শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

০৩ জুলাই, ২০১৬ ০২:৫৫

ঝড়ো অপারেশন ‘থান্ডারবোল্ট’

ইসলামী জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) শুক্রবার মধ্যরাতেই তাদের ওয়েব সাইটে আর্টিসান রেস্টুরেন্টে নৃশংস খুন করা কয়েকজন মানুষের ছবি প্রকাশ করেছিল। তখনও অনেকের মনে আশঙ্কা ছিল আইএসের বক্তব্য নিয়ে। এরইমধ্যে জিম্মি মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেন দুজন পুলিশ কর্মকর্তা। আহত হন বেশ কয়েকজন। এসময়ই আইন শৃঙ্খলাবাহিনী বুঝে যায় এ কোনো সাধারণ হামলা নয়।

রাতভর পুলিশ র‌্যাবের কৌশল ঠিক করা আর কঠোর নজরদারির মধ্যে সময় কাটতে থাকে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল তৎপর থাকে সারা রাত। এক সময় এসে সিদ্ধান্ত হয়, যা করার করবেন সেনা সদস্যরা। অন্যান্য বাহিনী প্রয়োজনে সহায়তা করবে। ভোর নাগাদ মিলে সবুজ সংকেত। তার আগেই সার্বিক প্রস্তুতি আর কমান্ডো অভিযানের কৌশল ঠিক হয়ে যায়। অপারেশনের সম্মুখভাগে তরুণ কমান্ডো সদস্যরা শুধু থাকেন চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায়।

সরকারের সবুজ সংকেত পাবার পর সকাল সাতটা ৪০ মিনিটে শুরু হয় অভিযান। কমান্ডোরা সাজোয়া যান নিয়ে প্রথমেই ভেঙ্গে ফেলেন হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টের সামনের দেওয়ালের কিছু অংশ। মুহুর্মুর্হু গুলি চলতে থাকে চারদিক থেকে। শুধু ভেতরে ঢুকে পড়া কমান্ডোরাই নয়, আশপাশের উঁচু ছাদ থেকেও তাদের ব্যাকআপ দেওয়া হয়। বাইরে তৈরি থাকে আরও একাধিক দল। কমান্ডো আক্রমণের মুখে নিজেদের গোলাবারুদ আর বিস্ফোরক দিয়ে সামান্য কয়েক মিনিটের প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে জঙ্গিরা। একদিকে জিম্মিদের নিরাপদে সরিয়ে আনা আর অন্যদিকে জঙ্গিদের পরাস্ত করার লক্ষে জীবনবাজি রেখে কামান্ডোরা একে একে রেস্টুরেন্টের নীচ তলার প্রায় সবগুলো দরজা ভেঙে সবমিলিয়ে ১২/১৩ মিনিটের মূল অপারেশনসহ মাত্র ৪০ মিনিটে শেষ করে তাদের পুরো প্রক্রিয়া। জঙ্গি দলের ৬ জন নিহত হয়। একজনকে আটক করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় জঙ্গি হামলা আর কমান্ডো অভিযান

হলি আর্টিসানের সাথে একই কম্পাউন্ডে লেকভিউ ক্লিনিক। সেখানে সদ্য সিজারিয়ান সন্তান, স্ত্রীসহ রয়েছেন সাকি আহমদ। শনিবার দুপুরে তিনি বলেন, আর্টিসানে জঙ্গি হামলার সময় লেকভিউ ক্লিনিকেই ছিলেন তারা। কেবিনের জানালা দিয়ে দেখেছেন অনেক কিছু। সাকি প্রথমেই তার ড্রাইভার বাচ্চুর বরাত দিয়ে জানালেন,  জঙ্গিদের হামলা শুরুর সময়ের কিছু কথা।

সাকির ড্রাকভার বাচ্চু তখন আর্টিসান রেস্টুরেন্টের নিরাপত্তারক্ষীর পাশে একটি টুলে বসেছিলেন। জঙ্গিরা ঢোকার সময়ই নিরাপত্তারক্ষী বাধা দেন। সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিরা গুলি চালায় নিরাপত্তারক্ষীকে উদ্দেশ্য করে। সেই নিরাপত্তারক্ষীর মুখে গুলি লাগে বলে বাচ্চু সাকীকে জানিয়েছেন। সাকি বলেন, হলি আর্টিসান ও  লেকভিউ ক্লিনিকের পার্কিং একটাই। ড্রাইভার বাচ্চু প্রথমে ছুটে যান গাড়ির কাছে, তারপর লেকভিউ ক্লিনিকে আশ্রয় নেন।

তিনি বলেন, সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর যখন কমান্ডো অভিযান চলছিল তখন তারা দেখতে পেয়েছেন জঙ্গিরা তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

অপারেশনের পর আর্টিসানের ভেতরকার পরিস্থিতি

শনিবার সকালে অপারেশন থান্ডারবোল্ট শেষ হবার পর সাড়ে আটটা থেকে ডিউটিতে যান গুলশান থানার এক কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সকাল ১০টার দিকে তার আর্টিসানের ভেতর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলেন, বাইরের দেওয়ালে আংশিক ভাঙা ছাড়া রেস্টুরেন্টের বাইরের অংশে এতো বড় ঘটনার তেমন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তার চোখে পড়েনি। তবে নীচতলায় হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নীচতলায় সব টেবিল চেয়ার লণ্ডভণ্ড। আর মেঝেতে ছোপ ছোপ রক্ত। রেস্টুরেন্টের ভেতরের দেওয়াল ও দরজা বিস্ফোরকের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেখেছেন বলেও গুলশান থানার ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান। তবে দুতলায় উঠার সুযোগ তার হয়নি বলে জানান ওই পুলিশ।

দুপুর একটার দিকে লাশ সিআইডির বিশেষ প্যাকেটে গোছানোর পর বেরিয়ে এসে এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি নাগরিকদের অনেককেই বিভৎসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কারও কারও মুখও চেনা যায় না। তাছাড়া লাশ গোছানোর সময় পরিধেয় পোষাকের কারণে নারী পুরুষ সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা করতেও সমস্যা হয়েছে বলে ঐ কর্মকর্তা জানন। যদিও পরে ভিন্ন একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে মোট ১০ নারীকে হামলাকারীরা হত্যা করেছে।

গুলশানের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান জানিয়েছেন, এই ঘটনায় যারা আহত হয়ে উদ্ধার হয়েছেন তাদের পুলিশ ও ডিবির হেফাজতে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের প্রত্যেককেই যথাযথ তদন্তের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সূত্র : পরিবর্তন ডটকম

আপনার মন্তব্য

আলোচিত