শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

হৃদয় দাশ শুভ, শ্রীমঙ্গল

০৭ আগস্ট, ২০১৯ ১৮:৩৭

শ্রীমঙ্গলে কামার পাড়ায় বেড়েছে ব্যস্ততা

ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কামার পাড়ায় বেড়েছে ব্যস্ততা। শ্রীমঙ্গলের হবিগঞ্জ সড়কের একটি গলিতে অবস্থিত কামারপট্টি। বছরের ১১ মাসই সেখানে বিরাজ করে নিস্তব্ধতা কিন্তু ঈদ-উল-আযহা এলেই কামারপট্টিতে বেড়ে যায় ব্যস্ততা ৷

বুধবার (৭ আগস্ট) সকালে শ্রীমঙ্গল কামারপট্টিতে গিয়ে দেখা যায় কামাররা ব্যস্ত বিভিন্ন ধরনের চাকু, ছুরি, চাপাতি তৈরিতে। কেউ কেউ আবার পুরনো ছুরি, চাকু, বটিগুলো শান দিচ্ছেন ৷

সারা দেশের ন্যায় শ্রীমঙ্গলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে একসময়ের দাপুটে কামারশিল্প ৷ কামারশিল্পের সেই সোনালী দিনগুলো এখন আর নেই। বছরের এগারো মাস খুঁড়িয়ে চলা এ শিল্পটি একটু চাঙ্গা হয় কোরবানির ঈদ এলে ৷ শ্রীমঙ্গলের কামার শিল্পীরাও তাই সারাবছর  অপেক্ষা করতে থাকেন ঈদ-উল-আযহার ৷

জ্বলন্ত উনুনের সামনে বসে কথা হচ্ছিলো কামারশিল্পী পবিত্র কর্মকারের সাথে। তিনি খেদ প্রকাশ করে বললেন, আসলে ভাই ঈদ এলেই কদর বাড়ে আমাদের ৷ সারাবছরের উপার্জন করতে হয় এই একটা ঈদের সিজনে ৷ এগারো মাস অপেক্ষা করে বসে থাকি কখন ঈদের সিজন আসবে আর আমরা কিছু টাকার মুখ দেখবো ৷

তিনি বলেন, সারাবছর বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে খুব কষ্ট করে চলতে হয় ৷ মানুষ এখন খুব আধুনিক হয়ে গেছে সবাই সবজি ও অন্যান্য জিনিসপত্র কাটাকুটি করার জন্য বিভিন্ন মেশিন ব্যবহার করে তাই আমাদের তৈরি জিনিসের আর প্রয়োজন পরে না৷

পাশেই বসা আরেক কামার শিল্পী সুধাংশু কর্মকার বলেন, সারা বছর কাজকর্ম না থাকলেও এখন দম ফেলার ফুসরত নেই ৷ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন ধরনের দা, বটি, ছুরির। সেসব অর্ডার সরবরাহ করতে গিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি ৷

ষাটোর্ধ আরেক কামার শিল্পী সুধাংশু কর্মকার বলেন, ‘ঈদ আইলেই আমরার কদর বাড়ে। ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় আছি কিন্তু এখন যেরকম দুর্দিন চলছে সেরকম আর কোনো সময় হয়নি ৷ আগে সারা বছরই টুকিটাকি কাজ থাকতো কিন্তু এখন এক ঈদ ছাড়া আর কোন উপায় নাই ৷ আমাদের অনেক কামারশিল্পী এখন এ পেশা ছেড়ে বিকল্প পেশায় যোগ দিচ্ছেন ৷ বংশানুক্রমে আমরা যে শিল্পের শিল্পী হিসাবে তৈরি হয়েছি সেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর হবে না। এ পেশায় ভবিষ্যৎ নেই তাই তারা এ পেশায় আসছে না ৷



কামারপট্টিতেই কথা হয় শামসুল ইসলাম নামের একজন গ্রাহকের সাথে। তিনি বলেন, আসলে ঈদের আগে ছাড়া এখানে খুব একটা আসা হয় না ৷ কারণ বাড়ীতে এখন কাটাকুটির জন্য বিদেশী কাটার চপার এগুলো খুব সহজলভ্য এবং দামেও সস্তা তাই এগুলোই বেশী করে ব্যবহার করা হয় ৷ তবে কোরবানির ঈদে যেহেতু একটু বেশী মাংস কাটাকাটি করতে হয় তাই আবার আমরা ট্র্যাডিশনাল জিনিস কেনার জন্যই এখানে আসি ৷

কামারপট্টি ঘুরে দেখা যায়, দা আকৃতি ও লোহা ভেদে ১শ’ থেকে ৪৫০ টাকা, ছুরি ৫০ থেকে ৩০০ টাকা, চাকু প্রতিটি সর্বোচ্চ ৫০ টাকা, হাড় কোপানোর চাপাতি প্রতিটি ২’শ থেকে ৪শ’ টাকা এবং ধার করার স্টিল প্রতিটি ৫০ টাকা করে বেচাকেনা হচ্ছে। পুরানো যন্ত্রপাতি শান দিতে ১শ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন উদ্দীপ্ত তারুণ্যের সংগঠক সনেট দেব চৌধুরী বলেন,আসলে কামারশিল্প এখন মৃতপ্রায়। বিদেশী বিভিন্ন ধরনের ছুরি, চাকু দা ও বটি দেশের বাজারে খুব বেশী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ এখন আর কামার পট্টিতে জিনিস বানাতে আসে না ৷ এর ফলে কামাররা প্রায় সময়ই বেকার বসে থাকে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায় ৷ সরকারের উচিত এই কামারশিল্পকে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া এবং বাইরের দেশ থেকে আসা ছুরি, চাকু, দা, বটির উপর উচ্চহারে কর নির্ধারণ করা ৷ এতে করে আমাদের স্থানীয় কামাররা উপকৃত হবে এবং এই মৃতপ্রায় শিল্পটিকে হয়তো বাঁচানো যাবে ৷

আপনার মন্তব্য

আলোচিত