শুক্রবার, , ১৬ নভেম্বর ২০১৮ ইং

কুলাউড়া প্রতিনিধি

০৫ নভেম্বর, ২০১৮ ২১:০৩

যৌন হয়রানি: মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিপাকে ছাত্রী

কুলাউড়া উপজেলার জালালীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে ৯ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠেছে। মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুস শহীদের বিরুদ্ধে ওই ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ আনা হয়।

যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা ওই ছাত্রী এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইয়াকুব-তাজুল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রউফ এবং সর্বশেষ ১ নভেম্বর কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ঘটনাটির প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়।

এদিকে ঘটনাটির তদন্ত কার্যক্রম প্রভাবিত ও অভিযুক্ত মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে ওই ছাত্রী ও তাঁর পরিবার। গত ১৭ অক্টোবর ক্লাসে এ ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ না নেওয়া ছাত্রীটি ৩১ অক্টোবর থেকে মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একই ঘটনায় দীর্ঘদিন যাবত একই ক্লাসের আরেক ছাত্রীও মাদ্রাসায় আসছে না বলে জানায় ওই ছাত্রী।

এঘটনায় মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ইয়াকুব তাজুল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রউফের স্বাক্ষরিত পত্রে ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য অভিভাবক সদস্য আতিকুর রহমান আখইকে আহবায়ক, মাদ্রাসার শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য শামছুল ইসলাম খান ও শিক্ষক মো. আব্দুস সামাদকে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছিল। ইতোমধ্যে এ কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন পরিচালনা কমিটির সভাপতির কাছে জমা দিয়েছে।

ওই ছাত্রীর অভিযোগ, মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুস শহীদের হাতে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির সাতজন ছাত্রী যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তাছাড়া ওই সুপার নিজে প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষার্থীদের সাথে পাঠদানের নামে অনৈতিক কথাবার্তা বলেন ও ছাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত প্রদান করেন।

ওই ছাত্রী বলে, ঘটনার দিন ক্লাসে আসেন সুপার হুজুর। এসময় পাঠদানের নামে আমার শরীরের হাত দেন ও আপত্তিকর কার্যকলাপের চেষ্টা করেন। বাধা দিলে তিনি আমার ওড়না ধরে টানেন। উপায়ন্তর না দেখে ওই অবস্থায় ক্লাসের বেঞ্চে বসে চোখের পানি ফেলি। বিষয়টি আমার সব বান্ধবী ও একজন শিক্ষিকাকে জানাই।

ছাত্রী বলে, মাদ্রাসা সুপার প্রায়শই এমন আচরণ করেন। শুধু আমি না, অন্যান্য ক্লাসের ছাত্রীদের সাথেও এমন খারাপ আচরণ করেন। ঘটনার পর সুপার হুজুরের বিরুদ্ধে সভাপতি বরাবর অভিযোগ দেই। এর কোন ব্যবস্থা না করায় আমি ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে ইউএনও বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। এখন আমি আতংকে রয়েছি। সে আরও জানায়, একই ঘটনায় আমার একজন বান্ধবীও মাদ্রাসায় আসছে না।

ছাত্রীটি আরও জানায়, এক পর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলে গত ৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আখই (আতিকুর রহমান আখই) চাচাসহ মাদ্রাসার শিক্ষক আমাদেরকে ক্লাসে এসে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে বলেন। এটা মাদ্রাসার বিষয় মাদ্রাসায় মীমাংসা হবে বলে তিনি ধমক দেন।

এসময় উপস্থিত ছাত্রীর চাচা বলেন, ওইদিন (৩১ অক্টোবর) বিকালে আতিকুর রহমান আখইসহ দুজন শিক্ষক আমাদের অনুপস্থিতিতে বাড়িতে এসে একটি কাগজে আমার ভাতিজির লিখিত স্বাক্ষর নেন। আমাদের কোন কিছু অবগত না করে এভাবে আমাদের মেয়ের স্বাক্ষর নেয়ায় আমরা আতঙ্কে আছি। ওইদিন আমরা জানতে পারি, আমার ভাতিজির সাথে খারাপ কিছু ঘটেছে। তাই পরেরদিন (১নভেম্বর) ইউএনও বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোন খবর পাইনি। আমরা নিরাপত্তাহীনতার মাঝে আছি। তাই ভাতিজিকে মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছি না। উনারা আরও বলেন, মাদ্রাসা সভাপতি কর্তৃক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। তাছাড়া ওই মাদ্রাসা সুপার সভাপতির নিজ ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং আস্থাভাজন। তাই সুপারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।

এবিষয়ে মাদ্রাসার সভাপতি কর্তৃক তদন্ত কমিটির প্রধান ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য আতিকুর রহমান আখই বলেন, অভিযোগের বিষয়টি সভাপতি আমলে নিয়ে আমিসহ আরও দুইজন শিক্ষককে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আমরা তদন্ত রিপোর্ট উনার কাছে জমা দিয়েছি। তিনি শিক্ষার্থীদের বরাত দিয়ে বলেন, মাদ্রাসা সুপার নিজের মেয়ে মনে করে ওই ছাত্রীকে আদর করার চেষ্টা করেন।

কুলাউড়া জালালীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুস শহীদ বলেন, আমি মাদ্রাসায় যোগদানের আগে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ক্লাস ছুটি দিয়ে মাদ্রাসা থেকে চলে যেতেন। আমি এসে ক্লাসে পাঠদানের বিষয়টি কড়াকড়িভাবে দেখেছি। তাই মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে এই মিথ্যা অপপ্রচার করাচ্ছে।

এব্যাপারে জানতে চাইলে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আব্দুর রউফের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে এবিষয়ে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, আমি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। প্রতিবেদন যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনোয়ার বলেন, ইউএনও (সদ্য বিদায়ী মো. আশেকুল হক) বরাবর অভিযোগের অনুলিপি পেয়েছি। তবে তদন্তের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। উপজেলা বৈঠকে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন হবে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল লাইছ বলেন, ঘটনার তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিউর রহিম জাদিদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত