বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

০৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:৪৭

‘তোদের মারব না’

ফোনের একপ্রান্তে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ফাইরুজ মালিহার কাঁপা উচ্ছ্বাস। অপরপ্রান্তে তার বাবা এ কে বোরহান উদ্দিনের চোখে আনন্দ অশ্রু। বাবা শুনছেন, 'আব্বু আমি বেঁচে গেছি। আমি বাইরে বেরিয়েছি, আমার জন্য চিন্তা করো না। যেন দ্বিতীয় জীবন পেলাম।'

টানা ১০ ঘণ্টা উৎকণ্ঠার পর মালিহা যখন জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হয়েছে তখন গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ৭৫ নম্বর সড়কের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন আর মেয়ের কণ্ঠ শুনছিলেন।

বোরহান উদ্দিন বলেন, তার বাসা উত্তরায়। শুক্রবার সন্ধ্যায় হলি আর্টিসান ক্যাফের পাশেই ২০ নম্বর বাড়িতে তার মেয়ে বান্ধবী তাহানার বাসায় বেড়াতে আসে। ইফতারের পর বাসার পাশে ওই রেস্তোরাঁয় কফি খেতে গিয়েই জিম্মি হয় মালিহা।

তবে জিম্মি দশা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন রেস্তোরাঁটির কিচেনের কর্মী সমীর রায় ও তার ভাগ্নে রিন্টু কীর্তনিয়া। রাতভর এ দুইজনসহ ৮ কর্মীকে জঙ্গিরা একটি টয়লেটে আটকে রেখেছিল। শনিবার সকালে সেনা কমান্ডোদের মূল অপারেশনে তাদের অক্ষত উদ্ধার করা হয়।

এর আগে সমীর তার ভাই গোপালের মোবাইল ফোনে ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এসএমএস দিয়ে নিজেদের সর্বশেষ অবস্থা জানান। মধ্যরাতে টয়লেট থেকে তারা কয়েক সহকর্মী একটি সেলফি তুলে তা ফেসবুকে আপলোড করেন।

পরিবারের কাছে ফিরে সমীর জিম্মি ঘটনার বিচ্ছিন্ন বিবরণ দেন। সমীর জানান, জঙ্গিরা শুরুতে অস্ত্রের মুখে তাদের নড়াচড়া নিষিদ্ধ করে। রাত ১১টার দিকে বিদেশি ও বাংলাদেশিদের আলাদা করে। তাদের স্থান হয় একটি টয়লেটে। বাইরে থেকে তাদের আটকে দেওয়া হয়। এর আধাঘণ্টা পরেই আবার দুই অস্ত্রধারী জঙ্গি টয়লেটের দরজা খুলে বিদেশিদের খুঁজতে থাকে। না পেয়ে বলে, 'তোদের মারব না।'

এরপরও বিশ্বাস হচ্ছিল না সমীরের। সেনা কমান্ডোরা তাদের বের করার আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, এই বুঝি জঙ্গিরা তাদের গুলি করে মেরে ফেলল। জঙ্গিদের সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আর ছুরি ছিল বলে জানায় সমীর। তার ধারণা, ওই সময়েই বিদেশিদের মেরে ফেলা হয়। জঙ্গিদের বিবরণও দেন তিনি। বলেন, সবাই বয়সে তরুণ। কারও গায়ে জামা, কারও গায়ে টি-শার্ট। মনে হচ্ছিল বিদেশিদের ওপর তারা খুব ক্ষিপ্ত।

সমীরের সঙ্গে একই টয়লেটে আটক ছিল তার ভাগ্নে রিন্টুও। এই যুবক ক্যাফেটেরিয়ার পরিচ্ছন্নকর্মী। তিনি জানান, অস্ত্রের মুখে আটকে রাখার পর একবার শুধু জঙ্গিরা তাদের দরজা খুলে সবাইকে তল্লাশি করেছিল। মনে হচ্ছিল, তখনই মেরে ফেলবে। ক্ষুধার জ্বালা থাকলেও সারারাতে কিছু খেতে পারেননি। তাদের অনেকেই টয়লেটে ট্যাপের পানি খেয়েছেন।

বেঁচে আসার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রিন্টু জানান, সকালে যখন সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে, তখন গুলির শব্দে তারা আবারও আঁতকে উঠেন। তাদের বাথরুমের দিকেও গুলি আসছিল। এক পর্যায়ে তাদের কয়েকজন টয়লেটের ভেন্টিলেটর দিয়ে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখান, কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের ডিউটি পোশাক খুলে তা সেনা কমান্ডোদের দেখান। তখন তারা আশস্ত  হয়ে দ্রুত তাদের উদ্ধার করেন। প্রাণ নিয়ে ফিরেও বিশ্বাস হচ্ছিল না-বেঁচে আছেন। সমীরের ভাই গোপাল রায় বলেন, অভিযানের শেষের দিকে টয়লেট থেকে তার ভাই, ভাগ্নেসহ ৮ জনকে উদ্ধার করা হয়।

জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার ওই রেস্তোরাঁর কর্মী বাচ্চু পাটোয়ারী বলেন, জঙ্গিরা খুব ভয়াবহ ছিল। সবার হাতে অস্ত্র। ঢুকেই ওরা গুলি করতে থাকে। তিনি ওই সময় দৌড়ে দোতলায় চলে যান। সুযোগ বুঝে লাফিয়ে সীমানাপ্রাচীরে পড়েন। এরপর সেখানেই শুয়ে থাকেন। বারবারই মনে হচ্ছিল, প্রাণ নিয়ে আর ফিরতে পারব না।

হলি আর্টিসানের সুপারভাইজার সুমন রেজা উদ্ধার হয়েছিলেন শুক্রবার রাতেই। তিনি পুরো ঘটনার বিবরণে বলেন, 'তখন আমি দোতলায়। হঠাৎ দেখি দুইজন অস্ত্রধারী এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করেছে। ভয়ে ছাদের ওপর চলে যাই। ছাদে ওঠার দরজা বন্ধ করে দিই। ততক্ষণে অস্ত্র ধারীদের দুইজন ছাদের ওপর উঠে আসার চেষ্টা করে। তালাবদ্ধ দেখে দরজায় লাথি মারা শুরু করে।'

তিনি আরও বলেন, হোটেলে দু’জন বিদেশি শেফও ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে আমি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসি। যেন দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি।

সূত্র : সমকাল

আপনার মন্তব্য

আলোচিত