রবিবার, , ১৮ নভেম্বর ২০১৮ ইং

তাসলিমা খানম বীথি

০৯ মে, ২০১৮ ০২:৩৪

মায়াবিনী টাঙ্গুয়া, রূপের রাণী

আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা
কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে।

কোকিলের কুহু ডাক আর গাছে গাছে রক্ত পলাশ, কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতির বুকে রঙ ছড়াবে। আম্রমুকুলের আগমনে ঋতুরাজ প্রকৃতি ফুলে মধুময় ওঠবে বসন্ত। যৌবনের উচ্ছ্বাস আর আনন্দের মন-প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রথম দিন আজ। নতুন রূপে প্রকৃতিকে সাজাবে ঋতুরাজ বসন্ত। এ ঋতুতে আমগাছ মুকুলিত হয়। মৌ মৌ সুবাসে মুখরিত হয় চারিদিক। ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত।

সেই দিনটি ছিলো ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। বসন্তের প্রথম দিনে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে যাচ্ছি ভাবতেই মনটা কোকিলের মত নেচে ওঠলো। পীর স্যারের কথা মনে হতে দ্রুত রেডি হতে থাকি। কারণ তিনি সময়ের প্রতি খুবই সিরিয়াস। স্যারের বাসা আর আমার বাসা প্রায় কাছাকাছি। তাই তিনি আগেই বলে রেখেছেন যাবার সময় তাদের পরিবারের সাথে নিয়ে যাবেন। নাস্তা শেষ করে স্যারকে সাড়ে ৬টার দিকে কল করি। হ্যালো বলতেই স্যার বললেন- ‘আমরাও রেডি হইরাম, বাসা থাকি বাইর হইবার সময় তোমারে কল দিমু’। মোবাইলের লাইন কাটার পর। পরের কলটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। সকাল সাড়ে ৭টায় স্যারের কল আসেনি। সকাল ৮টায় গাড়ি ছাড়ার কথা। পীর স্যারের ফোন কলের অপেক্ষা না করে নিজেই কল করি। হ্যালো বলার আগেই ‘স্যরি’! তোমারে আনতে ভুলে গেছি, রিকশা করে দ্রুত আইও’। স্যারের ‘স্যরি’ বলার কারণ তখন বুঝতে পারি। আমিও ১ মিনিট লেট না করে বাসা থেকে বের হই। ভাগ্যে ভালো ফাঁকা রাস্তায় একটি মাত্র রিকশা যাচ্ছিল। ডাক দিতেই রিকশা থামলে দ্রুত উঠে পড়ি। কাজিটুলা এলাকায় আসতেই বশির ভাইয়ের কল-
-বীথি তুই কোনানো আছোত।
-তাড়াতাড়ি আয় তর ভাবীর খানদাত সিট রাকছি।
- আমি আইরাম বলে লাইন কেটে দেই।

হোটেল হলি সাইডে পৌঁছতেই আমাকে দেখে পীর স্যার বললেন- তুমি কল না দিলে তো চলেই যেতাম। গাড়ি আটকে রাখছি। তোমার জন্য। দ্রুত উঠে পড়। গাড়িতে উঠে ভাবীদের সালাম দিয়ে সিটে বসতেই রোটারিয়ান মিজানুর রহমান এসে হাজির। গাড়ির জানালা সামনে দাঁড়িয়ে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে তিনি অন্য গাড়িতে ঢুকে গেলেন।

২.
সকাল ৮টায় আমাদের গাড়ি পঙ্খীরাজের মত ছুটে চলল প্রকৃতির কন্যা টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে। পীর স্যারের নেতৃত্বে রোটারিয়ানদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ৪টি গাড়িসহ ভ্রমণ যাত্রা শুরু হয়। সর্বপ্রথম গাড়িটি ছিলো আমাদের। সেই গাড়িতে ছিলেন পীর স্যার, মিসেস পীর, মিসেস বশিরুদ্দিন, পীর স্যারের একমাত্র মেয়ে রিয়া, শামীমা আপা ও রাইসা। আমার পাশে বসা শামীমা আপা জিজ্ঞাসা করলেন কিসে কাজ করি? বললাম অনলাইন পত্রিকায় সিলেট এক্সপ্রেসে। ভিজিটিং কার্ড দিতেই তিনি মোবাইলে ফেইসবুকে সার্চ দিয়ে সিলেট এক্সপ্রেস-এর লাইক দিয়ে আমাকেও ফ্রেন্ড করে নিলেন। গাড়িতে প্রথমে কিছুটা নীরবতা ভেবেছিলাম পুরো ভ্রমণ হয়তো নিরামিষ কাটবে। কিন্তু না। শামীমা আপা বেশ হাসিখুশি। মনে মনে ভাবলাম। যাক কথা বলার একজন সঙ্গী পাওয়া গেলো।

৩.
মদিনা মার্কেটে সামনে আসতেই আমাদের গাড়িটি থেমে যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরে যাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন আরও কয়েকজন। গাড়ি থামতেই অট্টহাসি দিয়ে পীর স্যার বলে উঠলেন, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, সিট খালি নাই’। ভাবীর সাথে আমাকে পরিচয় করে দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। সে কথা মনে হতে পীর স্যার ভাবীকে বললেন ‘বীথিরে চিনছোনি, অনলাইন পত্রিকায় সিলেট এক্সপ্রেসে কাজ করে। ভাবী জবাব দেন-বীথি’র লগে মাত অইছে। স্যার ড্রাইভারকে গান অন করার কথা বললেন। গান ছাড়া কী ভ্রমণ জমে। কখনও না। আমিও খুব মিস করছিলাম গানকে। যাই হোক। গানের জন্য পীর স্যারকে মনে মনে ধন্যবাদ দেই। হাসন রাজা, লালন শাহ, শাহ আব্দুল করিম এর গানে জমে উঠে আমাদের ভ্রমণ।

৪.
ভাবীদের জীবনে ফেলে আসা বসন্তের কথা বলছেন। সেইদিনগুলো কত রঙিন ছিলো, কত আনন্দের ছিলো। তারা কথা বলছেন আর উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন। আমি আর শামীমা আপা কথা বলছি সাহিত্য নিয়ে। তিনিও কবিতা লেখেন। ভ্রমণে শুরুতে নীরবতা পালন করে আসছে রিয়া। তার সাইলেন্স থাকা দেখে ভাবছি সে কীভাবে কথা না বলে থাকছে। আমি হলে এতক্ষণ বোমার মত ফুটে যেতাম। জাউয়াবাজার আসতেই ভাবলাম চলে আসলাম নাকি। কিন্তু না। এখনো অনেক দেরি। তখন পীর স্যার একটি বাড়ি দেখিয়ে বললেন, এটি হচ্ছে মঞ্জিলা পলা উদ্দিন-এর বাড়ি। পাশেই সুরমা নদী বয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ রোডে ভটের খাল নদী দেখি। স্যার বলছেন এটি নাম ভট্টাচার্য থেকে ভটের খাল নদী হয়েছে। তখন মিসেস পীর বললেন বটগাছ থেকেও হতে পারে এটির নাম।

৫.
নীল আকাশের নীচে সারি সারি গাছপালা, সবুজ ধানক্ষেত, পুকুর, পানিতে সাঁতার কাটা হাঁসের দল। কতদিন এসব দৃশ্য দেখি না। পীর স্যার বললেন- জাউয়াবাজার হচ্ছে সবচেয়ে বড় গরুর হাট। আজ বাজার বসছে। লোকজন ভিড় করছে বাড়ির জন্য বাজার করতে। এসময় স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন সাঁতার জানি কি না? বললাম-না। উত্তর শুনে মিসেস পীর বললেন, তুমি যত বড় মানুষ বা সাংবাদিক হও না কেন? সাঁতার না জানলে সব মাটি হয়ে যাবে। ভাবীর কথা শুনে পীর স্যার বললেন- আমি যদি পানিতে ডুবে যাই তাহলে নাকি ড্রোন আনাবেন আমাকে উদ্ধার করতে। এ কথা শুনে সবাই এক সাথে হেসে ওঠলেন।

৬.
সকাল সাড়ে ৯টায় আমাদের গাড়ি এসে থামে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড মেজর ইকবাল রোড সুনামগঞ্জ হোটেল নূরানি মোল্লা রেস্টুরেন্টের সামনে। গেস্টরুম দেখে মনে হলো হয়তো ভ্রমণ শেষে থাকা হবে। মিজান ভাই আসতেই তাকে বললাম- টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরে কী রাত হয়ে যাবে? তারপর কী আমরা এখানে থাকবো। টাঙ্গুয়া ঘুরে আপনাকে রেখে চলে যাব সিলেটে। হা...হা তিনি হেসে ওঠলেন। বুঝতে পারলাম। থাকবো না। রুমে বসেই পরোটা, ডিম ভাজি ও সবজি দিয়ে নাস্তা করি সবাই। গাড়িতে উঠার আগে মিজান ভাইয়ের মোবাইলে ক্যামেরা ক্লিকে বন্দি হই আমরা। নাস্তা শেষ করে যে যার গাড়িতে উঠতে শুরু করেন। এদিকে আমাদের গাড়ি ড্রাইভার তেল নিতে গিয়ে আসার নাম নেই। অন্যদেরকে পীর স্যার বললেন-তাহিরপুর ব্রিজে গিয়ে যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করেন। এসময় আমরা হোটেল নূরানি বসে চা খাওয়ার মধ্যে দিয়ে হালকার ওপর ঝাপসা আড্ডা দেই।

৭.
সকাল সাড়ে ১০টা আবারো আমাদের গাড়ি ছুটে টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে। সময় নষ্ট করার জন্য গাড়িতে উঠেই স্যার রেগে গিয়ে ড্রাইভারকে ঝাড়ি দিলেন। তাকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। রাগ করে কথা বলার সময় স্যারের মুখটি রক্তজবার মত লাগছিল। এই প্রথম রাগান্বিত মুখটি দেখলাম পীর স্যারের। তাহিরপুরে ব্রিজে এসেই আমরা বাকিদেরকে পেয়ে যাই। প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে মিসেস পীর বললেন-

আমাদের দেশ তারে কত ভালোবাসি
সবুজ ঘাসের বুকে শেফালীর হাসি
মাঠে মাঠে চড়ে গরু নদী বয়ে যায়
জেলে ভাই ধরে মাছ মেঘের ছায়ায়।

আ.ন.ম.বজলুর রশীদের লেখা ‘আমাদের দেশ’-শিরোনামে কবিতাটি চমৎকার আবৃত্তি করছিলেন মিসেস পীর। কাঁঠাল গাছ, আম গাছ, কলাগাছ, বাঁশঝাড়, সবুজ ধানক্ষেতের মাঠ-ঘাট পেরিয়ে আমাদের গাড়ি চলছে যখন। হঠাৎ ধাক্কা! কি ব্যাপার? ওহ মেঠো পথে গর্ত থাকায় গাড়ির চাকা আটকে যায়। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম তখন চোখ যায় একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির দিকে। বাইরে থেকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ ছিমছাম আর পরিপাটি। আর বাড়ির সামনে গম্বুজের মতো খাড়া বিশাল বিশাল খড়ের গাদা। বেলা ১২টা আমরা বিশ্বম্বরপুর আসি। বিশ্বম্ভরপুর সুনামগঞ্জ সামনে শাহ আরফিন-এর মাজার। তবে শারফিন নামে পরিচিত। গাড়ির জানালা দিকে তাকাতেই গ্রামের ছোট্ট মেঠো পথ দিয়ে বইখাতা বগলে করে হেঁটে যাচ্ছে সারিবদ্ধ কয়েকজন কিশোর কিশোরী। অন্যদিকে কৈশোরে বেড়ে ওঠা দুরন্তপনা শিশু-কিশোরদের গ্রামের পুকুরে ঝাপাঝাপি আর লাফালাফি দেখে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর কথা মনে পড়ছিল। শৈশব নিয়ে তিনি বলেছিলেন-

‘ছেলেবেলায় আমরা জানতাম না ছেলেবেলা এত স্বপ্ন আর মাধুর্যপূর্ণ আছে। ছেলেবেলা খুবই একটা আতঙ্কজনক সময়। স্যারদের বা আম্মা-আব্বার হাত শুধু আমাদের কানের দিকে আদর আপ্যায়নের করার জন্য এগিয়ে আসতে চায়। স্কুলে মার খেতে হয়, অপমান সহ্য করতে হয়। ছোট বলে উপেক্ষা, অবহেলা মধ্যে পরতে হয়। সুতরাং শিশুর কাছে শৈশব কিন্তু এত সুন্দর সময় নয়। শৈশব সুন্দর হয় যখন আমরা শৈশবকে হারাতে থাকি এবং শুধু শৈশব না, যে কোন জিনিস সুন্দর হয়ে ওঠে যখন আমরা একবার হারাতে থাকি।’

তখন আমারও মনে হলো। সত্যিই তো গ্রামের এই শিশুরা জানে না। তাদের জীবনে সবচেয়ে সুন্দর সময় পার করছে। গাছে গাছে কৃষ্ণচূড়াকে দেখে মনে হচ্ছে রক্তিম হয়ে ফুটেছে আমাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য। যাত্রীবাহি মোটরসাইকেল ছুটে যাচ্ছে তাদের গন্তব্য স্থানে। পীর স্যারের কাছ থেকে জানতে পারি। প্রতি বাইকে ১৫০ টাকা করে ভাড়া নেয়। যাত্রীরা ইচ্ছে মত মোটরসাইকেল করে যে কোন স্থানে যেতে পারেন। তাহিরপুর ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাতে পৌনে ১টা। তখন পীর স্যার দৈনিক যুগান্তর প্রতিনিধি আজাদ সাহেবকে কল করে বললেন- আমাদের ভ্রমণে এসে যোগ দিতে। পীর স্যারের আন্তরিকতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ আমাকে সবসময় মুগ্ধ করে।

শনির হাওরের কাছে আসতেই গাইড হিসেবে মোস্তফা কামালকে গাড়িতে উঠান। তিনি অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। ডানপাশে শনির হাওর আর বাম পাশে যাদুকাটা নদী মধ্যে দিয়ে ছুটে যাচ্ছি টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে। শনির হাওরের পাশ দিয়ে বৌলাও নদী বয়ে গেছে। বৌলাও নদী দেখে মিসেস পীর ও শামীমা আপা এক সাথে বলে উঠলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটি...

‘মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছ পালকি তে মা চড়ে
দরজাটুকু একটু ফাঁক করে।

৮.
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১.২৫ মিনিটে আমাদের গাড়ি এসে থামে টাঙ্গুয়ার হাওরে খোলা আকাশের নীচে সবুজ প্রান্তরে। আহ! চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির এমন অপরূপ রূপে চোখ জুড়ে যায়, মনকে উদাসী করে তোলে। আমাদের জন্য একটি ইঞ্জিন নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বচ্ছ নীল জলরাশি, সাথে সোনালী রোদে আর জলের বুক চিরে চলছে আমাদের ইঞ্জিন নৌকা। ইঞ্জিন নৌকার উপরে যে যার মত করে আমরা বসি। জম্পেশ আড্ডায় ইঞ্জিন নৌকা চলছে। মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতি কন্যাকে দেখছি। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে-

‘বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।’

নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যঘেরা সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরে মাঝে। যেখানে মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝর্ণা এসে মিশেছে এই হাওরে। স্বচ্ছ টলমলে জলের নিচে দেখা যায় ঘাস। অতিথি পাখি কখনো জলকেলি, কখনো খুনসুটিতে কিংবা খাবারের সন্ধানে এক বিল থেকে অন্য বিলে, এক হাওর থেকে অন্য হাওরে গলায় প্রাণকাড়া সুর তুলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে।

এ হাওরের একটি প্রবাদ আছে-‘নয়কুড়ি বিল, ছয় কুড়ি কান্দার টাঙ্গুয়ার হাওর।’ এ বিশাল জলভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরে শীতের শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়া, সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন শীত প্রধান দেশ থেকে হাজার মাইল রাস্তা অতিক্রম করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের পার্শ্ববর্তী শনি, মাটিয়ান, কানামিয়াসহ আশপাশের হাওরে এসব অতিথি পাখি অবস্থান নেয়। এদের মধ্যে, মৌলতি হাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা সরালি, পিয়ারি, কাইম, কালা কুঁড়া, রামকুড়া, মাছরাঙ্গা, কানিবক, পানকৌড়িসহ অনেক পাখি খাদ্যের সন্ধানে এক হাওর থেকে অন্য হাওরে ডানা ঝাপটিয়ে অবাধ বিচরণ করে। আর বর্ষাকালে হাওরে পাওয়া যাবে নানা প্রজাতির মাছের দেখা। এখানে নানা প্রজাতির বনজ ও জলজ প্রাণী এ হাওরের সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর এক বিশাল সমুদ্রের রূপ ধারণ করে আর শীতের সময় টাঙ্গুয়ার হাওরকে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে আমরা বর্ষাকালে না যাওয়াতে সেই সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম।

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ জলাশয়। উন্মুক্ত আকাশ, মেঘালয় পাহাড় এর অপরূপ সৌন্দর্য। মাছ, বন, পাখী, জীববৈচিত্র, নির্মল বায়ু, টাঙ্গুয়ার হাওরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। জলাশয়গুলি যেন ছোট ছোট সমুদ্র। সব মিলিয়ে সৌন্দর্যের এক প্রাকৃতিক রূপসী কন্যা। হাওর আর পাহাড়ি সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি এই পর্যটন অঞ্চল। একবার গেলে বার বার যেতে ইচ্ছে করবেই যে কারো। আর বলতে ইচ্ছে করবে, ‘কোথায়ও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা।’

হঠাৎ চোখ যায় জেলেদের দিকে। নদীর হাঁটু পানিতে স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরছে, আর নদীর দুই পারে নুড়িবালি ছড়িয়ে রয়েছে। সূর্যের আলোতে চিকচিক করছে সেই নুড়িবালি। আর টিলার পেছনে নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে মায়াবিনী মেঘালয়, যার আঁচলে সদা খেলা করে রূপের রাণীরা।

৯.
আগে থেকেই দুপুরে খাবার রান্না করে রাখা হয়েছিল। ইঞ্জিন নৌকা উপরে বসেই ওয়ান টাইম প্লাস্টিক প্লেটে রোস্ট, মাছের ভর্তা ও টমেটো টক দিয়ে দুপুরে লাঞ্চ করা হয়। মাছের ভর্তাটা দারুণ ছিল। মনে হলে এখনো জিবে জল আসে। তবে খাওয়ার সময় ওয়ান টাইম প্লেটে ভাত খেতে হয়েছে সতর্কভাবে। কারণ প্লেটটা কিছুটা পাতলা থাকায় পড়ে যাবার সম্ভাবনা ছিল।

টাঙ্গুয়ার হাওরের বিলবোর্ডে গিয়ে আমাদের ইঞ্জিন নৌকাটি থামে। আমরা নেমে হিজল আর কড়ছের সারিবদ্ধ গাছের মাঝ পথ ধরে হেঁটে যাই বিলবোর্ডের সম্মুখে। হিজল কড়ছের দৃষ্টিনন্দন সারি এ হাওরকে করেছে মোহনীয়। বিলবোর্ডের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে ক্যামেরা ক্লিকে হাওর এর রূপের রাণীকে বন্দি করে নেই আমরা। চারদিকে সবুজের সমারোহ। চোখ যেন ফেরাতে ইচ্ছে করছে না।

১০.
গোধূলি লগ্নে ইঞ্জিন নৌকা ওঠি আমরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখি হাওরের গাছপালা আর কিছু মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ চোখ যায় পীর স্যারের দিকে। গালে হাত দিয়ে মনোমুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির মাঝে ডুবে আছেন তিনিও। ইঞ্জিন নৌকা চলছে আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে আমাদের সেলফি আর আড্ডা। বাঁশের সাকো সামনে আসতেই আমাদের ইঞ্জিন নৌকাটি থেমে যায়। সবাই ভেতর তখন আতঙ্ক। বশির ভাই জোরে জোরে বলতে লাগলেন ‘ও পীর ভাই কিতা হইলো ডাকাইতনি’। বাঁশের সাঁকোতে থাকা লোকজন বলল-আপনাদের ভয়ের কোন কারণ নাই। আমরা ডাকাত না। আপনার সবাই একটু মাথা নিচু করে বসে নৌকাটিকে নিয়ে সাঁকোর নিচ দিয়ে চলে যান। সেই সাঁকোটি দেখে রোটারিয়ান আনহার শিকদার হেসে বললেন-আমরা এখন লন্ডনের টেমস নদী ব্রিজের নিচে আছি।

আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ‘পানকৌড়ি’ পাখিরা উড়ে যেতে দেখা যায়। গাছের আগায় তখন পানকৌড়ির ঝাঁক। অক্টোবর মাস থেকেই নাকি শুরু হয় পরিযায়ী পাখীদের আনাগোনা। তখন বিলগুলো পরিণত হয় দেশীয় আর পরিযায়ী পাখীদের। মাইলের পর মাইল এসব পাখীদের ভেসে বেড়াতে দেখা যায়।

ছবির মত এসব দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে কোন শিল্পীর নিজ হাতে আঁকা প্রতিটি দৃশ্য। মরমী কবি হাছন রাজা ও বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের জেলা, স্বচ্ছ জল আর হিজল কড়ছের হাওর ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের’ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে আনন্দে নক্ষত্র তারার মত চিকচিক করছিল ভ্রমণকারীদের তৃষ্ণার্ত চোখ-মুখ। নৌকা

যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই মুগ্ধ হচ্ছি আর মনে হচ্ছে- ‘এই পথ যদি শেষ না হত, তবে কেমন হত...।
১৩ এপ্রিল ২০১৮

আপনার মন্তব্য

আলোচিত