধ্যে ফোনে এসেছে, তিনি কথা বলছেন কোনো ক্লায়েন্ট অথবা প্রকৌশলীর সাথে, কোথাও যেতে হবে তাঁর কোনো মিটিং আছে, পত্রিকা অফিস থেকে তাগাদা দিচ্ছে শিল্প বিষয়ক আলোচনাটি শেষ করতে অথবা ডিজাইন করার ফাঁকে লিখে ফেলা সদ্য কবিতা পাঠাতে হবে ডাকে। কত কাজ তাঁর, হাসিমুখে একটা থেকে আরেকটা কাজ করছেন অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে এবং কোনো কিছু তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছে না। মুখের পাইপে ধোঁয়া ছাড়ছেন এরিনমোরের, মৃদু হাসি আর আত্মপ্রত্যয়ের সাথে এই মানুষটি একাধারে ছিলেন স্থপতি, কবি, প্রাবন্ধিক, শিল্প সমালোচক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক নেতা। ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে যে অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা এবং রাষ্ট্রবিকাশের ধারাটি সূচিত হয়েছিল তিনি তার রূপ নির্মাণে ছিলেন একজন অক্লান্ত অভিযাত্রী।

শিল্পের অন্যান্য শাখা যেমন সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের জনমানস যতটুকু সচেতন, ততটা স্থাপত্য অথবা ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে নেই। একটি স্বাধীন, উন্নয়নশীল দেশ যেখানে জাতীয় জীবনের কোনো ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত নিয়ম-কানুন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ হয়নি, সেখানে স্থাপত্যকলার মতো একটি প্রায়োগিক শিল্পমাধ্যমের প্রতিষ্ঠা খুব দুরূহ কাজ। বাংলাদেশের স্থপতিরা বহু দশকব্যাপী বিভিন্ন বাধার ভিতর দিয়ে, তাদের পেশাগত সংগ্রাম নিরন্তর চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশে সুস্থ স্থাপত্যচর্চা ও তার বিকাশে যেসব স্থপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, রবিউল হুসাইন তাঁদের মধ্যে অন্যতম এবং বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউট-এর নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে কয়েক দফা দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা করেছেন তিনি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল (বিএআরসি) ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স ইত্যাদি। রবিউল ভাইয়ের করা ডিজাইনের ভিতর বিএআরসি ভবন আমার খুব পছন্দের, যা লাল ইটের ছন্দোবদ্ধ এক প্রাঞ্জল কাব্যরূপ যেখানে তাঁর কবি ও স্থপতিসত্তা দারুণভাবে ডানা মেলেছে।

ঝিনাইদহের শৈলকূপায় ১৯৪৩ সালে রবিউল হুসাইন জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজির (বর্তমান বুয়েট) আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টি থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বাংলাদেশের পাইওনিয়ার স্থপতি মাযহারুল ইসলামের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানে বেশ কয়েক বছর কাজ করেন। পরে শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসে স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি হিসেবে আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন।

আমি যখন শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসে জুনিয়র স্থপতি হিসেবে যোগদান করি, তখন ডিজাইন টিমে কাজ করতেন জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি মইনুল হোসেন, স্থপতি সোমেশ হালদার, রবিউল ভাইয়ের সুযোগ্য উত্তরসূরি স্থপতি সাইফুল্লাহ আল মুসাভী (ফাতিন) প্রমুখ। মইনুল ভাই ততদিনে ব্যক্তিগত জীবনে ট্রাজেডির কারণে অগ্নিনির্বাপিত (সেটা নিয়ে আমি স্বতন্ত্র লেখা লিখেছি আগে), সোমেশদা কাজ করছেন প্রথা মাফিক, ফাতিন ভাই ছিলেন খুব উজ্জ্বল এবং পরিশ্রমী। স্থাপত্য শিল্পকলা বটে, কিন্তু এমন এক শিল্প যার ভিতরে মানুষের জীবনযাপন, কাজকর্ম, বিনোদনসহ সব ধরণের ক্রিয়াদি সম্পন্ন হয়। তাই একটি ভবনকে প্রাথমিক স্তরে হতে হয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ ব্যবহারোপযোগী এবং পরবর্তী স্তরে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। এই দু'টি দাবিকে মেটানো খুব সহজ কাজ নয় এবং একজন স্থপতি এই যুগপৎ সমন্বয়ের সাধনা করে যান। রবিউল ভাইও সেটা নিষ্ঠার সাথে করেছেন আজীবন। আমাদের ভিতর একটা ধারণা রয়েছে যে কবিতা লেখা এবং স্থাপত্য নকশা করা এক ধরণের সমান্তরাল শিল্পচর্চা যা অভিন্ন শিল্পবোধ থেকে জাত। কবিতায় ছন্দ মিলিয়ে তার ভেতর ভাব-অনুভব-বোধের যে নান্দনিক বিন্যাস একজন কবি করে থাকেন, একজন স্থপতিও তার ডিজাইনে বিম-কলাম-গ্রিডের শৃঙ্খলায় দক্ষতার সাথে স্পেসকে বিন্যস্ত করার পাশাপাশি সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রয়াস করেন।

পার্থক্য হচ্ছে, কাব্যপ্রতিভা থাকলে ভালো কবিতা লেখা যায়, উত্তীর্ণ কবিতা লিখলে আজ না হোক কাল স্বীকৃতি জুটতে পারে; কিন্তু স্থাপত্য প্রতিভা থাকলে বা ভালো ডিজাইন করতে জানলেই যে স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা জুটবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। কারণ স্থাপত্য কবিতার মতো স্বাধীন নয়। একজন স্থপতিকে কাজ পেতে ও করতে হয় যা নির্ভর করছে তিনি সামাজিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগে কতটা পারঙ্গম, আচরণগতভাবে কতটা সচেতন ও কৌশলী, তিনি কতটা ব্যবসামনস্ক ও শিল্পবোধ প্রয়োগে কার্যকর যা একজন ক্লায়েন্টের সন্তোষ বিধানসহ নিজের ডিজাইন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তাই অসুখী স্থপতিদের সংখ্যাই বেশি, বিশেষ করে আমাদের দেশ যেখানে এই উচ্চমার্গের শিল্পকলাকে বোঝার ও তাকে মর্যাদা দেয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি এবং অল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ড্রাফটসম্যান অথবা নিম্নস্তরের প্রকৌশলীদের দিয়ে এই কাজ যেন তেন উপায়ে করিয়ে নেয়া যায়। যেসব মানুষেরা এই দু'টো শিল্পমাধ্যমকে একসাথে চর্চা করতে গেছেন, তারা জানেন এর যন্ত্রণা কত গভীর। রবিউল ভাইয়ের শিল্পপ্রতিভা এবং যোগাযোগ ক্ষমতার ভিতরে একটা ভারসাম্য ছিল, তাই তিনি কবিতা ও স্থাপত্য পেশাকে সমান্তরালে চালিয়ে নিতে পেরেছেন দক্ষতার সাথে।

কবিতা আমার কাছে এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ যার সন্ধান আমি কৈশোরেই পেয়েছি, আর ছবি আঁকার শুরু শৈশবে, তাই স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হওয়ায় আমি স্থাপত্যে পড়াশুনা করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন থেকে কবি ও স্থপতি রবিউল ভাই ছিলেন আমার আইডল। সোভিয়েত থেকে দেশে ফিরে যখন শুরুতেই তাঁর তত্ত্বাবধানে কাজ করার ও শেখার সুযোগ পেলাম, তখন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন এবং কাজে ভুল হলে বকাঝকা করতে ছাড়তেন না। আমার কবিতার খুব প্ৰশংসা করতেন এবং চেয়েছিলেন আমি 'জাতীয় কবিতা পরিষদ'-এর অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ি এবং এর সাথে সম্পৃক্ত হই। কিন্তু এরশাদের সামরিক শাসনের পতনের পর, 'জাতীয় কবিতা পরিষদ'-এর এমন কোনো ভূমিকা আমার চোখে পড়েনি বা কবিতার নামে যে ধরনের বাৎসরিক আয়োজন এই সংগঠনটি করে থাকে, তা আমাকে আকৃষ্ট করেনি বলে আমি ওপথে আর পা বাড়াইনি। জানি না সে জন্য তিনি আমাকে অহংকারী ভেবে মনোকষ্ট পেয়েছিলেন কিনা। কারণ রবিউল ভাই ছিলেন 'জাতীয় কবিতা পরিষদ'-এর সক্রিয় নেতা এবং একবার এই পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সাথে শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটসে কাজ করতে গিয়ে তিক্ত-মধুর উভয় অভিজ্ঞতাই আমার হয়েছে যা ছিল খুব স্বাভাবিক। আমি প্রায় এক বছর কাজ করে শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস থেকে ইস্তফা দিই; কিন্তু রবিউল ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন সময় আমার দেখা ও কথা হয়েছে কখনো স্থপতি ইন্সটিটিউটের অনুষ্ঠানে, কখনো তাঁর অফিস অথবা কবিতা সভায়। যখনই দেখা হয়েছে, সুন্দর হাসি আর কণ্ঠে দরদ ও আন্তরিকতার সাথে কথা বলেছেন, খোঁজ-খবর নিয়েছেন। ২০০৫ সালে কানাডায় আসার আগে তাঁর অফিসে গিয়েছি দেখা করতে, রিকমেন্ডেশন লেটার দিয়েছেন যাতে বিদেশে পড়াশুনা বা কাজের ক্ষেত্রে তা কাজে লাগে।

রবিউল ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো একদিন 'মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর' অঙ্গনে ভাষাদিবস স্মরণে আয়োজিত কবিতাপাঠের আসরে। আমি কানাডা থেকে ঢাকা গিয়েছি ছুটিতে, সেদিন অফিসে ফোন দিতেই বললেন, "তুষার, 'মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর'-এ কবিতাপাঠ হবে। তুমি কবিতা নিয়ে আসো।" অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর রবিউল ভাই আসলেন, খুব যত্ন করে নিজের প্লেট থেকে পেঁয়াজু, সিঙ্গারা তুলে দিলেন আমাকে খেতে। তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা, আন্তরিকতার স্পর্শ অনুভব করলাম ফের। একে একে কবিরা কবিতা পড়লেন, আমিও পড়লাম আমার কবিতা। আমি তাঁকে উপহার দিলাম আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'দ্বিমেরুযোজন' যা উনি অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় নিজের হাতেই ধরে রাখলেন। অনুষ্ঠানের শেষে বিদায় দিলেন হাসিমুখে। এরপর আর দেখা হয়নি।

বাংলাদেশে স্থপতিদের মধ্যে তাঁর বিচরণক্ষেত্র ছিল সর্বমাত্রিক। শুধু সাহিত্য, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্তারে রাজনৈতিকভাবেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার। রাষ্ট্র ও জাতিগঠনের ভূমিকায় শিল্পচর্চা এবং রাজনৈতিক সচেতনতা যে অপরিহার্য বিষয়, সেটা তাঁর মতো একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক প্রতিটি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন। জীবনকে তিনি উপভোগ করেছেন পরিপূর্ণভাবে, নিজের মেধা ও সামর্থ্যের সম্পূর্ণ নিঙরে দিয়েছেন সন্দেহাতীতভাবে। জীবনব্যাপী সেই পথযাত্রায় তাঁর কতগুলো সৃষ্টিকর্ম অমরত্বের ঠিকানা পাবে, সেটা শুধু সময়ই বলতে পারে।

রবিউল ভাই, লোকান্তরে যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানবেন!

আপনার মন্তব্য