বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

শাকিলা ববি

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৫১

সিলেটের স্বাস্থ্যখাত: আগ্রহ কেবল ভবন তৈরিতেই

চিকিৎসকসহ নানা সঙ্কটে সিলেট বিভাগের ৩৪ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২২টিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করলে লোকবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে মিলছে না সেবা

সিলেট বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সেবা না বাড়লেও বেড়েছে শয্যা। বিভাগের বেশিরভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ থেকে ৫০ শয্যা করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতি এবং জনবলের অভাবে রোগীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন না। ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালানো হচ্ছে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে। বেশিরভাগ উপজেলায় ৩১ শয্যা হাসপাতাল চালানোর জন্যও লোকবল ও যন্ত্রপাতি না থাকলেও সেখানে ৫০ শয্যার হাসপাতালের নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

৫০ শয্যায় উন্নীতের নামে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কেবল ভবনই তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসকসহ লোকবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতি প্রদানে নেই তেমন কোনো আগ্রহ। এতে সরকারী বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি ভবনগুলো কোনো কাজই আসছে না।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, সিলেট বিভাগে শুধুমাত্র হাসপাতালের ভবনের নামে বক্স বানানো হচ্ছে। কিন্তু এই বক্সে কে থাকবে, কারা সেবা নিবে, কারা সেবা দিবে, কি দিয়ে সেবা দিবে এই বিষয় নিয়ে কেউ ভাবেন না। শুধু একের পর এক ভবন বানানো হচ্ছে। আর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, সিলেটের স্বাস্থ্যখাত অন্যান্য বিভাগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। চরম জনবল সংকট রয়েছে সিলেট জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। ২০১১ সালের পর আর কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি এই বিভাগে। আমাদের চাহিদা ও প্রয়োজনের কথা বলে কিছুদিন পর পরম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অফিসে চিঠি পাঠাই। এতে কোনো কাজ হয় না।

সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১১টিতে আছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর মধ্যে সদর উপজেলায় কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকার নিয়ম না থাকার কারণে সিলেট সদর উপজেলায় কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেই। অপরদিকে ওসমানীনগর উপজেলা নতুন হওয়ায় এখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য শুধু মাত্র জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

সিলেট জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ২০০৯ সালে গোয়াইনঘাট, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ থেকে ৫০ শয্যা করা হয়েছে। ২০১৩ সালে গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৬ সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২০১৭ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২০১৮ সালে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ করা হয়।

এই সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের ঘোষণা দেন বিভিন্ন সময়ে সরকারে বিভিন্ন পদে থাকা মন্ত্রী ও এমপিরা। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে হাসপাতাল ভবন বানানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যা হাসপাতালের কার্যক্রম।

চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োগ না দেওয়ার ফলে উপজেলাগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। সিলেট জেলার বেশিরভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নেই ৩১ শয্যা হাসপাতালেরও জনবল। অথচ পরিকল্পনা ছাড়াই এগুলোকে উন্নীত করা হয়েছে ৫০ শয্যায়।

সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য একটি ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ জন চিকিৎসক, ১৫ জন ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা, ৬৭ জন ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী ও ২৩ জন ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী প্রয়োজন। যানবাহনের মধ্যে ২টি এম্বুলেন্স ও ৪টি মোটর সাইকেল থাকে।

এছাড়াও রোগীদের জন্য বহির্বিভাগ, জরুরী বিভাগ, ও অন্তবিভাগে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা, উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (অর্থোপেডিক্স, মেডিসিন, হৃদরোগ, গাইনি এন্ড অবস, সার্জারি, শিশু, এ্যানেসথেসিয়া) সেবা প্রদান করা। ২৪ ঘণ্টা জরুরী বিভাগে আগত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা, উন্নতমানের প্যাথলজিক্যাল, ও রেডিলেজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা। মাঠপর্যায় থেকে রেফার্ডকৃত রোগীদের উন্নত সেবা প্রদান করা। সঠিক তথ্য সংরক্ষণ আদান প্রদান ও ব্যবহার উপযোগী (ই.গভার্নেন্স) করা। সকল রোগীর মেডিকেল রেকর্ড কম্পিউটারে সংরক্ষণ রাখা। ডমিসিলিযারী সার্ভিস ও এনফোর্সমেন্ট অব পাবলিক হেলথ এক্ট সার্ভিস সেবা প্রদান ও উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রেফার্ড নিশ্চিত করা ও ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী এম্বুলেন্স সার্ভিস প্রদান করার নিয়ম রয়েছে।

একটি ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এই পরিমাণ চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি এবং জনবল থাকার নিয়ম থাকলেও সিলেট বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি ৩৫ শতাংশ ও অন্যান্য পদে জনবল (২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী) রয়েছে ৩০ শতাংশ।

যার ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন সেক্টরের প্রধানরা বলছেন, দেশের অন্যান্য বিভাগের চেয়ে সিলেট বিভাগ স্বাস্থ্য সেবা খাতে পিছিয়ে রয়েছে।

সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে ১২টি, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে ২২টি।

সারা বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৯১০জন। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৪৮০ জন চিকিৎসক। সিনিয়র স্টাফ নার্স প্রয়োজন ১হাজার ৩২৩ জন। কর্মরত আছেন ১ হাজার ১৪৭জন। নার্সিং সুপারভাইজার প্রয়োজন ৪৬জন। কর্মরত আছেন ২৩ জন। স্টাফ নার্স প্রয়োজন ৫৬জন কর্মরত আছেন ২৭জন। মিডওয়েফারি প্রয়োজন ১৭৪ জন। কর্মরত আছেন ৯৫জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) প্রয়োজন ৯০ জন। কর্মরত আছেন ২২ জন। রেডিওগ্রাফি (এক্সরে) টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন ৩৪ জন কর্মরত আছেন ১০ জন। ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন ১৭০ জন। কর্মরত আছেন ২৯ জন।

সারা বিভাগে ৪০টি এক্সরে মেশিন থাকলেও সচল আছে মাত্র ১৪টি। সচল এক্সরে মেশিনের মধ্যে সিলেট জেলায় আছে ৪টি, সুনামগঞ্জ জেলায় আছে ৩টি, হবিগঞ্জ জেলায় আছে ২টি ও মৌলভীবাজার জেলায় আছে ৫টি।

সিলেট বিভাগে এম্বুলেন্স আছে ৪৭টি এর মধ্যে সচল আছে ৩৪টি। সচল ৩৪টি এম্বুলেন্সের মধ্যে সিলেট জেলায় আছে ১১টি, সুনামগঞ্জ জেলায় আছে ৯টি, হবিগঞ্জ জেলায় আছে ৬টি ও মৌলভীবাজার জেলায় আছে ৮টি।

এ ব্যাপারে সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. দেবপদ রায় বলেন, সিলেট বিভাগের চিকিৎসক সংকট এবছরই কেটে যাবে। আর আমাদের নার্সিং স্টাফ ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ রয়েছেন। তবে আমাদের ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীর সংকট আছে। এই বিভাগে নিয়োগ হচ্ছে না। ৪র্থ শ্রেণীর পদও খালি হচ্ছে কিন্তু পূরণ হচ্ছে না। যেগুলো পূরণ হচ্ছে সেগুলো আউট সোর্সিংয়ের ঠিকাদারের মাধ্যমে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের আরেকটি বড় সংকট আছে মেডিকেল ল্যাব টেকনোলজি, রেডিওগ্রাফি (এক্সরে) টেকনোলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট পদ নিয়ে। এই পদগুলোতে জনবল নেই বললেই চলে। এই পদগুলোতে নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে সুপারিশ করা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত