আজ সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

রোহিঙ্গা ইস্যু: সঙ্কট ও সমাধান

এমদাদুল হক তুহিন  

১৯৪৮ সালে মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। গণতন্ত্রের পথে রাষ্ট্রটির যে যাত্রা শুরু হয়, সে সময় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিলো। অনেক বড়কর্তাও ছিলো রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর। তবে রাখাইন বা আরাকান রাজ্যের এই ভূমিপুত্রদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে ১৯৬২ সালে। জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে ঘোষণা দেন, রোহিঙ্গারা মায়ানমারের কোন জনগোষ্ঠী নয়, তারা বিদেশী। সেই থেকে নির্যাতন।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী হচ্ছে রোহিঙ্গা। ব্রিটিশরা যখন এই উপমহাদেশে শাসন করছিল তখন তারা মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। সেখানে ছিলো না রোহিঙ্গাদের নাম। রোহিঙ্গারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এদের ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মিল রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ব্রিটিশ আমলে এরা ভারতের কোন একটি অংশ থেকে গিয়ে আরাকান রাজ্যে বসতি স্থাপন করে।

আবার প্রচলিত আছে, সপ্তম শতাব্দিতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলে, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকে এসেছে রোহিঙ্গা। এসব তথ্য উইকির।

দীর্ঘকাল ধরেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেক কখনও নাড়া দিয়ে উঠে নি। জাতিসংঘ এখানে নির্বাক। স্বয়ং আমেরিকারও কোন উদ্যোগ নেই। মুসলিম বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্র সৌদি আরবও কোন কথা বলছে না। পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় সমস্যাটি কেবলই যেন বাংলাদেশের! আমাদের ছোট্ট এই দেশটিতে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারেই। অভ্যন্তরীণভাবে রয়েছে নানা সমস্যাও। তবে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো- জঙ্গি ইস্যু। রোহিঙ্গাদের মধ্যেও রয়েছে উগ্রবাদী প্রবণতা। তারপরেও বিভিন্ন সময়ে এরা এসে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে, এবং নিচ্ছে! মানবিক দিক বিবেচনা করেই বাংলাদেশে ৫ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নানাদিক বিবেচনা করে, বাংলাদেশ আর একটি রোহিঙ্গারও বাড়তি চাপ সইতে নারাজ। কোন রোহিঙ্গা দেশে প্রবেশ করুক সুস্থ মস্তিষ্কের বাঙালিদের কাছে এটি কাম্য নয়। তারপরেও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ খালেদা জিয়া জানেন, রোহিঙ্গারা মুসলিম। ধর্মের প্রতি অধিক আনুগত্য দেখানোর ফলে তার প্রতি মানুষের মায়া মমতা আরও বেশি উথলে পড়বে। তিনিও তাই করেছেন। আর ধর্ম নিয়ে তার রাজনীতি বরাবরেরই।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মায়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছেন। একাধিক বৈঠক হয়েছে। তবে দেশটিতে রোহিঙ্গা নিধন থেমে নেই। তাই রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মার্কিন হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ। জানি এক্ষেত্রেও তেমন কোন ফল আসবে না। আমেরিকা মায়ানমারকে কোন চাপই দেবে না। একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে মায়ানমারের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা। রয়েছেও। প্রতিটি রাষ্ট্র উদ্যোগী হলে মায়ানমার তাদের এই বর্বরতা বন্ধ করতে বাধ্য হবে। আধুনিক যুগে এই বর্বরতা কোনক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি বিশ্বের প্রত্যেকটি মানুষকে বুঝানোর দায়িত্ব অন্য আট দশটি মানুষের।

মায়ানমারের সঙ্গে এক সময় খারাপ সম্পর্ক ছিলো চীনের। তবে বর্তমানে এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সু-সম্পর্ক। মূলত ভারতের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা বাড়াতেই গভীর সম্পর্কে জড়িয়েছে চীন। তাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিৎ হবে, চীনের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা। সমস্যার প্রকট ও প্রকরণ তুলে ধরতে পারলে সুফল আসতে পারে। কারণ বর্তমানে চীনের সঙ্গেও রয়েছে বাংলাদেশের গভীর সু-সম্পর্ক।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘও। পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও বহু আগে থেকেই জানিয়ে আসছে, এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে আছে। তবে, কোন সংস্থারই কার্যত কোন উদ্যোগ নেই। মায়ানমারে যে অস্ত্রের ঝনঝনানি চলছে, তার কাছে বিশ্ববিবেক যেন অন্ধ! আর যখনই রোহিঙ্গা ইস্যু তুঙ্গে উঠে ঠিক তখনই গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সাং সু চি বলে বসেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। নিজের দেশে মানুষ হত্যা, সেই মানুষ অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানোর সময়ে নোবেল বিজয়ী এই নেত্রীর মুখ থেকে এমন বক্তব্য আসে। তবে এই ইস্যুতে অধিকাংশ সময় থাকেন নিশ্চুপ। অং সাং সু চিকেই এই বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ হবে এই নেত্রীর উপরও চাপ সৃষ্টি করা।

রাষ্ট্র হিসেবে মায়ানমারকে বুঝতে হবে, তাদের দেশটি স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকেই রোহিঙ্গারা আরাকান রাজ্যে বসবাস করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে তারাই ছিলো ওই ভূমিটির মালিক। কোন রাষ্ট্রেরই কাজ নয়, ভূমি থেকে মানব উচ্ছেদ। বরং মানবকে ভূমি উপযোগী করে তোলাই রাষ্ট্রের জন্য সমুচিত। অস্ত্রের ক্ষমতা একদিন শেষ হবেই। যাদের আজ এতোটা শোষণ করা হচ্ছে; কে না জানে- আরাকানই কোন একদিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা হতে পারে। সেখানে রোহিঙ্গারাই হবে শাসক। আবার তারাই হবে প্রজা। থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকার। ধর্ম পালনেও থাকবে না কোন বাধা। তবে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনই এই স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে না।

রোহিঙ্গাদেরকেই নিজস্ব ভূমিতে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি তৈরি করতে হবে। নির্ধারণ করতে হবে স্বাধীনতার লক্ষ্যও। বাংলাদেশে বসে বাঙালি হিসেবে এই কল্পনা করতে পারলেও রোহিঙ্গারা নিজেদের এই অবস্থায় তৈরি করতে পারেনি বলেই হয়তো আজ এতো নির্যাতন! স্বাধীনতার ৬৯ বছরেও যে জাতিগোষ্ঠী পায়নি নিজেদের স্বীকৃতি, আদায় করতে পারেনি যারা; তারা যে পশ্চাৎপদ তা সহসাই বলা যায়। পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী বলেই বিশ্ব ঠেলে রাখছে পিছনে। এগোতে দিচ্ছে না কোনক্রমেই। তবে বিশ্বের উচিত হবে- প্রয়োজনে মায়ানমারের সঙ্গে সকল ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করে হলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। ভূমিতে তাদের বসবাস করতে দেয়া। বিশ্ব কোনক্রমেই মানব উচ্ছেদ সহ্য করবে না- এটা ভালো করে বুঝানো উচিৎ মায়ানমারকে।

এমদাদুল হক তুহিন, ব্লগার, কবি ও সংবাদকর্মী। ইমেইল: [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১০ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ