আজ বুধবার, , ২৩ মে ২০১৮ ইং

নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০১:৫১

‘মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ’

সিলেট নগরীর কেন্দ্রীয় শাহী ঈদগাহ ময়দানে নারী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি শাহী ঈদগাহের ফটকে সাইনবোর্ড টানিয়ে নারীদের প্রবেশে মানা করা হয়েছে।

ঈদগাহের পবিত্রতা রক্ষার কথা বলে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে এমন নিষেধাজ্ঞায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

উন্মুক্ত উদ্যানহীন সিলেট নগরে অনেকেই বিকেলে শাহী ঈদগাহের খোলা ময়দানে হাটাহাটি করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক নারী। এলাকাবাসীর এই নির্দেশনার কারণে তাঁরা পড়েছেন বিপাকে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটা হতে পারত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা সামাজিকতা বজায় রাখার আহ্বান। সেটা না করে সরাসরি নারীদের প্রতি অপমানজনক কথা লেখা বা নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করাটা একদম অনুচিত। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান, তাছাড়া এখানে মিনারের পাশে ঘুরে দেখার বা বসার জন্য জায়গাও তৈরি করে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। কারণ এটা নারীদের জন্য অপমানজনক এবং এতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এ ঈদগাহের পাশে ২০১৬ সালে নির্মাণ করা হয় ২০০ ফুট উঁচু মিনার। এই মিনারের আশেপাশে শোভাবর্ধনের জন্য তৈরি করা হয় অগভীর কুয়া এবং লাগানো হয় নানান ফুলের গাছ। বিশ্রামের জন্য তৈরি করা হয় কয়েকটি বেঞ্চ। যেখানে প্রতিদিনই অনেক নারী পুরুষ একটু প্রশান্তির জন্য এসে ভিড় করেন। এছাড়া সিলেটে আসা নারী পর্যটকদের অনেকেও ঈদগাহে ঘুরতে যান।

তবে নারী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাইনবোর্ড টানানোতে তারা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন।

শুক্রবার (১৯ মার্চ) সরজমিনে শাহী ঈদগাহ প্রবেশ ফটকগুলো এবং ঈদগাহ ময়দানের ভেতরের বিভিন্ন স্থানে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সাইনবোর্ড দেখা যায়।

সাইনবোর্ডগুলোতে লেখা রয়েছে- “শাহী ঈদগাহের পবিত্রতা রক্ষা করুন, মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ,- আদেশক্রমে এলাকাবাসী”।

এলাকাবাসীর কেউ কেউ এই সাইনবোর্ড টানানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

এ ব্যাপারে সিলেট শাহী ঈদগাহ কমিটির সদস্য মুসতাক আহমদ বলেন, এলাকাবাসীর উদ্যোগে ঈদগাহ এলাকার পবিত্রতা রক্ষার কারণে এই সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সাইনবোর্ডটি ঈদগাহ কমিটির উদ্যোগে লাগানো হয়নি তবে এলাকাবাসীর উদ্যোগে আমাদের সম্মতি আছে।

তিনি বলেন, সিলেট নগরীতে প্রাতঃভ্রমণ কিংবা বৈকালিক ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত কোন স্থান বা উদ্যান নেই। তাই ঈদগাহ এলাকা এবং এর আশেপাশের অনেক নারী পুরুষ একটু প্রশান্তির আশায় ঈদগাহ ময়দানে আসেন।

এছাড়াও ডায়াবেটিকসসহ বিভিন্ন রোগে ভোগা নারী-পুরুষও কোথাও হাঁটাচলার সুযোগ না পেয়ে এখানে এসে হাঁটাচলা করেন। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

তবে ইদানীংকালে সন্ধ্যার পর ঈদগাহ ময়দানে অনেক নারী পুরুষ একসাথে বসে থাকেন যা ঈদগাহের পবিত্রতা নষ্ট করে। এছাড়া রাতের অন্ধকারে অনেক অসামাজিক কাজকর্মের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এবিষয়ে প্রশাসনকেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অধীনে থাকা শাহী ঈদগাহ ময়দানে অপর্যাপ্ত আলোর কারণেই অনেক অপরাধী  সুযোগ নিচ্ছে জানিয়ে মুসতাক বলেন, এই বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হককে অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে এই এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে।

এ ব্যাপারে সিলেট শাহী ঈদগাহের মোতোওয়াল্লি জহির বখত দাবি করেন, তিনি বিষয়টি জানেননা। বাইরে থেকে একদল যুবক হয়তো কোনো এক সময় কোন আলোচনা ছাড়াই এ রকম সাইনবোর্ড টানিয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অসামাজিক কাজ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ জায়গাটি খোলামেলা। অনেকেই সপরিবারে বেড়াতে আসেন। আর নারীরা প্রবেশ করতে পারবে না, এমন কথা ইসলাম পরিপন্থী। ইসলামে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদাবান।

সিলেট সিটি করপোশেনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, শাহী ঈদগাহ পরিচর্যার জন্য মোতোওয়াল্লির নেতৃত্বে আলাদা কমিটি রয়েছে। সে কমিটির মেয়রও একজন সদস্য, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

তিনি বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরে স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন তিনি। নারীদের প্রতি এমন অপমানজনক কথা লিখে টানানোর অধিকার কারো নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ষোড়শ শতাব্দীতে স্থাপিত হয় সিলেট শাহী ঈদগাহ। সপ্তদশ শতাব্দীতে দিল্লির মসনদে যখন আসীন সম্রাট আওরঙ্গজেব, সে সময় পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ঈদগাহটি। উঁচু টিলার ওপর শাহি ঈদগাহর মূল ভূখণ্ডে কারুকার্যখচিত ২২টি বৃহৎ সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠলে ১৫টি গম্বুজ সজ্জিত ঈদগাহ দেখা যায়। ঈদগাহের প্রাচীর সীমার চারদিক ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় ১০টি গেট। ঈদগাহের সামনেই মুসল্লিদের ওজুর জন্য রয়েছে বিশাল পুকুর।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে আরও নানা কারণেই প্রসিদ্ধ এই ঈদগাহ নজর কাড়ে পর্যটকদেরও। ১৭৭২ সালে ইংরেজবিরোধী ভারত-বাংলা জাতীয়তাবাদীর প্রথম আন্দোলন এই ঈদগাহ মাঠেই শুরু হয়েছিল সৈয়দ হাদী ও মাদীর মাধ্যমে।

অতীতে সিলেটের বড় সমাবেশের স্থান হিসেবেও বেছে নেওয়া হতো এই জায়গাটিকে। ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে এখানে এসেছেন মহাত্মা গান্ধী, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মতো নেতারা।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই ঈদগাহ মোগল স্থাপত্য আর নান্দনিকতার সঙ্গে ছায়া সুনিবিড় পরিবেশের জন্যও বিখ্যাত। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে মোগল স্থাপনার আদলে স্থাপিত দৃষ্টিনন্দন তোরণ ঈদগাহটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি সুউচ্চ মিনার স্থাপন করলে প্রাচীন ও আধুনিকতার মিশেলে আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে এই ঈদগাহ।

বর্তমানে সিলেটের প্রধান ঈদের জামাত শাহী ঈদগাহেই অনুষ্ঠিত হয়। আর সিলেটে আসা ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকরাও ঘুরে যান নিরিবিলি পরিবেশের শাহী ঈদগাহ থেকে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত