সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ ইং

হাসান মোরশেদ

২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০২:০৮

এটা কেবল প্রত্নতাত্বিক গুরুত্ব নয়, আমাদের জন্মযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন

ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অফ মেডিসিন। তাঁর ইন্টারভিউ নিয়েছি গত বছর- এখনো আর্কাইভ ভুক্ত হয়নি।

জিয়াউদ্দিনের বাবা ডাক্তার শামসুদ্দীন আহমদ ছিলেন সিলেটে মেডিকেল কলেজের সার্জারী বিভাগের প্রধান। অনেক সিনিয়র মানুষ- শহীদ ডাঃ ফজলে রাব্বী, ডা. আলিম ছিলেন তাঁর শিক্ষক। ১৯৬৯ সালে রাজশাহীতে গুলি ও বেয়নেটবিদ্ধ শহীদ প্রফেসর জোহার অপারেশন করেছিলেন তিনি এবং মিলিটারী চাপ অস্বীকার করে মেডিকেল রিপোর্ট লিখেছিলেন- প্রফেসর জোহাকে কাছ থেকে গুলী ও বেয়নেট চার্জ করা হয়েছে। এই রিপোর্ট গন অভ্যুত্থানকে শক্তি জুগিয়েছিলো।

এপ্রিলের প্রথমে মুক্তিবাহিনী ঝটিকা আক্রমনে সিলেট শহর দখল করে নিলে পাকিস্তান আর্মি পেছনে শালুটিকর বিমানবন্দরে আশ্রয় নেয় এবং এয়ার এটাকের সহযোগীতায় পুনরায় শহর দখলের যুদ্ধ শুরু করে।

হাসপাতাল ভর্তি হতে থাকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ- এমনকি পাকিস্তানে সেনারাও চিকিৎসার জন্য।

ডা. শামসুদ্দীন আহমদ তাঁর ইন্টার্নী ডাক্তার শ্যামল কান্তি লালা, পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমান, এম্বুলেন্স চালক কোরবান আলী সহ কয়েকজন নিয়ে ৫ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধ ও কারফিউ'র মধ্যে একটানা চিকিৎসা সেবা দিয়ে যেতে থাকেন।

যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে তিনি নারী সেবিকাদের চলে যেতে বলেন। বিমান আক্রমনের তীব্রতায় সিলেটের পতন ঘটলে ৯ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী হাসপাতালে প্রবেশ করে।

যুদ্ধের সমস্ত নিয়মকানুন ভঙ্গ করে হত্যা করে ডা. শামসুদ্দীন, ডা. লালা, কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমান সহ চিকিৎসাধীন সাধারন মানুষদের অনেককে। হাসপাতালে আক্রমন করে কর্তব্যরত ডাক্তার ও চিকিৎসা কর্মীদের হত্যার নজির পৃথিবীর যুদ্ধগুলোতে খুব বেশী নেই। মুক্তিযুদ্ধে সম্ভবতঃ একমাত্র ঘটনা।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী এদেশে জেনোসাইড ঘটিয়েছিলো- সেটা প্রমানের জন্যও এটি একটা জোরালো ঘটনা।

তিনদিন পর কারফিউ শিথিল করলে তাঁর এক ভাই এসে চারপাঁচ জন মানুষ নিয়ে লাশগুলো মাটিচাপা দিতে পেরেছিলেন হাসপাতাল ভবন থেকে একটু দূরে, যার পাশে এখন সিলেট শহীদ মিনার গড়ে উঠেছে।

যে হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় পাকিস্তান আর্মি এই জেনোসাইড ঘটিয়েছিলো সেই হাসপাতালই পরে মেডিকেল স্টুডেন্টদের ছাত্রাবাস হয়- আবু সিনা ছাত্রাবাস। সিলেট মেডিকেল দুই কিমিদূরে আলাদা স্থাপিত হয়। পুরনো হাসপাতালের পাশে নতুন করে তৈরী হয় সিলেট সদর হাসপাতাল- শহীদ ডা. শামসুদ্দীন আহমদের নামে, তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাসও হয়েছে। ডা. লালা'র নামে মেডিকেলের কলেজের ছাত্রী হোস্টেল হয়েছে। যদিও কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমানের নামে কিছুই হয়নি।

সিলেটীরা নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে খুব গর্ব করেন, পরম্পরা ধরে রাখা বিষয়ে খুব সচেতন। কিন্তু এরকম একটি জেনোসাইড ঘটানো হয়েছিলো যে জায়গায় সেটি ভেঙ্গে আরেকটি সরকারী হাসপাতাল বানানোর জোরালো পাঁয়তারা চলছে। কিছু মানুষের প্রতিবাদ ছাড়া বেশীরভাগ সিলেটিই চুপ আছেন, অনেকে আবার সরকারী সিদ্ধান্তের জোরালো সমর্থকের ভূমিকায়।

এর আগে ক্যাডেট কলেজ বানিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে পাকিস্তানী নৃশংসতার চিহ্ন। এখন যেখানে সিলেট ক্যাডেট কলেজ সেটি ছিলো পাকিস্তান আর্মির ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার, ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানার কার্যালয়। শত শত মানুষকে এখানে বন্দী করে নির্যাতন করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের পরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী এখান থেকে বহু নারীদের উদ্ধার করেছিলো। জিয়াউর রহমানের আমলে এটাকে বানানো হয়েছে ক্যাডেট কলেজ। সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ও জেনোসাইডের সবচেয়ে বড় নিদর্শন মুছে তো দেয়া হয়েছেই, এখন সেখানে সাধারনের কোন প্রবেশাধিকার নেই।

বুঝলাম সেটা ছিলো জিয়াউর রহমানের কাল। অবৈধ সামরিক শাসক ও ঘাতক দালালদের পুনর্বাসনের কাল।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায় থাকতে সরকারী সিদ্ধান্তে সিলেট তথা সারা বাংলাদেশের জেনোসাইডের আরেকটি ঘটনাস্থল গুঁড়িয়ে দেয়ার আয়োজন চলছে কোন সাহসে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সারা বছর ধরে সাংগঠনিক কাজকর্ম, আনুষ্ঠানিকতা ইত্যাদি যারা করেন তার এই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার নয় কেনো?

এটা কেবল প্রত্নতাত্বিক গুরুত্ব নয়, এটা জেনোসাইডের স্মৃতিবাহী- আমাদের জন্মযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন।

সময়ের কাছে, ইতিহাসের কাছে আপনারা মুখ দেখাবেন কী করে?

(ফেসবুক থেকে)
হাসান মোরশেদ: লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত