শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:৩৭

ঈদের ছুটিতে পর্যটক বরণে প্রস্তুত কমলগঞ্জ

পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা।

টিলাঘেরা সবুজ চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী ধলই চা-বাগানে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, ছায়া-নিবিড় পরিবেশে অবস্থিত নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, ঝর্ণাধারা হামহাম জলপ্রপাত, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, শিল্পকলা সমৃদ্ধ মনিপুরীসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবন ধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জনপদ যে কোন পর্যটকের মন ও দৃষ্টি কড়ে নেবে।

দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝে সবচেয়ে দর্শনীয়, নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। পশুপাখি, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। এ উদ্যানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সবুজ বৃক্ষরাজি। বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় জীব উল্লুকসহ কয়েকটি জন্তু ও বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি মূল্যবান গাছ-গাছালির শেষ নিরাপদ আবাসস্থল হল লাউয়াছড়া।

এই উদ্যান ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এখন একটি আকর্ষণীয় স্থান। ১৯৯৬ সালে ১২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে লাউয়াছড়াকে ঘোষণা করা হয় জাতীয় উদ্যান হিসেবে।

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা-বাগানে নয়নাভিরাম মনোরম দৃশ্য মাধবপুর লেক ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার পাহাড়ি উঁচুনিচু টিলার মাঝে দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ কিলোমিটার পানির হ্রদ ও তার শাখা প্রশাখা, চারপাশে পাহাড়ি টিলার উপর সবুজ চা বাগানের সমারোহ, দুর্লভ বেগুনী শাপলার আধিপত্য, ঝলমল স্বচ্ছ পানি, ছায়া-নিবিড় পরিবেশ, শাপলা-শালুকের উপস্থিতি আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে।

একদিনেই মাধবপুর লেকের দৃশ্য উপভোগ করে বেরিয়ে এসে একই রাস্তায় প্রায় ১০ কিলোমিটার যাওয়ার পরই বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ ঘুরে আসা যাবে। এখানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন এ স্মৃতিসৌধ দেখতে আসছেন। সকালে বের হলে লাউয়াছড়া ভ্রমণ শেষে মাধবপুর লেক ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ ঘুরে আসা যায়।

এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময়ে ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠেছে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে বিশালাকার বিমানবন্দর। বর্তমানে এখানে আরটিএস (রিক্রুট ট্রেনিং) স্কুল স্থাপন করায় ভেতরে প্রবেশ করে ভ্রমণ করা সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। শমশেরনগর বিমান বাহিনী ইউনিট এলাকায় পতিত ভূমিকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠাল, আনারস, লিচু, কুল, ধান, আলুসহ নানা জাতের ফল, কৃষি ও মৎস্য খামার গড়ে তোলা হচ্ছে। শমশেরনগর বিমান বাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা সংলগ্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমির উপর একটি স্মৃতিসৌধও নির্মিত হয়েছে।

এছাড়া বিমানবন্দর সড়কেই রয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পরিচালিত দৃষ্টিনন্দন বিএএফ শাহীন কলেজ। ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ডবলছড়া। ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি পাহাড়ি ছড়ার নামে স্থানটির নামকরণ হয়েছে বলে জানা যায়।
 
ডবলছড়া খাসিয়া পল্লী যেতে পাহাড়ি উঁচুনিচু কাঁচা ১২ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। পথিমধ্যে শমশেরনগর চা-বাগানের দুটি প্রাকৃতিক হ্রদ, একটি গলফ মাঠ ও ক্যামেলিয়া ডানকান হাসপাতাল যেকোনো পর্যটকের নজর কাড়বে। অপরূপ সৌন্দর্যের আধার ডবলছড়া খাসিয়া পল্লীর পাহাড়ি টিলার উপর ঘর করে বসবাস করছে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর লোকজন।

রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় সোয়া ২০০ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে ও সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে ডবলছড়ার অবস্থান। একজন হেডম্যান বা মন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে ডবলছড়া খাসিয়া পল্লীতে ২৫০ ফুট উপরের হেডম্যান বা মন্ত্রীর বাংলোটি দেখতে খুবই সুন্দর।

কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি বন রেঞ্জের কুরমা বনবিট এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাত। স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীরা এ জলপ্রপাত ধ্বনিকে হামহাম বলে। তাই এটি হামহাম নামে পরিচিত।

হামহামে সরাসরি যানবাহন নিয়ে পৌঁছার ব্যবস্থা নেই। কুরমা চেকপোস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তায় স্থানীয় বাস, সিএনজি, জিপ ও মাইক্রোবাসে যেতে হয়। বাকি ১০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত এলাকায় ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লী। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা তৈলংবাড়ী কলাবন বস্তি থেকে পায়ে হেঁটে রওয়ানা হতে হবে। প্রায় ৬ কিলোমিটার পাহাড় টিলা ও ২ কিলোমিটার ছড়ার পানি অতিক্রম করে ৩ ঘণ্টা পায়ে হাঁটার পর ১৬০ ফুট উচ্চতার হামহাম জলপ্রপাতের দেখা পাওয়া যাবে। হামহাম জলপ্রপাত ভ্রমণ করতে পুরো একদিনের প্রয়োজন।

এছাড়াও দেখার মতো রয়েছে কমলগঞ্জে পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের নীরব সাক্ষী বিভিন্ন বধ্যভূমি, ব্রিটিশদের শোষণের প্রতীক তিলকপুর নীলকুটি, ঘটনাবহুল মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড, বর্ণময় শিল্পসমৃদ্ধ মনিপুরী সম্প্রদায়সহ টিপরা, খাসিয়া, গারো সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এলাকাসমূহ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত