শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

তপন কুমার দাস, বড়লেখা

১১ জুন, ২০১৯ ২০:০৮

বড়লেখায় অ্যাম্বুলেন্স আটকে শিশু মৃত্যু: বাদীকে না জানিয়েই অভিযোগপত্র দিলো পুলিশ

৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট ডেকেছিলো পরিবহন শ্রমিকরা। ধর্মঘট পালনকালে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় শ্রমিকরা আটকে দিয়েছিলো একটি অ্যাম্বুলেন্সও। ওই অ্যাম্বুলেন্সে ছিলো ৭ দিন বয়সী মূমূর্ষ এক শিশু। অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় পথেই মারা যায় সে। গণমাধ্যমে সেই ঘটনা উঠে আসলে দেশব্যাপী সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা দেয়।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। তবে এ দাখিল করা হয়েছে খুবই গোপনে। এমনকি মামলার বাদীকেও জানানো হয়নি।  গত ৩০ এপ্রিল বড়লেখার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হরিদাস কুমারের আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম। ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে এই অভিযোগপত্র (নম্বর-৭৪) দেওয়া হয়।

তবে প্রায় দেড় মাস আগে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হলেও এখনও তা জানেন না মামলার বাদী মারা যাওয়া শিশুটির চাচা আকবর আলী।

মামলার বাদী আকবর আলী মঙ্গলবার (১১ জুন) বিকেলে বলেন, ‘পুলিশ আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। চার্জশিট কিভাবে দিয়েছে তাও জানি না। লোকমুখে শোনেছি চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে যাদের আসামী করা হয়েছে, তাদের পরিবারের লোকজন আমার বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করতেছে। তখন আমি শুনেছি চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলায় একটা স্বাক্ষর আছে আমার। আমাকে জানানো দরকার ছিল।’

দাখিলকরা অভিযোগপত্রভুক্ত আসামী করা হয়েছে- শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন (৩৪), মো. আলী হোসেন (৩৮), নিজাম উদ্দিন (৩৫), কয়েছ আহমদ (২৮), আলীম উদ্দিন (৪৮), মো. জাকির হোসেন রাজন (২৪), রয়নুল ইসলাম (২৭), জসিম (৩০), হেলাল উদ্দিন (২৮), ফজল আলী (২৫), শামীম (৩৫), শরফ উদ্দিন (৩৫) ও জুয়েল দাস (২০) কে। এদের সকলের বাড়ি বড়লেখা উপজেলায়।

আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বড়লেখা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম মঙ্গলবার (১১ জুন) বলেন, ‘এজাহারে কারো নাম ছিল না। অজ্ঞাতনামা আসামী ছিল। মামলার তদন্তকালে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তদন্তে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষ্য ও প্রমাণ পাওয়ায় ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’
 
অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয় বাদী জানেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ওই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্তের ফলাফল ও অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয় বাদীকে জানানো হয়েছে।’

গত ২৮ অক্টোবর উপজেলার সদর ইউনিয়নের অজমির গ্রামের কুটন মিয়ার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে সকালের দিকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। অভিভাবকরা অ্যাম্বুলেন্সে করে সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার পথে বড়লেখা উপজেলার পুরাতন বড়লেখা বাজার, দাসেরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে অ্যাম্বুলেন্সটি পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্সটি চান্দগ্রাম নামক স্থানে গেলে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি আটকে চালককে মারধর করেন। প্রায় দেড়ঘণ্টা এখানে অ্যাম্বুলেন্সটি আটকা থাকে। অ্যাম্বুলেন্স আটকা অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। দুপুর দেড়টার দিকে গাড়ি ছাড়া পেলে শিশুটিকে পাশের সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

নির্মম এ ঘটনার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সারাদেশে শুরু হয় তোলপাড়। ঝড় ওঠে নিন্দার। ঘটনার সঙ্গে জড়িত পরিবহন শ্রমিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এই ঘটনার তিনদিন পর ৩১ অক্টোবর শিশুর চাচা আকবর আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়ে ১৬০ থেকে ১৭০ জন শ্রমিককে আসামি করে থানায় একটি মামলা (নং-১৮) করেন। শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। এরপর চলতি বছরের ১০ জানুয়ারির মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ওই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় তথ্য আদালতে প্রতিবেদন আকারে দাখিল করারও জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর সাতদিন বয়সি শিশু মৃত্যুর অন্তত ৩৮ দিন পর ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লাশ উত্তোলন করা হয়। এ সময় বড়লেখা উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী হাকিম শরীফ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পুনরায় দাফন করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বড়লেখা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে শিশুটির লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত ও ময়নাতদন্তের জন্য গত ৫ নভেম্বর বড়লেখার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হরিদাস কুমারের আদালতে আবেদন করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ নভেম্বর আদালত এক আদেশে শিশুটির লাশ কবর থেকে উত্তোলনের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিজ্ঞ জেলা হাকিম মৌলভীবাজারকে বলেন। আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ নভেম্বর জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে বড়লেখার সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী হাকিম শরীফ উদ্দিনকে লাশ উত্তোলনের সময় উপস্থিত থাকার জন্য নিয়োগ করা হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত