আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

আপনি কি গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ান?

জুয়েল রাজ  

"গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না"- এই একটি বাক্য, বিকৃত মানসিকতার ভীত নড়িয়ে দিয়েছে। মূলত বাংলাদেশের সব ভুক্তভোগী নারীদের কথাই বলে দিয়েছে বিজেন্স।

ট্রল এবং ভাইরাল খুব জনপ্রিয় শব্দ বাংলাদেশে। ট্রল এর বাংলা প্রতিশব্দ দানব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যদিও কোন বিষয় নিয়ে যৌক্তিক বিতর্ককে বুঝায়। বাংলাদেশে কৌতুক অর্থেই এই ট্রল (TROLL) ব্যবহৃত হচ্ছে।

পত্রিকা টেলিভিশনগুলো ও এইসব ট্রল ভাইরাল থেকে সংবাদের শিরোনাম নিতে হয়। কিছুই করার নাই, সময়ের সাথেই কিংবা সময় থেকে এগিয়ে চিন্তা করতে হয় বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অস্বীকার করার উপায় নাই।

বিজেন্স নামের অনলাইনভিত্তিক একটি পোশাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের "গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না " ট্যাগ লাইন লিখা টি-সার্ট' যার মস্তিষ্ক থেকে এসেছে, সেই নিশা যখন তাঁর টাইমলাইনে ছবিগুলো পোষ্ট করে, আমি মন্তব্যে লিখেছিলাম, দূরে গিয়া মর...
কানার কানা চোখে দেখিস না এই টাইপের কিছু লাইন লেখার জন্য। কিন্তু রাত পোহাতেই দেখি "গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" এই টি-সার্ট এর ট্যাগলাইনটি ফটোশপ করে একদল যৌন নিপীড়ক, ভবিষ্যৎ ধর্ষক তাদের মানসিকতার মতো নোংরাভাবে ভাইরাল করে দিয়েছে।

মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঘরে নিজের পিতা, ঘরের বাইরে গেলে হাজার হাজার নোংরা হাত এগিয়ে আসে নারীর দিকে। নারীদের জন্য মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে নুসরাত রাফি নামের মাদ্রাসা ছাত্রী। ৭ বছরের এক শিশুকে বলাৎকার করে খুন করেছে এক মাদ্রাসা শিক্ষক। গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে আন্দোলন করছে। পিতা কর্তৃক নিজের মেয়েকে ধর্ষণের সংবাদ ইদানীং প্রায়শই পত্রিকায় আসছে।

গণপরিবহনে নারীদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে কথা বললে আমি চোখ বন্ধ করে লন্ডনের সকালে কর্মক্ষেত্রে যাত্রা এবং বিকেলবেলার ঘরে ফেরা মানুষের ভিড়ের চিন্তা করি। এই ভিড় বাংলাদেশে হলে কী হতো ঘটনা! তাই বলে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে না বিষয়টা এমন নয়। ঘটছে কিন্তু সেই মাত্রা খুবই সামান্য। গভীর রাতে একটি মেয়ে একাকী রাস্তায় নির্ভয়ে ঘরে ফিরছে। অন্তত ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নিয়ে একজন নারী ঘর থেকে বের হন। পহেলা বৈশাখের ভিড়ই আমরা সামলাতে পারি না। বিগত কয়েক বছর আগে রমনায় পহেলা বৈশাখের যৌন নিপীড়নের ঘটনার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের এক নারী সাংবাদিকের সাথে কথা বলছিলাম, যিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে এসেছেন, ভয়াবহ কিছু তথ্য দিলেন তিনি, ঢাকার বাসে নাকি হাতে ব্লেড নিয়ে উঠে কিছু পুরুষ যাত্রী। কিছুই নেয়না শুধুমাত্র জামার পিছনটা কেটে দেয়, খোলা পীঠ দেখার বিকৃত আনন্দে। নিউমার্কেটে নারী ক্রেতাদের অপদস্থ হওয়ার সংবাদ তো অহরহ আসছে পত্রিকায়। কিন্তু এসব ঘটনা সামাজিক কারণে চুপচাপ হজম করেন নারীরা। যদিও বা কালেভদ্রে দুইচারজন প্রতিবাদ করেন, উল্টো প্রতিবাদকারীকেই হেনস্তার শিকার হতে হয়।

যারা এই এই টি-সার্ট পরে মডেল হয়েছিলেন, তাদের ছবিগুলো যেরকম নোংরাভাবে অশ্লীলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনভাবেই যৌন নিপীড়নের চেয়ে কম নয়। বরং সেই নিপীড়ন প্রকাশ্যে ঘটেছে। অপমান, অপদস্থ, হেয়, বিরক্ত নয় শুধু, আমার তো মনে হয় এদের জীবন বিপন্ন এখন। বাধ্য হয়েছে নিজেদের ফেইসবুক আইডিটি লক করে দিতে।

যারা এই কুকর্মটি করেছে, দুই তরুণীকে কোটি মানুষের সামনে অপদস্থ করেছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এদের পাশে দাঁড়ানো। অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা। এই বিষয়টি চিহ্নিত করা খুব কঠিন কিছু নয়। যে সব ফেইসবুক আইডি থেকে এই বিকৃত করা ছবিগুলো প্রচার করা হয়েছে এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই ঘটনাগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরাই মেলায়, পার্কে, রাস্তায় বাসে যৌন নিপীড়ন করে থাকে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যৌন নিপীড়নের জন্য আলাদা কোন আইন আছে বলে জানা নেই। তবে ২৫ ধারায় বলা আছে "আক্রমণাত্মক, মিথ্যা ও ভীতি প্রদর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি বিষয়ে (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয়প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণ করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ অপরাধের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে"। এই আইনেই অপরাধীদের সাজা দেয়ার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশের এমন কোন নারী আছেন, সচিবালয় থেকে গ্রামের খেটে খাওয়া মজুর যিনি যৌন নিপীড়নের শিকার হন নাই। আমার মনে হয় এক বাক্যে উত্তর আসবে, না। সব শ্রেণিপ্রেশার নারী এই জঘন্য অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই বাংলাদেশে পথ চলতে হয়।

পথেঘাটে যে সব নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে, অনেকে রাস্তার ছেলে বলে এদেরকে একধরণের ক্ষমা করে দেয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনলাইনে যারা কাজটি করছে, তারা কিন্তু রাস্তার ছেলে না, আপনার আমার ঘরের ছেলে, যাদের টেবিলে কম্পিউটার, হাতে দামী মোবাইল ফোন, যে ছেলেটির ফটোশপ করার মতো দক্ষতা আছে, সেই ছেলেটিই কিন্তু এই প্রতিবাদকে বিকৃত করে এক ধরণের যৌন আনন্দ লাভ করছে।

গত বছরের ঘটনা, ঢাকার চলন্ত বাসে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুনের মতো ঘটনা ঘটেছে, কেউ ট্রল করেনি। চুপচাপ হজম করে নিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপার, বিকৃত ট্রলগুলো করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে প্রজন্ম, যারা এই দেশটাকে নেতৃত্ব দেবে। তথ্য প্রযুক্তিতে এই প্রজন্মই এগিয়ে। এবং এদের বয়স সবার ২৫ এর ভিতর হবে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। তাই এই ঘটনাটির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এদের এখনই রুখে দিতে হবে ।

অনেকেই, গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না স্লোগানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গণমাধ্যমে তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন৷ এই বিষয়টি এইখানেই হয়তো সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল এই প্রতিবাদের পক্ষে একটা বিপ্লব ঘটানো। ঘরের বাইরে নারীদের নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত করা।

মোবাইল সার্ভিসের মতো কোন সার্ভিস নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। রাস্তাঘাটে গণপরিবহনে কোন নারী যখন এই ধরণের ঘটনার শিকার হবেন সাথে সাথে সেখান থেকে সহায়তা দেয়া হবে। যদিও এর সুযোগ নিয়ে হেনস্তা বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা কোন চক্র গড়ে উঠতে পারে যারা সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করবে। এইসব মাথায় রেখে কোন পন্থা ভাবতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আলাদা করে নারীদের যৌন নিগ্রহের সংজ্ঞা সন্নিবেশিত করে প্রতিরোধে এবং সাজার বিধান রেখে আইন করা উচিত।

গাঁ ঘেঁষে দাঁড়াবেন না- স্লোগানই দেখাতে পারে নতুন পথের দিশা। এটা শুধু নারীদের জন্য নয় পুরুষদের জন্যও দরকার, আপনার আত্মার প্রিয় কন্যাটি, আদরের বোনটি, প্রিয়তমা স্ত্রীটি দিনশেষে এই জঘন্য অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরছে। পথ নিরাপদ না করেই আমরা নারীদের কর্মক্ষেত্রে ছেড়ে দিয়েছি। আসুন তাঁদের চলার পথ আগে সুগম করুন। স্যালুট বিজেন্স, স্যালুট নিশা, জিসাদের, দেশের কোটি কোটি নারীর কথাটাই তোমরা বলেছো, কাউকে না কাউকে তো বলতে হবে, বলতে হতো।

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ