শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

০৩ জুলাই, ২০১৬ ২৩:২৩

বন্ধুদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেলো ফারাজের

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আয়াজ হোসেনকে (২০) ছেড়ে দিতে চেয়েছিল বন্দুকধারীরা। তাকে চলে যেতেও বলেছিলো হামলাকারীরা। এসময় সঙ্গে থাকা দুজন বন্ধুকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেন ফাইয়াজ। কিন্তু বন্দুকধারীরা ওই দুজনকে ছাড়তে রাজি হয়নি। দুই বন্ধুকে না ছাড়িয়ে নিজেও চলে আসতে অস্বীকার করে ফারাজ। পরের দিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান শেষে ওই বেকারি থেকে যাদের লাশ বের করা হয়, সেখানে ফারাজের লাশও ছিল।

এসময় ফারাজের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অবিন্তা কবীর। ভারতীয় তরুণী তারুশি জৈনের মরদেহও উদ্ধার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী একজনের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-কে এ কথা জানিয়েছেন ফারাজের আত্মীয় হিশাম হোসেন।

হিশাম জানান, ওই দুই নারীর জাতীয়তা সম্পর্কে জানার পর বন্দুকধারীরা তাদেরকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি জানিয়েছেন, ফারাজ তাদের ছেড়ে আসতে চাননি। ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

ফারাজ আইয়াজ হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।  একই বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তেন অবিন্তা কবীর। আর যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন ভারতীয় তরুণী তারুশি জৈন। বাবার কর্মসূত্রে ঢাকায় ফারাজদের সঙ্গে একই স্কুলে পড়েছিলেন তিনি। এই তিনজন তাই ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। তারুশি একটা শিক্ষানবিশ বৃত্তি পেয়েছেন, বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকায় কাজ করতে হবে। সে জন্যই ঢাকায় এসেছিলেন তিনি।

নিউইয়র্ক টাইমস-কে জিম্মি দশার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ওই বেকারিটির শেফ সুমীর বরাই। যিনি নিজেও জিম্মিদশায় ছিলেন, পরে কোনোরকমে পালিয়ে বের হতে পেরেছিলেন।

শেফ সুমীর বরাই বলেছেন, বন্দুকধারীদের ভয়ে প্রথমে তিনিসহ সাত আটজন ওয়াশরুমে পালালেও পরে বন্দুকধারীরা তাদের অভয় দিয়ে বলে, বাঙালিদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমরা এখানে শুধু বিদেশিদের হত্যা করব।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখতে বন্দুকধারীদের দারুণ আগ্রহ ছিল বলে দাবি সুমীরের। এক পর্যায়ে স্টাফদের বেকারির ওয়াইফাই সংযোগও চালু করতে বলে তারা। এমনকি জিম্মিদের মোবাইল ফোনের সাহায্যে নিহতদের রক্তাক্ত লাশের ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করে বন্দুকধারীরা।

শুক্রবার রাতে ঢাকার অন্যতম নিরাপদ এলাকা হিসেবে বিবেচিত গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ার ভেতরেই একটি স্প্যানিশ বেকারিতে কয়েকজন বন্দুকধারীর গুলিতে ২০ জন নিহত হয়। সেনাবাহিনী প্রথমে নিহতদের সবাইকেই বিদেশি নাগরিক হিসেবে দাবি করলেও পরে জানা যায় নিহতদের মধ্যে ৩ জন বাংলাদেশিও আছেন। ফারাজ ছাড়া অন্য দুজন বাংলাদেশি হলেন- ঢাকার একটি আর্ট গ্যালারির সাবেক প্রধান ইশরাত আখন্দ ও ল্যাভেন্ডারের মালিকের নাতনী অবিন্তা কবীর।


উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে নয়টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বরের আর্টিজান বেকারিতে ৮ থেকে ১০ জন সন্ত্রাসী অতর্কিত হামলা চালায়। এরপর ওই রেস্তোরাঁয় থাকা ২০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৩০-৩৫ জন লোকজনকে জিম্মি করে রাখে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি হয়।

গোলাগুলিতে ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দিন নিহত হয়েছেন। আহত হন প্রায় ৩০ জন পুলিশ সদস্য। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন- ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন। আহতদের মধ্যে ১৯ জন গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

জঙ্গি হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এই ধরনের অতর্কিত হামলা চালিয়ে মানুষজনকে জিম্মি করার ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম।

শনিবার ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। চালিয়ে জিম্মি হওয়া ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে এবং ২০ জন বিদেশি নাগরিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত