মঙ্গলবার, , ২২ জানুয়ারী ২০১৯ ইং

রাজেশ পাল

২৯ অক্টোবর, ২০১৮ ১৭:৩৪

নীতি আদর্শের প্রশ্নে ত শেষ কথা থাকবে

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশে ইসলাম থাকবে না, ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে, বাবুরা ফিরে এসে তাদের সম্পত্তির হিসাব চাইবে, মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে… ছোটবেলা থেকে লক্ষ-কোটিবার এসব প্রোপাগান্ডা ছড়াতে শুনেছি বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের। লালদীঘির মাঠ গমগম করে উঠতো এসব মুখরোচক ডায়ালগে। আবেগের জোশে মাইক পর্যন্ত ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতো!

রাজনীতিতে ধর্মীয় জুজুর সূত্রপাত সেখান থেকেই। যা বাস্তবিকই ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এদেশের সিংহভাগ মানুষের অশিক্ষা আর তদ-প্রসূত কুসংস্কার জনিত অন্ধত্বের ফলে।

এক পর্যায়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ সোল এজেন্ট আওয়ামী রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে ভালোমতোই। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ক্রমশই অপরপক্ষের স্ট্র্যাটেজি অনুসরণের দিকেই ঝুঁকে পড়তে শুরু করে তারাও। ধীরে ধীরে শুরু হয় ধর্মীয় অনুভূতিকে জুজু হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া।

‘ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ এর কাউন্টার স্লোগান তৈরি হয় ‘নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’!

ক্রমশই ঘুচে যেতে শুরু করে দুই বিবদমান পক্ষের মৌলিক আদর্শিক তারতম্য। যেকারণে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের ‘নাস্তিক’ ট্যাগ দিয়ে উল্টো তাদেরই ফাঁসির দাবি করে শাপলা চত্বরে জমায়েত হওয়া হেফাজতীদের আধ্যাত্মিক গুরু শফি হুজুরের দোয়া চাইতে ছুটে যান দণ্ডমুণ্ডের হর্তাকর্তারা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিসি কদমবুসি করতে যান হাটহাজারী মাদ্রাসায়!

এই নাতিদীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার অবতারণার কারণ, গতকাল একজন আলেম বলেছেন , ডক্টর কামাল আর ডক্টর ইউনুছ ইহুদি নাসারাদের এজেন্ট। প্লাস নাস্তিক। আর সেই কথা গর্বভরে ফেসবুকে প্রচার করেছেন সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গরা; সেইসাথে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রী মহোদয়ও!

আমি বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শের চরম বিরোধী। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য জামায়াত আমার কাছে নেহাতই অপাংক্তেয়, যেমন অপাংক্তেয় বিএনপি রাজনীতির প্রয়োজনে ধর্মের অপব্যবহার আর শতকরা ৯০টা মিথ্যা কথা বলার কারণে। কিন্তু আগে বিএনপি জামায়াতের ‘শেখ মুজিবের বাপ হিন্দু ছিলো’ মার্কা চরম মিথ্যাচারগুলোর সাথে ডক্টর কামাল হোসেন ইহুদি বা ডক্টর ইউনুছ নাস্তিক মার্কা মিথ্যাচারগুলোর আদৌ কোন পার্থক্য আছে কি তা আমার বোধগম্য হলোনা মোটেই।

আমি চিরকালই সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতেই অভ্যস্ত। সেই কারণে ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটাই বন্ধুহীন জীবন যাপনে দিন কাটে। ইদানীং তেমন কিছু লিখিওনা এসব কারণে। চক্ষুশূল তো কম মানুষের হইনি। এই মধ্যবয়সে আর ভালো লাগেনা। কিন্তু এইসব দেখে আর কাহাতক চুপচাপ থাকা যায়?

ছাত্রলীগের একসময়কার রাজপথের কর্মী হলেও দলের নাম ভাঙিয়ে অন্য অনেকের মতো পিপি, জিপি, এপিপি ইত্যাদি হয়ে বেনিফিশিয়ারিদের খাতায়ও নাম লেখাইনি। ফলে সবকিছুতে ‘জি হুজুর’ বলার বাধ্যবাধকতাও আমার নেই। আর তাই ডক্টর কামালকে ‘ইহুদি’ আর ডক্টর ইউনুছকে ‘নাস্তিক’ ডাকার মতো ধর্মীয় ইস্যু ব্যবহার করে চালানো সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি।

রাজনীতিতে শেষ কথা না থাকলেও নীতি আদর্শের ক্ষেত্রে তো শেষ কথা বলে কিছু অবশ্যই থাকা উচিত।

  • রাজেশ পাল: আইনজীবী।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত