বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

সিলেটটুডে ডেস্ক

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:৩৩

দেশের ইতিহাসে পেঁয়াজের সর্বোচ্চ দাম

পেঁয়াজের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে বৃহস্পতিবার। একদিনেই ডাবল সেঞ্চুরি করেছে পেঁয়াজের দাম। বৃহস্পতিবার দিনশেষে দেশের বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজির দাম সর্বোচ্চ ২২০ টাকায় উঠেছে, যা দিনের শুরুতে ছিল ১৬০-১৭০ টাকা। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরে উঠে এসেছে নিয়ন্ত্রনহীন বাজারের এ চিত্র।

এর আগে গত মঙ্গলবার পেঁয়াজের নৈরাজ্যকর বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সংসদে বলেন, 'পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে এসেছে।' পেঁয়াজ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির কোনো কোনো বক্তব্য নিয়ে সাধারণ মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। গত ৮ নভেম্বর তিনি বলেন, পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকার নিচে পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই। এরপর থেকেই এ পণ্যটির দাম আরও বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে পেঁয়াজের কেজি কখনও দুশ' টাকা হয়নি। একটি নিত্যপণ্য নিয়ে মাসের পর মাস এভাবে বাজার অস্থিরও থাকেনি কখনও। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করলেও সেখানে ত্রুটি ছিল। ফলে বাজার এখনও স্বাভাবিক হয়নি।

দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে ঘাটতি বহুকাল ধরে। এজন্য কয়েক বছর কমবেশি দশ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। বলতে গেলে পুরোটাই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এই পরনির্ভরশীলতাই বিপাকে ফেলেছে সরকারকে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে দেড় মাস আগে। এই দেড় মাসেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার স্থির করতে পারেনি। ফলে গতকাল এই পণ্যটি দুশ' টাকা করে কেজি কিনতে হয়েছে ক্রেতাদের।

দেশি পেঁয়াজের মজুদও ফুরিয়ে আসছে। এতে বড় পাইকারি মোকাম ফরিদপুর ও পাবনায় ঘাটতির কারণে পেঁয়াজ নিয়ে একরকম কাড়াকাড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমদানির বড় চালান কবে আসছে তার নিশ্চয়তা নেই। মিয়ানমারের পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিও কমেছে। দেশি নতুন পেঁয়াজ আসতে আরও দু'সপ্তাহ লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে পেঁয়াজের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। পেঁয়াজের দামে অস্থিরতায় কোথাও কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পেঁয়াজের উচ্চমূল্য নিয়ে নানা রসিকতা ও সমালোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দুষছেন অনেকেই।

বাণিজ্যমন্ত্রী আছেন বিদেশ সফরে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলেননি। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ শাখার কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বকসী জানান, পেঁয়াজ নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হবে না।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখতে মন্ত্রণালয়ের নেওয়া উদ্যোগ কাজে আসেনি। বেশ ত্রুটিও ছিল। ফলে বাজারও পুরোপুরি বেসামাল হয়ে পড়েছে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর থেকে সরকার সরাসরি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। বড় বড় কোম্পানি এস আলম, সিটি ও মেঘনা গ্রুপের মাধ্যমে আমদানির চেষ্টা চালালেও তা কাজে আসেনি। ফলে সংকট বেড়েছে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রধান পাইকারি আড়ত তদারকিতে ১০টি মনিটরিং সেল গঠন করে। ব্যবসায়ীদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করে নৈতিকভাবে সহনীয় ও যৌক্তিক দামে পণ্যটি বিক্রির অনুরোধ করে। অতি মুনাফা না করতে ধর্মীয় বার্তা দিয়েও অনুরোধ করা হয়। কোনোভাবেই অতি মুনাফালোভীদের নিবৃত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অপরাধে বাজার অভিযানে জেল ও জরিমানাও করা হয়। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিতেও উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়। এ সুবিধার মধ্যে বন্দরে আমদানি পেঁয়াজ দ্রুত খালাস করা। ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো এবং আমদানি এলসি মার্জিন শূন্য করা হয়। এরপরেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি বাজার।

ট্যারিফ কমিশনের সর্বশেষ এক পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও এ পণ্যের উৎপাদন ও আমদানির তথ্যের ভিত্তিতে চলতি অক্টোবর ও নভেম্বরে দেশের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট মজুদ দেশেই রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন। দেশে ২৩ লাখ ৭৬ হাজার টন উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদন ও মজুদ পর্যায়ে ২৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এতে দেশীয় পর্যায়ে সরবরাহ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৮২ হাজার টন। আমদানি হয় ১০ লাখ টন। আমদানি করা পেঁয়াজও প্রক্রিয়াগত কারণে প্রায় ১৫ শতাংশ নষ্ট হয়। ফলে মোট আমদানি দাঁড়ায় ৯ লাখ টন। ফলে ২৬ লাখ ৮২ হাজার টন পেঁয়াজ দেশের বাজারে সরবরাহ হচ্ছে। আগস্ট থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মাসে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়।

সাবেক বাণিজ্য সচিব ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সরকার চেষ্টা করেছে। তবে সরকারের উদ্যোগে ব্যবসায়ীরা সাড়া দেননি। এই চেষ্টায় বিলম্ব হয়েছে। বাজারে পেঁয়াজের সাময়িক সংকট পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুফে নিয়েছে। তিনি দেশে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মন্ত্রণালয় যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবে বাজারে ঘাটতি অনুমান করা যায়। এ ক্ষেত্রে শুধু মনিটর করে লাভ হবে না। ৪০ শতাংশ আমদানিনির্ভর বাজারে ভারত রপ্তানি বন্ধের পরে ৩০ হাজার টন আমদানি হলেও তা মাত্র ৫ দিনের চাহিদা মেটায়। এ অবস্থায় ডিসেম্বরে নতুন পেঁয়াজ এলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হবে। তিনি বলেন, পেঁয়াজের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য নেই। এ কারণে বাজারে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা পেঁয়াজ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় আছে। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পেঁয়াজের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি পরিস্থিতি উন্মুক্ত করা দরকার। যাতে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, দেশের এই বাজার পরিস্থিতিতে শুধু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল থেকে সমাধান হবে না। সরকারকে সরাসরি আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে ১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। এ জন্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লাগবে। এতে বাজার স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যৌক্তিক মুনাফা করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাজার মনিটরিং জোরদার করে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, তাদের গ্রুপের আমদানি করা পেঁয়াজ গত ৩০ অক্টোবর জাহাজীকরণ হয়েছে। আগামী ২২ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে পৌঁছবে। এ বিষয়ে যাবতীয় কাগজপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার দ্রুত ছাড় করে আনতে পারলে সিঙ্গাপুর থেকে ৪ থেকে ৫ দিনে দেশের বাজারে আসবে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে গতকাল সকালে ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও দুপুর না গড়াতেই ২০০ টাকা থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হয় দেশি পেঁয়াজ। আমদানি করা মিয়ানমারের পেঁয়াজ পৌঁছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। চীন, মিসর ও তুরস্কের পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। গতকাল রাজধানীর গোপীবাগের রেলগেটে এক দোকানি ২৩০ টাকা দাম চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন ক্রেতা। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে দোকানিকে মারতে যান ওই ক্রেতা। এর পরে দোকানি পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দেন। পাইকারিতে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় মিরপুরের পীরের বাগের দোকানি মো. দেলোয়ার হোসেন বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের সঙ্গে বিবাদ বাড়ছে। এ কারণে তার মতো অনেকেই এখন বিক্রি করছেন না।

রাজধানীর পাইকারি আড়ত মিরপুর-১নং বাজার ও কারওয়ান বাজারে দেশি ভালো মানের পেঁয়াজ ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। দেশি কিং ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৮০ টাকা। চীন, ভারত ও তুরস্কের পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। তবে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তে দেশি পেঁয়াজ ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ দেড়শ টাকা ও আমদানি করা অন্যান্য দেশের পেঁয়াজ ১২০ টাকা কেজি।

পেঁয়াজ আমদানিকারক ও শ্যামবাজারের পপুলার বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী রতন সাহা বলেন, আমদানি পেঁয়াজের পরে এখন দেশি পেঁয়াজের সরবরাহে টান পড়েছে। এ কারণে বাজারে থাকা পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বড় গ্রুপের আমদানির ভয়ে এই সময়ে নিয়মিত পেঁয়াজ আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আনেননি। এতে বাজারে সংকট আরও বেড়েছে।

মিরপুর ১নং বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন মজুমদার বলেন, গত মঙ্গলবার ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। গত দুই দিন ধরে পাইকারি মোকামে তেমন পেঁয়াজ মিলছে না। এ কারণে বাজারে দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে মোকাম থেকে ২০০ থেকে আড়ইশ' মণ পেঁয়াজ আড়তে এনে বিক্রি করেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে ৭০ মণ পেঁয়াজ মোকাম থেকে আনতে পেরেছেন। তার মতো অন্যান্য ব্যবসায়ীও পেঁয়াজ পাচ্ছেন না। এ কারণে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

শুধু রাজধানীর বাজার নয়, দেশজুড়ে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বরিশালে পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা হয়েছে। পেঁয়াজের পাইকারি মোকাম পাবনায় গতকাল খুচরায় ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হয়। পাবনার পাইকারি ব্যবসায়ী কানু মণ্ডল বলেন, মোকামে এখন সাধারণ মানের পেঁয়াজ ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা ও ভালো মানের পেঁয়াজ ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। পাবনার বাজারে অনেক দোকানে পেঁয়াজ নেই। ফরিদপুরের আড়তে পেঁয়াজ নিয়ে চলছে কাড়াকাড়ি। এ এলাকার শরীয়াতউল্লাহ মোকামের পাইকারি ব্যবসায়ী আক্কাস মিয়া ও জাভেদ শেখ জানিয়েছেন, বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হওয়া সালথা ও নগরকান্দায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনছেন আড়তদাররা। আড়তে আনার পরে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা বেশি দাম দিয়ে আগে কিনে নিচ্ছেন।

ভারত নিজেদের চাহিদা মেটাতে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম নূন্যতম রপ্তানিমূল্য তিনগুণের বেশি বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে। এতে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দর ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় ওঠে। এরপর ভারতে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী দেশ পেঁয়াজের রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তখন দেশে একদিনের ব্যবধানে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় ওঠে। এরপর থেকেই বাজার অস্থির।

খবর : সমকাল

আপনার মন্তব্য

আলোচিত