মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

বন্যা আহমেদ

৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:১১

বাবার গত পাঁচ বছরের কষ্ট বলার মত নয়

ড. অজয় রায় ও বন্যা আহমেদ

সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে আমার মাথার ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক মেলেনা বলে এখানে তেমনভাবে আসা হয়না, কিন্তু আজকে মনে হলো এই খবরটা শেয়ার করা উচিত। ড. অজয় রায় অসুস্থ, বেশ অসুস্থ। তিনদিন আগে বারডেমের আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়েছে ওনাকে।

অভির ছোট ভাই অনু এবং তাঁর স্ত্রী কেয়ার সাথে প্রতিদিন যোগাযোগ হচ্ছে, যা করা দরকার সাধ্যমত সব কিছুই করা হচ্ছে। কাল কেয়ার সাথে কথা বলতে বলতে দুজনেই বলছিলাম কী পূর্ণ এবং সার্থক একটা জীবনই না কাটিয়েছেন বাবা। কিন্তু তার পরক্ষণেই মনে হলো গত পাঁচ বছরে যে কষ্ট পেয়েছেন সেটাও তো বলার মত না। সেই ২০১৫ থেকেই উনি যে ভেঙে পড়তে শুরু করেছেন সেটা আর ঠিক হয়নি। এই বছরের শুরুতে অভির মা মারা যাওয়ার পর সেই ভেঙে পড়াটা শুধু তরান্বিতই হয়েছে।

অপূর্ব এক সৎ এবং আলোকিত জীবন কাটিয়েছেন উনি। ওনার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব অদ্ভুত- উনি আমাকে বয়সে ছোট বা ছেলের বউয়ের মত করে দেখেননি কোনদিন, সব সময়ে মনে হয়েছে আমি যেন ওনার সমকক্ষ কেউ একজন!

২০০২ সালে ওনার সাথে আমার পরিচয়। উনি ততদিনে শুনেছেন আমি আর অভি ডেট করছি। আমি আটলান্টাতে চাকরি করি, আর অভি তখন সিঙ্গাপুরে পিএইচডি করছে- আমরা দেশে বেড়াতে গেছি কয়েক দিনের জন্য। উনি নিজেই একদিন আসলেন আমাদের উত্তরার বাড়িতে দেখা করতে। আমি জানতাম অভির মা আমাদের সম্পর্ক নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে আছেন- আমাদের জন্মগত ধর্ম আলাদা, আমি অভির চেয়ে বয়সে তিন বছরের শুধু বড়ই নই চার বছরের একটা মেয়েসহ ডিভোর্সডও। আমাদের দুজনের কাছে এগুলো কোন বাধা না হলেও দেশের অনেক কাছেই যে এগুলো ‘বিশাল সমস্যা' সেটা আমরা ভালো করেই জানতাম।

ড. অজয় রায় আসলেন। আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, পড়ালেখা, চাকরি, ৯/১১, আমেরিকার বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, ওনার নিজের বিলেতে পড়াশোনা করা, দেশে ফিরে আসা, মুক্তিযুদ্ধ, দেশের অবস্থা ইত্যাদি নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে অনেক গল্পগুজব হলো। তৃষার সাথেও বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে অনেক কথা বললেন, আমেরিকার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলেন। অভিকে বললেন তৃষার জন্য বাংলা শেখার কয়েকটা বই কিনে দিতে। আমি ততক্ষণে ভুলেই গেছি যে উনি অভির বাবা এবং উনি আমার বাসায় এসেছেন আমার সাথে পরিচিত হতে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে যাওয়ার সময় হলো, উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে উনি আমাকে দুটো কথা বললেন।

‘আমি জানি তুমি অনেক বড় চাকরি কর আমরা কিন্তু মধ্যবিত্ত ছাপোষা মানুষ।’- অ্যা.. আমি তো হতভম্ব, ‘না না..’ টাইপের তোতলানো কী একটা যেন বলতে গেলাম। উনি হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শোন মা, আমি তোমার লেখা পড়েছি, তোমার সাথে আজকে কথা বলে খুব ভাল লাগল। তুমি আর গুল্লু (অভির ডাক নাম) যা সিদ্ধান্ত নেবে তাতেই আমার সমর্থন থাকবে, ওর মাকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার; তোমরা এ নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট কোরোনা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বন্ধুর সাথে দেখা হলো ২০১৭ সালে। উনি বললেন, “অজয় সারের সাথে তোমাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল, কথায় কথায় বললাম, বন্যা তো আপনার মেয়ের মত। উনি সাথে সাথে থামিয়ে দিয়ে বললেন, না বন্যা আমার মেয়ের মত না, ও আমার মেয়ে।”

২০১৫-র আক্রমণের পর আমি প্রায় তিন মাস হাসপাতালের চিকিৎসায় ছিলাম, নিয়মিত ফোন করতেন, ইমেইল করতেন, খোঁজ নিতেন বাবা। তার কয়েক মাস পরেই বাবা একদিন আটলান্টায় ফোন করে বললেন, ‘বন্যা, এই পৃথিবীতে ভালো যেমন আছে, তেমনি নিষ্ঠুরতাও আছে এবং এটার সাথে মানিয়ে নেয়ার নামই জীবন। তুমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করার কথা চিন্তা করো।”

আমি সেদিনও হতভম্ব হয়ে কিছু বলতে পারিনি।

  • বন্যা আহমেদ: লেখক।
  • [লেখাটি বন্যা আহমেদের ফেসবুক থেকে নেওয়া]

আপনার মন্তব্য

আলোচিত