আজ শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং

জিজ্ঞাসায় বিবর্তন-১

এনামুল হক এনাম  

বিবর্তন নিয়ে অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে তো অবশ্যই, অনেক শিক্ষিত মানুষের মাঝেও ভুল ধারণা বিদ্যমান। এই ভুল ধারণ থেকে তারা হাস্যকর সব তথ্য দেন বা প্রশ্ন করেন।

অধিকাংশ মানুষের কাছে বিবর্তন মানেই হলো বানর থেকে মানুষ এসেছে। ব্যাপারটি শুধু যে হাস্যকর তাই নয়, এমন কি ঐ ব্যক্তির জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ। এক্ষেত্রে তাদের সব দোষ দেয়া উচিত হবে না, বিবর্তন নিয়ে বাংলায় ভাষায় চর্চা যথেষ্ট পরিমাণ হয় না বলে অধিকাংশ মানুষেরই এ সম্পর্কে জানার সুযোগ কম। জানার অন্যতম ধাপ হলো জিজ্ঞাসা।

বিবর্তন নিয়ে বহুল জিজ্ঞাসিত ৫০টি প্রশ্ন নিয়ে এবারের আয়োজন, FAQ: Evolution! জিজ্ঞাসায় বিবর্তন!!

বিবর্তন কী?
বিবর্তন (Evolution) হলো এমন একটি জীব-বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জীবের গঠনগত এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমপরিবর্তনকে বুঝায়। কোনো জীবের বংশধরদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে জিন ছড়িয়ে পড়ে তারাই বংশ-প্রবাহে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। জিন মিউট্যাশনের মাধ্যমে জীবের নির্দিষ্ট কোনো বংশধরে নতুন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হতে পারে কিংবা পুরনো বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও একটি প্রজন্মে জীবের বৈশিষ্ট্যের যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তা খুবই সামান্য। কিন্তু কালক্রমে জীবগোষ্ঠীতে সেই পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য হয়ে দেখা দেয় এবং এমনকি হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে একসময় তা নতুন প্রজাতির উদ্ভবেরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যকার দৃশ্যমান বিভিন্ন অঙ্গসাংস্থানিক ও জিনগত সাদৃশ্যগুলো একটা ধারণা দেয় যে আমাদের পরিচিত সকল প্রজাতির প্রাণীই এক ধারাক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি "কমন পূর্বপুরুষ" থেকে ধীরে ধীরে উৎপত্তি লাভ করেছে।

জীববিজ্ঞানে বিবর্তন সময়ের সাথে সাথে এক একটি প্রজাতির মধ্যে সংঘটিত হয়। এই পরিবর্তনগুলির জেনেটিক স্তরে সম্পাদিত হয়, তা পরবর্তী প্রজন্মতে বিস্তার লাভ করে। বংশ পরিক্রমায় এই পরিবর্তনগুলি একটি প্রজাতিতে ধির গতিতে লক্ষ-কোটি বছরের ব্যবধানে সম্পন্ন হয় বলে তা নির্দিষ্ট কোন সময়ের মাপকাঠিতে পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয় না। কখনও কখনও, কোন নির্দিষ্ট প্রজাতিতে কোন নির্দিষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য তাদের শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়, (যেমন: খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের জন্য মাড়ি বা চোয়ালের পুরুত্ব, তাপমাত্রার তারতম্যের জন্য চামড়ার পুরুত্ব, রঙ) যা তাদের বেঁচে থাকা এবং বংশ রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। এটা প্রাকৃতিক নির্বাচন। ইহা কোন প্রকার জেনেটিক্যাল পরিবর্তন নয়, যা শুধুমাত্র স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজ প্রজাতির অস্তিত্বকে রক্ষার জন্য সহায়ক। এটি কোন প্রকার বিবর্তন নয়, এটি প্রাকৃতিক নির্বাচন। আর এখানেই পার্থক্য বিবর্তন (Evolution) এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনে (Natural Selection)। অর্থাৎ বিবর্তনে জেনেটিক পরিবর্তন আবশ্যিক, ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনে তা জরুরি নয়।

বিবর্তন কি কেবলই একটি তত্ত্ব যা অসম্পূর্ণ? (Evolution কেবলই একটি Theory?)
বিজ্ঞানে, একটি তত্ত্ব সাধারণ নীতিতে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের মাধ্যমেই লিপিবদ্ধ করা হয়। একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এক্ষেত্রে একটি উচ্চ স্তরের সিদ্ধান্তকে নির্দেশ করে, যা একটি ফ্যাক্ট। শত বছর ধরে পর্যবেক্ষণ এবং পরিক্ষিত বিবর্তন আজ কেবল একটি তত্ত্ব বা অনুসিদ্ধান্ত নয়। লক্ষ বিজ্ঞানী দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত এবং পরীক্ষা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্য। ১৫০বছর পূর্বে ডারউইন কর্তৃক প্রদত্ত তত্ত্বটি আজ একটি সর্ব মহলে সমাদৃত এবং প্রমাণিত।

প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে ডারউইন নিজেও তার প্রদত্ত তত্ত্বের অনেক প্রশ্নেই নিরুত্তর ছিলেন। সঙ্গত কারণে তার সমসাময়িক অনেক বিজ্ঞানীই পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে ডারউইন প্রদত্ত তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু আজ ডিএনএ বিশ্লেষণ, নতুন নতুন ফসিল আবিষ্কার তার প্রদত্ত তত্ত্বকে এমনই উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে যে তিনি যদি নিজেই বেঁচে থাকতেন তবে নির্ঘাত অবাক হতেন। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে, পদার্থবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, রসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অনুষদসমূহের সমর্থন, পরিমার্জিত এবং সম্প্রসারিত বিবর্তন তত্ত্বকে সমর্থন করে।

এক কোষী জীব থেকে যদি প্রাণের উদ্ভব হয় তবে কি সকল প্রজাতি একই সূত্রে গাথা?
হ্যাঁ। সবাই একই সূত্রে গাথা। ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে আমাদের এই পৃথিবীতে সকল জীবের ডিএনএ’তে সাদৃশ্য রয়েছে। বিবর্তনকে যদি একটি গাছ ধরা হয়, তবে গোঁড়ার দিকে আদি প্রাণীগুলো থাকবে এবং শাখা-প্রশাখায়, পাতায় বিবর্তিত প্রাণীগুলো বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হয়ে অবস্থান করবে। অর্থাৎ সবাই একই সূত্রে একটি গোত্রের কোষ থেকেই বিবর্তিত রূপে পৃথিবীতে অবস্থান করছে। বিবর্তনের এই ধারায় লক্ষ লক্ষ প্রাণী যেমন এই ভূখণ্ডে বেঁচে আছে, ঠিকই একই ভাবে কোটি প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেছে কালের আবর্তে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মানুষ এবং শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে একই (কমন) পূর্বপুরুষ প্রজাতি দ্বারা ভাগ করা সাধারণ পূর্বপুরুষ প্রায় ৫ থেকে ৮ মিলিয়ন বছর আগে বসবাস করেছিল। সেই প্রজাতিই পৃথিবীতে প্রথম দুপায়ে হাটা শিখাছিলো। তাছাড়া, ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে মানুষ এবং ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ’তে স্পষ্টত সাদৃশ্য আছে, যা বিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি যে একটি সিঙ্গেল সেল জীব বা এক কোষী অণুজীব তাই ইঙ্গিত করে। অবাক হলেও সত্য যে, মানুষ এবং ব্যাকটেরিয়ায় মধ্যে ২০০টির অধিক জিনের সাদৃশ্য রয়েছে।