শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯ ইং

শাকিলা ববি

২৭ মে, ২০১৯ ০০:৩৮

সিলেটের ক্রেতারাও এখন অনলাইনমুখী, বাড়ছে বিক্রেতাও

প্রতীকী ছবি

বদলে যাওয়া সময়ের সাথে সাথে বদলাচ্ছে কেনাকাটার ধরণ। ব্যস্ত জীবনে এখন অনেকেই চান ঘরে বসে কেনাকাটা করতে। ক্রেতাদের এই চাহিদার ভিত্তিতে কেনাকাটায় যোগ হয়েছে নতুন বাজার ‘অনলাইন’। জামা, জুতা, শাড়ি, কসমেটিকস, আতর, টুপি অলংকার কি নেই অনলাইনে। ওয়েবসাইট, পোর্টাল, ফেসবুক পেইজ, গ্রুপের মাধ্যমে সবই কেনাবেচা হচ্ছে অনলাইন বাজারে।

অর্ডার করলে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে বাসায়। মূল্য পরিশোধে তেমন ঝামেলা নেই। ব্যাংক, মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই মূল্য পরিশোধ করা যায়। ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে বা গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পর দাম দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। ফলে দিনদিন সিলেটের ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে অনলাইনে কেনাকাটায়। ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ায় বিক্রেতারাও এখন অনলাইনমুখী। আর ঈদের মতো উৎসবের অনুসঙ্গে অনলাইনে ব্যস্ত বিপনী বিতানের চাইতে ভিড়ভাট্টা কম নয় মোটেই।

অনলাইন ব্যবহারকারীদের মধ্যে তরুণরাই এগিয়ে আছেন। তাই অনলাইন ব্যবসায় তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ কাজ করছে। কেবল বিক্রেতা নন ক্রেতাদের একটি বড় অংশও এই তরুণ সমাজ। এই তরুণদের ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাশন হাউসগুলোও নিজেদের পন্য শোরুম, মার্কেটের পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি করছে।

সিলেটের একটি জনপ্রিয় বুটিকশপ ‘ষড়ঋতু’। প্রকৃতি, প্রেম, পার্বণে স্লোগান নিয়ে ২০১০ সালে সিলেটের লামাবাজার এলাকায় যাত্রা শুরু করে এই বুটিকশপ। ২০১৩ সালে এই ফ্যাশন হাউসের নামে একটি ফেসবুক পেইজ খুলেন ষড়ঋতু'র পরিচালক নাজমা পারভিন। এরপর থেকে শো রুমের পাশাপাশি ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি শুরু করে এই বুটিক শপের পরিচালক।

ষড়ঋতুর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ন কবির জুয়েল বলেন, ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচানোর জন্য অনলাইনে ক্রেতার সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। শুধু ক্রেতাই বাড়ছেন না, আগের তুলনায় এখন ক্রেতারা অনেক সচেতনও হয়েছেন। ক্রেতারা এখন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দামাদামী করেন, যাচাই করেন।

অনলাইনে ক্রেতা বাড়লেও আস্থার জায়গা কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু অনলাইন ব্যবসায়ীদের প্রতারণার কারণে ক্রেতাদের আস্থাও কমেছে। এক্ষেত্রে বিক্রেতাদের ব্যবসায়ীক দিক থেকে আরো স্বচ্চ ও বিশ্বস্ত হতে হবে। ক্রেতা বিক্রেতাদের আস্থার জায়গা আরো অনেক মজবুত হতে হবে। এক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মনিটরিং দরকার। অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য জবাবদিহিতার জায়গা থাকা দরকার। তা না হলে ভবিষৎতে অনলাইন ব্যবসায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। কারণ ব্যবসা কোনো বিলাসিতা না। ব্যবসা হচ্ছে প্রয়োজন। তাই যেকোনো ধরনের ব্যবসা পরিকল্পিত ভাবে করতে হবে।

হুমায়ন কবির জুয়েল আরো বলেন, অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসার কারণে ক্রেতাদের অনেক সুবিধা আছে। যেমন এখন কুমিল্লাতে বসে একজন গ্রাহক সিলেটের অরজিনাল মনিপুরি শাড়ি কিনতে পারেন। যেটা আগে সম্ভব ছিল না। যে কেউ নিজ ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অল্প সময়ে জিনিস কিনতে পারেন। এটাই হচ্ছে অনলাইনে কেনাকাটার বড় সুবিধা।

সিলেটের শিবগঞ্জ এলাকার আমিনা খুশি ২০১৬ সালে ‘গ্ল্যামডাষ্ট’ নামে ফেসবুকে পেইজ খুলে একটি অনলাইন শপ শুরু করেন। সেখানে তিনি জামা কাপড়, অলংকার, জুতা ও কসমেটিকস কেনাবেচা শুরু করেন। প্রথমে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল তারা বিকিকিন। ধীরে ধীরে ক্রেতাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই তিনি ‘গ্ল্যামডাষ্ট ইম্পোট ফ্রম ইউকে এন্ড চায়না’ নামে একটি গোপন গ্রুপ খুলেন। সেই গ্রুপে বিভিন্ন বয়সের ১২ হাজারের উপরে সদস্য আছেন। সেখানে তিনি লাইভে এসে বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শন করে বিক্রি করেন।

আমিনা খুশি বলেন, অনলাইন থেকে পণ্য কেনার জন্য এখন অনেক ক্রেতা আছেন। ক্রেতাদের চাহিদার জন্য অনলাইন বিক্রেতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম যখন শুরু করি তখন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল সেইল। এখন এই গন্ডি ছাড়িয়ে মূল ধারায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রুপ নিয়েছে আমার গ্ল্যামডাষ্ট। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সবার হাতে হাতে মোবাইল, ফেসবুক। যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ক্রেতারা অর্ডার করেন। আমার মনে হয় মার্কেটে দোকান নিয়ে বসার চেয়ে অনলাইনে ব্যবসা অনেক ভালো এবং লাভজনক।

অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রাখতে হবে উল্লেখ করে তিনি জানান, হুটহাট করে অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা থেকে বিরত থাকথে হবে। কারণ একদল প্রতারক চক্র এই ব্যবসায় ডুকে পড়েছে। তাছাড়া অনেকেই কিছু না বুঝে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে যার ফলে কেউ গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করে লাভবান হতে চাচ্ছেন। আবার কেউ দুইতিন মাস ব্যবসা করেই ঝড়ে পড়ছেন। এক্ষেত্রে ক্রেতার যেমন প্রতারণা এবং বিভ্রান্তির শিকার হন তেমনি অন্য অনলাইন বিক্রেতাদের ব্যবসায়ও এর প্রভাব পরে।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময় সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনের শাড়ি, জামা, মালা, দুল, পাঞ্জাবি, টপ নিয়ে পারিবারিক উদ্যোগ জিনাত জাহান নিশা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ‘বিজেন্স’ এর যাত্রা শুরু করেন। দেশীয় পণ্যের প্রতি দেশের মানুষের চাহিদা বাড়াতে সুতি, খাদি, সিল্ক কাপড় দিয়ে শাড়ি, জামা তৈরি করে বিক্রি শুরু করে নিশা। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দেশীয় কাপড় যেমন লুঙ্গি দিয়ে অয়ের্স্টান ডিজাইনের বটম প্যান্ট, ফতুয়া তৈরীসহ সৃজনশীল কাজে খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠে বিজেন্স। বর্তমানে ২৯ হাজারের অধিক গ্রাহক আছে বিজেন্সের পেইজে। সারা বছর বাহারি পণ্যের সমাহার থাকলেও উৎসব অনুষ্ঠানে বিজেন্সের থাকে বিশেষ আয়োজন।

বিজেন্সের পরিচালক ও ফ্যাশন ডিজাইনার জিনাত জাহান নিশা বলেন, দেশের মানুষজন এখন অনলাইন শপিং-এ ঝুঁকছেন। আমাদের পেইজের মেসেজ সিন করলে দেখা যায় অনেক গ্রাহক জিজ্ঞাস করেন কিভাবে অর্ডার করবেন। আমরা স্বতস্পূর্ত ভাবে সবাইকে জানিয়ে দেই। আমাদের চার বছরের অভিজ্ঞতায় যা মনে হয়েছে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ ভারতীয় পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট বেশি। বিভিন্ন কারণে তারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। ক্রেতাদের চাহিদার জন্য বিক্রেতারাও ভারতীয় পণ্য বাজারে আনছেন। যার ফলে দেখা যায় আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে কিছু থাকে না। এক্ষেত্রে অনলাইন আর অফলাইন সব জায়গায় ক্রেতা বিক্রেতাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।

আমরা বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাশনকে নিরুশাহিত করতে কাজ করছি উল্লেখ করে নিশা বলেন, একটি তাঁতের শাড়ি কতটা আভিজাত্য এনে দেয় সেটা যিনি তাঁতের শাড়ি পড়েন তিনি বুঝতে পারবেন। দেখা যায় ক্রেতারা যে দামে ভারতয়ি পোশাক কিনেন এর চেয়ে কম দামে দেশীয় পোশাক কিনতে চান না। আমাদের রুচির পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দেশীয় পণ্যে বৈচিত্র আনতে হবে। দেশীয় পণ্যের ক্রেতা কম তারপরও বিজেন্স তার নিজস্ব শৈলী দিয়ে অনলাইন বাজারে ভালো ভাবে ব্যবসা করছে। ব্যবসায়ীরা যদি দেশীয় পণ্যে সৃজনশীলতা ও বৈচিত্র আনেন তাহলে দেশীয় পণ্য কিনতে ক্রেতা সংখ্যা আরো বাড়বে।

অনলাইন বাজারে ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা নিয়ে নিশা বলেন, অনলাইনে গ্রাহক বাড়ার সাথে সাথে প্রতারণাও বেড়েছে। এর প্রভাব আমাদের মত অনলাইন ব্যবসায়ীদের উপরও পরে। এক্ষেত্রে ক্রেতারা যে পেইজ থেকেই পন্য কিনেন সেই পেইজের গ্রহনযোগ্যতা দেখবেন। পেইজের পরিচালকের সাথে কথা বলবেন। অনেক সময় পেইজ এডমিনদের কথা বলার ধরন দেখেও বুঝা যায় তিনি ভালো না খারপ পণ্য দিবেন। ব্যবসায়ীদেরও সততা থাকতে হবে। কোনো কারণে পণ্য কেনা বেচায় কোনো ভুল হলে অনলাইন ব্যবসায়ীদের পরিবর্তন বা বদলানোর সুযোগ দিতে হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত