আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

ধর্ষণ রুখবে পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগ

এনামুল হক এনাম  

বর্তমানে অনলাইন মিডিয়ায় সবচেয়ে ঘৃণিত এবং আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে ধর্ষণ। সেক্সকে ট্যাবু বানিয়ে যে ধর্ষণ সংস্কৃতি আমাদের চোখের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তার জন্য আপনি আমি সবাই কম বেশি দায়ি।

আমাদের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো, ধর্ষণের পর আমরা খোঁজ নিই... নারী কেমন ছিলো, নারীর পোশাক কেমন ছিলো, সে কোথায় পড়ালেখা করতো কিংবা তার আচার ব্যবহার কেমন ছিল। এইসব বিষয় পরোক্ষভাবে যে ধর্ষণকেই উৎসাহ দেয় তা আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবি না।

একটি ব্যাপার এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, ধর্ষণ ধর্ষণই... এমনকি একজন পতিতাকেও যদি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনতায় বাধ্য করা হয় তবে তা ধর্ষণ এবং ধর্ষককে সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে। সভ্যতার মাপকাঠিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি বলেই আপামর জনসাধারণ প্রত্যেকটি ধর্ষণের পেছনে নারীরই অপরাধ খোঁজে বেড়ায়। একজন পতিতা যদি পুলিশের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ জানায় তা নিয়ে আমরা হাস্যরস করবো?

এই ধরণের মন-মানসিকতা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আমাদের ধর্ষণ সংস্কৃতির দিকেই নিয়ে গিয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আপনি ঢাকায় বলে চট্টগ্রামে ধর্ষণ রুখতে পারবেন না, এটা কারও পক্ষে সম্ভবও না। তবে প্রত্যেকেই নিজের অবস্থান থেকে উদ্যোগী হতে হবে যাতে এই সন্ত্রাস বন্ধ হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক সুন্দর নিরাপদ বাসযোগ্য সমাজে নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠতে পারে। কি হতে পারে এমন উদ্যোগ?
 
পারিবারিক শিক্ষা
ধর্ষণ রোধে পারিবারিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আপনার সন্তানের সাথে যৌনতার কিছু বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা কখনোই নিজের সন্তানের সাথে এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করি না। যৌন শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি নোংরামি, লজ্জা। অথচ কিছু বিষয় থাকে সরাসরি যৌনতা না, কিন্তু যৌনতা সংশ্লিষ্ট। যেমন, একটি বাচ্চাকে শেখাতে হবে “আদর” কী। কোন আদর সঠিক এবং কোন আদর সঠিক নয়। শরীরের কোন স্থানে হাত দেয়া যাবে, কোন স্থানে হাত দেয়া যাবে না। ছেলে সন্তান হলে বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ধর্ষকদের কাছে ছেলে-মেয়ে আলাদা বলে কিছু নেই।

সর্বোপরি আপনার ছেলেকে শেখাতে হবে মেয়েদের সম্মান করতে। তাদের সামনে মন কোন আচরণ করা যাবে না যে তারা পুরুষতান্ত্রিক মন-মানসিকতায় বড় হয়ে উঠে নিজেকে কর্তৃত্ব পরায়ণ মনে করে। সন্তানের সাথে সহজ আচরণ করুন, যাতে যে কোন বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করতে পারে কিংবা যেকোনো ঘটনা আপনাকে নির্ভয়ে জানাতে পারে। সে ঘটনা হতে পারে তার নিজের ক্ষেত্রে, হতে পারে তার কোন বন্ধু বা বান্ধবীর ক্ষেত্রে।  

ধর্মীয় শিক্ষা
অদ্ভুত একটি ব্যাপার হলো, ধর্মীয় শিক্ষা বলতে এদেশে নামাজ, কোরআন পড়া কিংবা মন্ত্রপাঠ, পূজা অর্চনাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। ধর্মে যে যৌন শিক্ষা আছে তা অধিকাংশ-ক্ষেত্রেই বেমালুম চেপে যাওয়া হয়। ধর্মীয় শিক্ষার আবহে যৌন শিক্ষা অনেক বেশি কার্যকর এবং আপনার সন্তানকে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।      

সন্তানের দৈনন্দিন কার্যাবলীর উপর সুক্ষ্ণ নজর রাখুন
আপনার সন্তান কি করছে, কার সাথে মিশছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে বা মোবাইলে কি করছে তা সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখুন। ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অশ্লীল সাইটগুলো ব্লক করে নিন। এক্ষেত্রে আপনি একজন ইন্টারনেট স্পেশালিষ্টের সাহায্য নিতে পারেন। যে লাইন-ম্যান আপনার বাসায় ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে তাকে বললেই সে সহজেই কাজটি করে দেবে।     

ছেলে সন্তানকে কর্তৃত্বপরায়ণ হতে শেখাবেন না
আপনার ছেলের সামনে এমন কোন আচরণ করবেন না, যেনো সে এই মানসিকতায় গড়ে উঠে সে মেয়েদের থেকে বেশি শক্তিশালী বা তার সম্মান মেয়েদের থেকে বেশি অথবা মেয়েদের স্থান ছেলেদের থেকে নিচে। আপনি হয়তো বলবেন এইসব তো আমি কখনোই করি না। আসলেই কি তাই?

যেই মূহুর্তে ছেলের সামনে আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে রূঢ় আচরণ করলেন, নিজের মেয়ে থেকে ছেলেকে বেশি আদর করলেন, কিংবা বাসার কাজের মেয়েটিকে ধমক দিলেন বা মারলেন... সেই মূহুর্তেই আপনার ছেলে একটি মেসেজ পেয়ে গেল, সে শ্রেষ্ঠ, সে কর্তৃত্ববান। খুবই সতর্কতার সাথে এইসব বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে হবে।  


সামাজিকভাবে আপনি কি করবেন?

কখনোই ভিকটিমকে দোষারোপ করা যাবে না
মনে রাখবেন, কখনোই না। ধর্ষিতা দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হয় ব্লেম গেমের মাধ্যমে। ধর্ষক আস্কারা পায়, অন্যান্যরা উৎসাহ পায়। এই বিষয়টি কঠিন ভাবে মেনে চলতে হবে। মেয়েটি যে পোশাকেই থাকুক, যে অবস্থাতেই থাকুক... কখনো কোন অবস্থাতেই তাকে ধর্ষণ করা যাবে না। যে ধর্ষক যে তার অপরাধ ঢাকার জন্য বাহানা বানাবেই, এমন কি সে যদি দেড় বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে সে ক্ষেত্রেও ধর্ষক বাহানা খুঁজবে। যে ধর্ষণ করেছে সে ধর্ষণ... তার শাস্তি হতেই হবে, এ বিষয়ে কোন ছাড় নয়।

ধর্ষকের সাথে বিয়ে নিরুৎসাহিত করুন
অনেক সময় দেখা যায়, ধর্ষক ধরা পড়ার পর নিজের অপরাধ শিকার করে নিয়ে ধর্ষিতাকে বিয়ে করতে চায়, আমরাও ভেবে লই যাই হোক ধর্ষিতা মেয়ের তো একটি গতি হল।

আমাদের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে, এখানে ধর্ষক নিজের শাস্তি এড়ানোর জন্য চতুর সিদ্ধান্ত নিয়ে। বিয়ের পর মেয়েটিকে কখনোই স্ত্রীর মর্যাদা দেবে না, প্রথম সুযোগেই সে স্ত্রীকে ত্যাগ করবে। ধর্ষিতা মেয়ে আমরা অসহায় ভাবি, এমন মন-মানসিকতা বদলাতে হবে। অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে।  

শব্দ ব্যবহারে সতর্ক হওন
ধর্ষণ কোন সঙ্গম নয়, শয়তানের ধোঁকা নয়, শুধু না চাওয়া যৌনতা নয়, পোশাক বা শালীনতার কারণে ঘটিত কোন কাজ নয়... কোন শব্দ দিয়ে ধর্ষণকে জাস্টিফাই করা যাবে না। ধর্ষণ, ধর্ষণই, এটি একটি মারাত্মক অপরাধ, এর শাস্তি অনিবার্য।  


এগিয়ে আসুন!
আপনি যদি কোন ধর্ষণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হন তবে বিষয়টাকে ঝামেলা না মনে করে এগিয়ে আসুন। প্রকৃত অপরাধীকে ধরিয়ে দিন, কোর্টে সাক্ষী দিন। আপনার কিছু ঝামেলা হতেই পারে... কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার উদ্যোগই রুখে দিতে পারে আপনারই বর্তমান বা ভবিষ্যৎ সন্তানের ধর্ষণ। এমনও হতে পারে ধর্ষণকারী আপনার আত্মীয়, এক্ষেত্রে নিজ সন্তানের নিরাপত্তার জন্য আপনারই উচিত সবার আগে এগিয়ে আসা।

রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় সভায়
আপনি ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতা হতে পারেন, সম্মানিত ব্যক্তি হতে পারেন... এক্ষেত্রে আপনার উদ্যোগ হতে পারে চমৎকার। যেকোনো জনসভায়, মিটিং-এ, মসজিদে, মন্দিরে, ওয়াজ মাহফিলে ধর্ষণ বিরোধী প্রচারণা চালান, সবাইকে সচেতন করুন, ঘৃণা প্রদর্শন করুন ধর্ষকদের প্রতি, আহবান জানান ধর্ষণ প্রতিরোধের।  

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার
আপনি এতিমখানা চালান, বিভিন্ন দুর্যোগে দুস্থদের সহায়তা দিয়ে ছুটে যান প্রত্যন্ত অঞ্চলে, আপনি এনজিও চালান... যে কাজই করুন, অবশ্যই ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সহযোগিতা করার জন্য উদ্যোগী হওন। হতে পারে তা আইনি সাহায্য, হতে পারে মেডিকেল, হতে পারে চাকুরী, হতে পারে সামাজিক ভাবে পুনর্বাসন। নিজ নিজ অবস্থান থেকে ধর্ষিতা মেয়ের পাশে দাঁড়ান। সে যেন কখনোই বুঝতে না পারে সে অসহায়। সে যাতে ন্যায্য বিচার পায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। ভবিষ্যতে তার বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করুন।

মনে রাখবেন, এই সমাজ আমাদের... আর একে সভ্য সুন্দর করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর বাসযোগ্য একটি দেশ ও সমাজ পায়।   

এনামুল হক এনাম, প্রভাষক, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ