সোমবার, , ১০ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

দেবাশীষ রনি

২৯ নভেম্বর, ২০১৮ ২২:১৮

লাল শাপলার স্বর্গরাজ্যে

বাংলাদেশ এক সময় ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। অনেকগুলো রাজ্যের একটি প্রান্তিক জনপদ জৈন্তাপুর। সিলেট শহর হতে ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে জৈন্তাপুর। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে জৈন্তা রাজ্যের রাজা রাম সিংহের স্মৃতিবিজড়িত ডিবি, ইয়াম, হরফকাটা, কেন্দ্রী বিলসহ রয়েছে চারটি বিল। বিলগুলোকে কেন্দ্র করেই নাম করা হয়েছে ডিবির হাওর। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে তুলে লাল শাপলার ডিবির হাওরকে। আগেই বলে রাখি শাপলা কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঘুমাতে শুরু করে। সুতরাং ফুটন্ত শাপলা দেখতে চাইলে সকালবেলাতেই পৌঁছাতে হবে।

ঘোরাঘুরি আমার কাছে একটি নেশা। এই নেশা যাকে পেয়ে বসে, তাঁর পক্ষে থামা কঠিন। এই নেশায় পড়ে ইট-সুরকির নগরজীবনে একটুখানি প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে কিছুদিন পরপর ঘুরতে বের হই। এরই ধারবাহিকতায় শাকির ভাই এবং পুষ্পকে বলি শাপলা বিলে যাওয়ার জন্য। একবাক্যে রাজি হয়ে যান উনারা। পরে সৈকতদাসহ পাঁচজন মিলে রাতে সিদ্ধান্ত নেই পরদিন যাওয়ার। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে সবে। পথ ধরলাম ডিবির হাওরের। সিলেট শহরের সোবহানী ঘাট থেকে বাসে করে ঘণ্টাখানেক সময়ে জৈন্তা বাজারে যেতেই হেমন্তের সকাল স্বাগত জানালো। সেখানে নাস্তা করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রওনা হলাম ডিবির হাওরে দিকে। ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই শাপলার রাজ্যে।

ডিবির হাওরে পৌঁছে প্রথম দেখায় মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, আহ্, কী সুন্দর! যেন ফুলে ফুলে সাজানো লাল গালিচা। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলোকেও হার মানায় বিলের শতসহস্র রক্তিম লাল শাপলা। নৌকা ভাড়া করে নৌকায় উঠে পড়লাম। নৌকা দিয়ে বিলের মাঝখান দিয়ে ঘুরছি আর চারপাশে লাল লাল ফুল। ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো লাগছিল। মনের অজান্তেই গান ধরলাম, “তুমি সুতোয় বেঁধেছো শাপলার ফুল নাকি তোমার মন।”

সূর্যোদয় থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত লাল শাপলার সৌন্দর্য দৃশ্যমান থাকে। সূর্যের উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে শাপলা তার আপন সৌন্দর্যকে গুটিয়ে নিতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাপলাগুলো নিথর হয় পড়ে। লাল শাপলার ফুটন্ত ফুল ডিবির হাওরের আশপাশের পরিবেশকে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। এর সাথে রয়েছে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির কিচির-মিচির সুর। মনে হয় যেন প্রকৃতি তার রূপের সঙ্গে নিজে বাধ্যযন্ত্রে সুরের ঝর্ণাধারা ছড়িয়ে দিয়েছে। স্বাধীন জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজা বিজয় সিংহের সমাধিস্থল, বিলের চারপাশে খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য বিলটিকে আর্কষণীয় করে তুলেছে৷ পাহাড়ের নিচে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। দূর পাহাড়ে দেখা মিলবে খাসিয়াদের পান-সুপারির বাগান। প্রকৃতির বুকে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এ যেন এক নকশিকাঁথা। ফুটন্ত শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করে মনে শান্তি নিয়ে ফেরার পথ ধরি। আসছে দিনগুলিতে শাপলার রাজ্যে আবার যাবো।

যেভাবে যাবেন: সিলেট থেকে সরাসরি সিলেট-তামাবিল সড়কপথে বাস, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা অথবা প্রাইভেট কারে আসতে হবে জৈন্তাপুরে। জৈন্তাপুর বাজার থেকে সেই বাহনে করেই ১.৫-২ কিলোমিটার সামনে গেলেই সড়কের ডান দিকে দেখা যাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ডিবির হাওর বিশেষ ক্যাম্প লেখা ছোটখাটো সাইনবোর্ড। বাস ভাড়া নিবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। মূল রাস্তা থেকে নেমে ক্যাম্পের পাশ দিয়ে কাঁচা সড়কে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন শাপলা বিলে। অথবা চাইলে জৈন্তাপুর বাজারেও নেমে যেতে পারেন। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে বিলে পৌঁছাতে ভাড়া লাগবে ১৫০ টাকা। বিলে নৌকায় ঘোরাঘুরি করতে এক ঘণ্টার জন্য ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা। আসা-যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নেবে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা।

সচেতনতা: একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কিছু অবশ্যই করা চলবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছু মনের অজান্তেও ফেলে আসবেন না। আরেকটা কথা; শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত শাপলা ফুল ছিঁড়ে সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। প্রকৃতিকে বেঁচে থাকতে দিন তার নিজের মতো করে।

ছবি: লেখক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত